আলুকাহিনী (রম্যরচনা)
আলু
হোয়াটস্ অ্যপে কলেজের বন্ধুদের গ্রুপে তুমুল আলোচনা- বাঙালীর বিরিয়ানিতে আলু থাকে তাই হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি ভক্তরা নয়া ফরমান জারী করেছে।
বাঙালী বিরিয়ানীর কৌলিন্য স্খালন করে তাকে বিরিয়ানির বদলে আমিষ পোলাও এর তকমা দিয়েছে তেলেঙ্গানা পার্টি। আপাত নিরীহ আলুকে নিয়ে এ হেন গন্ডোগোলের সূত্রপাতে যখন বাজার গরম, তখন এক বন্ধুর সনির্বন্ধ অনুরোধ, আলুর গুনগাথা নিয়ে কিছু লিখতে, যাতে ‘বেচারী’ আলু তার হৃত মর্যাদা ফিরে পায়।
গুগলে ইতিহাস ঘেটে দেখলাম সাউথ এমেরিকার বলিভিয়াতে প্রথম আলুচাষ হয়, খ্রীষ্ট জন্মেরও কয়েকহাজার বছর আগে। সেই হিসাবে আলু আবিস্কারের দীর্ঘ সময় পরে, ভারতবর্ষে আলু আমদানি হয় পর্তুগীজদের হাত ধরে। প্রায় একই সময়ে সেই সাউথ অমেরিকার দেশ ব্রাজিলের হাত ধরে, বাংলার পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধন করতে আরেকটা জিনিষের আগমন হয়। সেটা হল গিয়ে কচুরীপানা। যদি আলু ‘ভিনি ভিডি ভিসি’ করে নিমেষে বাঙালী জঠরপূর্তির অন্যতম উপাদান হয়ে দাঁড়ায়, তবে কচুরীপানার অত্যধিক বংশবিস্তার একসময় সরকারের প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৩৭ সালে বাংলায় নির্বাচনে সব পার্টির প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল কচুরীপান নিধন।
পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রচলিত ভেজিটেবল হল আলু। ভেজিটেবল টা কি ঠিক বল্লাম? নিজেরই বেশ সন্দেহ জাগছে। বাঙালির ভেজিটেবল বলতে শাক-সব্জি, পটল, কপি ইত্যাদি জিনিষকে বোঝায়। সে যাই হোক গে, ছোট বেলায় রেডিওতে -‘খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দোপধ্যায়ের’ আগে , - ‘নৈনিতালের দেশী গোল আলুর প্রতি কুইন্টাল’- বাজারদর শুনতে পেতাম। সর্বঘটে বিল্বপত্রের মত, আলু বাঙালী হেঁসেলের সব রান্নার মধ্যেই বিরাজমান। দুধে ভাতে বাঙালীর মত আলুভাতে বাঙালী বল্লেও অত্যুক্তি হবে না। আলু একমোবদ্বীতিয়ম। খালি আলু সেদ্ধ করে নুন, সর্ষের তেল, কাচালংকা সহযোগে গরম ভাতে মেখে খাওয়ার ব্যাপারটা ধনীর টেবিল থেকে চাটাই পেতে বসা গরীব লোকের, সবার পাতেই সমান সমাদৃত। মাংস মানে মাটনে আলু ছাড়া ভাবাই যায় না। ছোট বেলায় মা মাছের ঝোলে আলু দিত। রাতে খাওয়ার জন্য যে মাছের ঝোল তুলে রাখা হত, বিকালে খেলা সেরে ফিরে এসে চুপিচুপি হাতসাফাই করে মাছের ঝোলের আলু তুলে খেয়ে নিতাম। রবিবার দিন তো আলু আর মাংসের ঝোল দিয়েই আর্ধেক ভাত কাবার। লাস্টে অবশ্য হাড় চুষে চুষে ধৈর্য সহকারে মজ্জা বার করাটা বাঙ্গালীর মজ্জাগত। যে কোন শব্জী রান্নায় আলু প্রায় অপরিহার্য, সে আপনার আলু-পটল, আলু-ফুলকপি, আলু-বাঁধাকপি অথবা ঝিঙে-আলু পোস্ত বা খালি আলু পোস্ত, সবেতেই আলুর রমরমা। ধর্মতলায়, অনাদির কেবিনে মোগলাই পরোটা খেলে, সঙ্গে অবশ্যই পাবেন ছোট ছোট পিস করা খোসা না ছাড়ান আলুর ঝোল। উত্তর ভারতে আবার ব্রেকফাস্টে আলু পরোটা প্রবল জনপ্রিয়। মদ্রদেশীয় ধোসার মধ্যেও পাবেন আলুর পুর। মহিলামহলে জনপ্রিয় ফুচকা এবং আলুকাবলির মধ্যেও সেই আলু। সারা ভারতের জনপ্রিয় সমোসা বা সিঙ্গারার ভিতরেও আলুর পুর। বাঙালীর গরম ভাতে ঘি সহযোগে মুশুরীর ডাল ও মুচমুচে আলুভাজা অতীব লোভনীয়।
এখানে একটা ব্যাপার বলার লোভ সামলাতে পারলাম না। ‘রাম মরেছে বেগুনে’ বলে একটা বাঙ্গলা প্রবাদ বাক্য আছে। মানেটা হচ্ছে কোন কথার আগে রাম শব্দটা থাকা মানে, সেই জিনিষটা বড় সাইজের। যেমন ধরুন রাম ছাগল মানে বড় সাইজের ছাগল, তেমনি রামদা মানে বড় দা। কিন্তু এর ব্যাতিক্রম হচ্ছে রামবেগুন। রামবেগুন হচ্ছে ছোট সাইজের বেগুন। তেমনি ভাবে, আলুকাবলি, আলুপরোটার মত আপনি যদি আলুবোখারায় আলুর উপস্থিতি ভেবে থাকেন, তবে ভুল করবেন। আলুবোখারার চাটনিতে একছটাকও আলু পাবেন না।
আলুকে আমাদের ক্রিকেটার রাহুল দ্রাবিড়ের মত ‘মিস্টার ডিপেন্ডন্ট’ তকমা দেওয়া যায়। কী শীত, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা সবসময়ই বাজারে বিদ্যমান। দামেরও বিশেষ তারতম্য হয় না , সারা বছর দাম সামান্য এদিক ওদিক। আলু কখনই আপনাকে পেয়াজের মত বিট্রে করবে না। বছর দুই তিন অন্তর অন্তর, পেয়াজের দাম কখনো কখনো আকাশছোয়া হয়ে যায়। অনেকটা অভিমানিনী অর্ধাঙ্গিনীর মত। তখন আপনার দিশেহারা অবস্থা। মৎসবিলাসী বাঙালীর মাছের ঝোলে আলুর মত পেয়াজটাও অপরিহার্য। তখন আপনি চেয়ে থাকবেন নাসিকের পেয়াজ কখন বাজারে আসবে আর দাম নেমে আসবে। আলু খালি যে শস্তা শুধু তাই নয়, ইউটিলাইজেশন ফ্যক্টার ধরলে সব শব্জীর সেরা হচ্ছে আলু। উপরের ছিলকাটা ছাড়িয়ে নিলে পুরোটাই রান্নায় ইউজ করতে পারবেন।আজকাল যেমন বাজারে ফুলকপির ফুলের থেকে তলায় দ্বিগুন সাইজের ডান্ডি দেখলে মনে হবে বার হাত কাকুরের তেরহাত বিচি। আলু কিনতে খুব একটা এক্সপার্টাইজেরও দরকার নেই। সেই কারণে বেশ ছোটবেলায় আমার প্রথম বাজার করার হাতেখড়ি আলু দিয়ে কারন আলুর ব্যাপারে দোকানীর বিশ্বাসযাগ্যতা বেশী প্রাধান্য পায়। বাজারে আলু পেয়াজের দোকানগুলো বেশী কৌলিন্যধারী। খদ্দেররা সাধারনত বাঁধা দোকান থেকে আলু পেয়াজ কিনে থাকেন। এরা বাজারের পার্মানেন্ট দোকানের মালিক। মাটি থেকে উঁচুতে সিমেন্ট বাধানো চাতালে তাদের দোকান। শাকসব্জীওয়ালারা গ্রাম থেকে টাটকা শব্জী নিয়ে আসে বিক্রি করতে। তাদের স্থান সাধারনত রাস্তার দুপাশে মাটিতে বসে ঝুড়িতে রাখা শব্জী বিক্রি করা। আলু ছাড়া বাকী সব শব্জী টাটকা কিনতে, চোখ ও অভিজ্ঞতা দুটোই লাগে, যেমন ধরুন টাটকা ফুলকপি, টমেটো, পটল, কুমড়ো টিপে শক্ত আছে কিনা দেখতে হয়, ঝিঙ্গের ব্যাপারটা আবার অন্যরকম, যদি আঙুল দিয়ে টিপলে একটু দেবে যায়, তবে বুঝতে হবে সেটা কচি ঝিঙে, বেগুনের বেলায় আবার হাতে নিয়ে বুঝতে হবে, সাইজ টু ওয়েট রেশিয়ো টা কেমন, মানে বেগুন যদি হাল্কা হয় তবে তার মধ্যে বিচি কম এবং তেলও বেশী, খেতেও বেটার।
আলু পার্ট ২
ছেলেপুলেদের আরেকটা প্রিয় খাবার হচ্ছে পটেটো চিপস। ক্রিকেট ম্যাচ হোক কি ভিডিও গেমস হোক, বেশী জমবে সেটা পটেটো চিপস সহযোগে। বর্ষাকালে বাঙালীর প্রিয়খাদ্য খিচুড়ি। সেখানে আলু না থাকলে কি নেই, কি নেই ভাব। আমেরিকানরাও খুব আলু খায় শুনেছি। হালফিলের ম্যাকডোনাল্ডের আউটলেটে গেলে দেখবেন প্রায় সব টেবিলে অন্য কোন খাবারের সঙ্গে ফ্রেন্চ ফ্রাইয়ের প্যাকেট বিদ্যমান।
সেই ফ্রেন্চ ফ্রাই খেয়ে দেখেছি, আমাদের বাঙ্গালী বাড়ীর আলুভাজার মত ন্যাতামার্কা নয়, বেশ ক্রিসপি মানে পান্জাবি, পায়জামা, চটি পরিহিত বঙ্গপুঙ্গব নয়, রীতিমত স্যুট, টাই, পাম শু পরিহিত চটপটে সাহেব। আলুর টেস্টেরও ডিফারেন্স আছে। চিকেনের কোয়ালিটি যেমন ফীডের উপর ডিপেন্ড্ন্ট, তেমনি ম্যাকডোনাল্ডের আলুও নিশ্চয়ই স্পেশাল জমিতে, অরগ্যানিক সারের ফসল।
আজকাল দেখছি বন্ধুদের আড্ডায়, বাঙালীর বিরিয়ানিতে আলুর মাহাত্ব্য নিয়ে বেশ লেখালেখি হচ্ছে। এ ব্যাপারে মনে পড়ছে বিরিয়ানী ব্যাপারটা ছোটবেলায় আমাদের মফস্বলে কোনদিন চেখে দেখিনি বা আরো খোলসা করে বল্লে চোখেই দেখিনি। বিয়েবাড়ীতে মাটনের ঝোল আর সাদা ভাতের অথবা বড়জোর পোলাও এর রেওয়াজ ছিল। তখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। তিন বন্ধু, আমি, তরুন আর গৌতম গিয়েছি চৌরঙ্গী এরিয়াতে বেড়াতে। আমিনিয়া দোকানটা তখন বেশ ফেমাস। সেখানে নাকি ভাল বিরিয়ানী পাওয়া যায়। সেই আমার প্রথম বিরিয়ানী টেষ্ট। একটুকরো মাংসের সঙ্গে এক পিস আর্ধচন্দ্রাকৃতি আলু ও একটা আস্ত ডিমও ছিল বলে মনে আছে। খাওয়া দাওয়া তো হল। এরপর ওয়েটার বিল দিয়ে গেল। আমরা মেনুকার্ডে দাম দেখে বেশ হিসাব করে অর্ডার করেছিলাম, যাতে বাসভাড়ার পয়সাটা থাকে। তিনজনকেই যেতে হবে বেহালা। বিল দেখে মাথায় হাত। বিরিয়ানিতে আলুটাকে ফাউ ধরলে, বিলে বিরিয়ানির দামের সঙ্গে ফাউয়ের মত ট্যাক্স লাগানো। অগত্যা কি আর করা যায়। বাসভাড়াটা চলে গেল অথবা গলে গেল ঐ বিলের পিছনে। ফিরব কি করে। তরুন বুদ্ধি দিল- চল হেটে হেটে বাবুঘাট যাই, ৭৭ নম্বর বাসের কন্ডাক্টর চেনা আছে। সেইমত বাবুঘাট থেকে বাস ধরে সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছিলাম।
কিছুদিন আগে এই আলুই আমাকে কিঞ্চিৎ লাভের মুখ দেখিয়েছিল। করোনা চলাকালীন প্রথমের বেশ কয়েকমাস বাইরে থেকে জমেটো বা সুইগি দিয়ে মুখ বদলের অভ্যাসটা চলে গিয়েছিল। সরকারের তালে তাল মিলিয়ে, করোনার বাড়বাড়ন্তর সঙ্গে সঙ্গে সমানতালে করোনা প্রটেকশনে ঢিলেমি এসেছে। অনেকদিন পর জমেটোর মেনু কার্ড খুলে চোখে পড়ল ‘মাটন ডাকবাংলা’। রহস্য রোমাঞ্চ ভরপুর নাম। খাওয়ার সময় নিশ্চয়ই ফিলিং আসবে যে, লন্ঠনের আলোতে জঙ্গলের মধ্যে রামের বোতল সহযোগে মাটনের ডিশ খাচ্ছি। সেই আকাঙ্খিত খাবার এসে পৌছানর পর মেনুর বিবরণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেল তিন পিস সলিড মাটনের সঙ্গে টিকটিকির ল্যাজের মত আলু মিসিং। খাওয়া ভুলে প্রথমে জমেটোতে কমপ্লেন ঠোকা হল। কলসেন্টারের লোক বিষ্মিত। একে আলুমিসিংএর কমপ্লেন প্রথম তারপর আবার কলকাতার বিরিয়ানি স্টাইলে আলুর উপস্থিতি, তার সাধারণজ্ঞানের বাইরে। সে মেনুকার্ড ঘেটে আলু ‘প্রেসেন্ট প্লিস’ নিশ্চিত করে, পুরো টাকা রিফান্ড করে দিল এবং সবিনয় নিবেদন করে জানাল মাটন ডাকবাংলা ফেরত দেওয়ার দরকার নেই। তাতে করে ডাক বাংলার স্বাদ শতগুনে বেড়ে গেল।
আলু দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় শুনেছেন কি কখনো? সেটাও হয়েছিল ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে o Bannon নামে অমেরিকান ডেস্ট্রয়ার, গভীর রাতে জাপানি সাবমেরিনের মুখামুখি। সেটা তখন সমুদ্রে অক্সিজেন নিতে ভাসমান, আর সাবমেরিনের পিঠে অনেক জাপানি সৈন্য গভীর ঘুমে আচ্ছন। অমেরিকান নেভির ডেকে থাকা সৈন্যরাও ঠিক প্রস্তুত ছিল না হঠাৎ করে সাবমেরিনের উপস্থিতির জন্য। জাপানিরা দৌড়াল বন্দুক আনতে, অমেরিকানদের ডেকের গানগুলো অত কম দূরত্বে ফায়ার করতে অক্ষম। ডেকে রাখা ছিল আলুর বস্তা। অগত্যা, অন্ধকারে শুরু হল সেই আলু ছোড়া। জাপানির ভাবল হ্যান্ড গ্রেনেড আসছে। তড়িঘড়ি করে সাবমেরিন নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে চাইল। এই করতে গিয়ে সাবমেরিন এসে গেল, আমেরিকান ডেস্ট্রয়ারের ডেকগানের পাল্লাতে। এরপর ডেকগানের গুলিতে সাবমেরিনের সলিল সমাধি। সেই অনীকেই মনে হয় আমাদের ছোটবেলায় কালীপুজার সময় একরকম পটকা পাওয়া যেত, সেটার নাম ছিল ‘আলু বম্ব’!
ইতিহাস অনুযায়ী লক্ষৌ এর নবাব ওয়াজেদ আলি শার হাত ধরে বিরিয়ানির রমরমা লর্ড ক্লাইভের তৈরী রাজধানীতে। কলকাতার বিরিয়ানী লক্ষৌস্টাইলে রান্না হয়। সব জিনিষে যেমন বিবর্তনবাদের সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটায়, মানে ধরুন আজকালকার সময়ে করোনার মিউটেশন ঘটে, সময়ের হাত ধরে এক শরীর থেকে অন্য শরীরে যেতে, তেমনি বাঙালী সেই বিরিয়ানি রেসিপিকে আরো আপন করে নিয়েছে, মাংসের সঙ্গে আলুর সহবস্থানে। এটা অবশ্য বাঙ্গালীর চরিত্রগত বৈশিষ্ঠ্য। ধনী ও দরিদ্রের সহাবস্থান কলকাতার হলমার্ক, সেই মুকুটে আরেকটি পালক হচ্ছে কলকাতার বিরিয়ানীতে বাদশাহী মাটনের সাথে আম আদমীর অতিপ্রিয় আলুর বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান।
‘কোন গুন নাই যার’ তাকেই নাকি বেগুন বলে থাকা হয়। তাহলে এত গুন সম্পন্ন, বঙ্গবাসীদের অতি প্রিয় আলুকে মানুষের দোষের উপমায় কেন যে আমরা টেনে আনি কে জানে!
দেবদত্ত রায়
সেক্টর ৬২, নয়ডা
দূরভাষ ৭৪৬৬৮৮৮৮২৩
৩০/০৬/২০২০



Comments
Post a Comment