রসময় রথযাত্রা ও ঝুলন

 


রসময় রথযাত্রা ঝুলন 

পার্ট

অনেক বৎসর ধরেই আমি চাকরীসূত্রে উত্তরভারতের নিবাসী, এখানে আবার হনুমানজির আধিপত্যই বেশী, জগন্নাথদেব একটু ব্যাকফুটে। স্কুলে ছুটিও হয় না, বাচ্চাদেরও রথের দড়ি টানার বদলে ইস্কুলের ঘানি টানার টানটাই বেশী। তাছাড়া আষাড় মাসে রথ মানেই বৃষ্টি, সেটা আর এখানে পাচ্ছি কোথায়? চল্লিশ ডিগ্রী গরমে কে আর রথের দড়ি টানে। তবে এবারে করোনার কল্যানে ভারচ্যুয়াল দড়িটানে উৎসাহের অভাব নেই। দড়ির টানে পূণ্য হয়, আর সেটা যদি এসি রুমে বসে পটেটো চিপস সহকারে করা যায় তাহালে তো সোনায় সোহাগা। এবারের রবীন্দ্রজয়ন্তী থেকে পাড়াতে এইপ্রথা চালু হয়েছে। লকডাউনের বাজারে, সবার এই পদ্ধতিটা মনে ধরেছে। 

কোর্টের রায়ে তো  জগন্নাথ দেবের পীঠস্থান পুরীর মন্দিরে রথেযাত্রা বন্ধ। পুরোহিতদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল হাতী দিয়ে রশ্মি টানার। কিন্তু পুণ্যের ফলের সিংহভাগ হাতীর কপালে যাবে, সেটা বিচারপতি মহাশয়ের পছন্দ হয় নি। তাহালে দেখা যাচ্ছে, অতিখুদ্র সার্স ভাইরাস, দাপটে ব্যাটিং করে যাচ্ছে। এখন বঙ্গবাসীর একটাই প্রার্থনা, দূর্গাপূজোর আগে করোনা যেন আউট হয়ে যায়, তবেই না আমার মত অধম-রা কব্জি ডুবিয়ে দশমীর দিন খাসির মাংসের স্বাদ নিতে পারবে। 


এই প্রসঙ্গে জগন্নাথদেব সম্বন্ধিত একটা ঘটনা মনে এল। বেশ কয়েকবছর আগে রথযাত্রার কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম পুরী। অফিসের কাজে তালচের, সেখান থেকে ফেরবার পথে পুরী হয়ে ভুবনেশ্বর থেকে ফ্লাইট ধরব, এরকমই প্ল্যান। সঙ্গে তাপসদা , অফিসেরও কলিগ আবার আমাদের ৬২র বাসিন্দা। তাপসদার বাকী সব ঠিক কিন্তু টাকা পয়সার ব্যাপারে বড় বেশী সচেতন। পুরী হোটেলে উঠেছি। সন্ধ্যেবেলা বীচের পাশের রাস্তাটায় হাটছি। দেখি বেশ চিংড়ি ফ্রাই বিক্রি হচ্ছে, জিভে জল আনা সুবাস। জিজ্ঞাসা করলাম তাপসদা খাবেন নাকিতাপসদার উত্তর কত করে? বল্লাম - একশ টাকা। পাশে বেগুনী বিক্রি করছিল একটা লোক, পাচটাকা পিস।একশশুনে তাপসদা বলে উঠলেন - বিষ, বিষ, ভুলেও কখনো খেও না, কবেকার বাসী জিনিস, নিশ্চয়ই ফরমালিন দেওয়া। বেগুনী খাও, এসবে কোন ভেজাল পাবে না। পরের দিন গিয়েছি জগন্নাথের মন্দিরে। তাপসদা গাড়ী থেকে নামলেনই না, যদি আবার দক্ষিণা দিতে হয়। গাড়িতেই জুতো খুলে গেলাম মন্দিরে। মূল মন্দিরে মোটামুটি ভীড়। গেটের কাছেই এক পান্ডা ধরেছে, পূজা দেওয়ার জন্য। আমিও তাপসদার যোগ্য চেলা। দুদিকে প্রবলভাবে মাথা নেড়ে এগোলাম। পিছন থেকে ক্রুদ্ধ পান্ডার ঝাটার বাড়ী পড়ল পিঠে। সঙ্গে মধুর বাণী- ‘কড় হলা? আগে চল আমিও দুষ্টুবুদ্ধিতে কম যাই না। গান্ধীজিরএক গালে চড়ের বদলে অন্য গাল এগিয়ে দেওয়ার নীতির কথা মেনে বল্লামপান্ডা সাব, আর একবার ঝাড়ু কা বাড়ি দিজিয়ে না - বড়া পুণ্য হোগা স্বয়ং জগন্নাথজি সামনে হ্যায়। পান্ডা বোধহয় এমন ভক্ত আগে পায় নি। পুণ্যর আর ভাগ দিতে নারাজ ছিল বোধহয়, চোখ গোলগোল করে বল্ল ভাগ জলদি। বেরিয়ে এসে দেখি আরেক বিপদ। গাড়ী ছিল মন্দিরের কাছে। গাড়ী সস্থানে ইল্লে মানে নেই, তাপসদা দাড়িয়ে। ব্যাজার মুখে বল্ল, মন্দিরের কাছে বলে একশ টাকা পার্কিং। দু কিলোমিটার দূরের পার্কিংএ দশ টাকা। তাপসদা গাড়ী সেখানেই পাঠিয়ে দিয়েছে। অগত্যা জগন্নাথের নাম নিয়ে, চড়া রোদে খালি পায়ে, দুকিমি হন্টন। রথের দড়ি টানার অর্ধেক পূণ্য তো অর্জন তো করা গেল। 


এবার ফিরি বর্তমানের জগতে। বলরাম, জগন্নাথ বোন সুভদ্রা যাবেন একসপ্তাহ মাসীর বাড়ীতে। সত্যিই তো, এক জায়গায় জগন্নাথেরঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকা কি পোষায়, সারাদিন ভক্তদের ভীড়, ধূপ ধুনোর পলিউশনে জেরবার, টাইমে ভোগ, টাইমে শয়ন জীবন ম্যাদামারা হয়ে যায়, তাই সারাবছর এই একসপ্তাহের ছুটির অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা। তার উপর এখন আবার লকডাউনের গেরো, বন্ধ না করে দেয় মাসীর বাড়ী যাওয়া। শেষমেষ জুমের হাত ধরে মাসীর সঙ্গে ভিডিও কলিং হবে নাকি? অধীর প্রতীক্ষাএবারে মাসীর বাড়ীর পেটপূজোর ভূরিভোজটা কপালে নাচছে নাকি সেই আবার মন্দিরের রোজকার ভোগ। এতদিন জানতাম ছোটবেলার ছড়ামামার বাড়ী ভারি মজা কীলচড় নাই তাই তো, তবে মামার বাড়ী ছেড়ে মাসীর বাড়ী কেন? ওহো-ঠিক কথা, মামা যে সাক্ষাত কংস, সাধে কি আর বলে - যম, জামাই, ভাগনা তিন নয় আপনা। অতএব মনুষ্যকুল যতই মামার বাড়ীর মোয়ার জন্য লালায়িত, কেষ্টঠাকুরের জন্য সে দরজা নৈব নৈব চ। নীলাচলে দোলাচল। রথযাত্রা হবে কি হবে না, কাল সেই সংশয়ের নিরাসন করে কোর্টের নূতন ফরমান রথযাত্রা হবে, তবে দড়ি স্পর্শ আমজনতার নাগালের বাইরে। পুরান ঘেটে দেখা গিয়েছে, একবার রথযাত্রা না হলে, পরের বার বৎসর রথযাত্রা নিষেধ। তাই কোর্টের রায় বদল। 

 

এবারে ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থনের পালা। জিনিষ কিনে ফাউ পেলে সবাই যারপরনাই আনন্দিত হয়। রথযাত্রা অনুষ্ঠানটাতে ফাউ টা ছিল উল্টোরথ। রথে যদি বৃষ্টির জন্য একটু কম ঘোরা হল, সব খেলনা কেনা হয় নি, তবে, কোই বাত নেহি, উল্টোরথ এলে সুদে আসলে উশুল করে নেওয়া যাবে।

ক্রমশঃ


রসময় রথযাত্রা ঝুলন পার্ট

খুব ছোট থাকতে, পাড়ার ছেলেপুলেরা মিলে, বাবার কিনে দেওয়া কাঠের রথ, সাজিয়েগুজিয়ে, দড়ি বেধে, কাসর-ঘন্টা বাজিয়ে পাড়াময় ঘুরতাম। সব বাড়ী থেকেই কিছুকিছু মাধুকরী পাওয়া যেত, ফল, খিচুড়ি। সেইগুলো সবাই মিলে মহা আনন্দে ভাগ করে খেতাম। মফস্বল শহরে থাকতাম, সেখানে বড় রাস্তার দুদিকে বসত রথের মেলা। হরিদাসের বুলবুলভাজা থেকে, আধহাত সমান পাপড়, জিলাপি, আলুকাবলি সবই থাকত। বাঁশি, তালপাতার ভেঁপু, নানা সাইজের বেলুন নিয়ে ফেরিওয়ালা। ভেঁপুর আওয়াজ নয়ত বেলুনের উপর হাত দিয়ে ঘসে একটা হিসহিস আওয়াজ করে বাচ্চাদের আকর্ষনের চেষ্টা। এছাড়া থাকত লাট্টু আর মার্বলের দোকান। দশ পয়সার লাট্টু আর দুইপয়সা করে মার্বেল। বেশ খুটিয়ে, লাট্টুর তলার পিনটা কতটা  ছুচোল আর লেত্তী প্যাচানোর জায়গাটা ভাল করে দেখে নিতাম কেনার আগে। স্কুলে বইয়ের ব্যাগে লাট্টু থাকত। বন্ধুদের মধ্যে কম্পিটিশন হত কারটা কতক্ষন ঘোরে। আরেকটা ব্যাপার করতে পারতাম লেত্তী লাগিয়ে, লাট্টুটা মাটিতে না ছেড়ে শূন্যে ছুঁড়ে হাতের তালুতে নিয়ে ঘোরাতাম। পাড়াতে মার্বেল নিয়ে পিলমার খেলা হত। মাটিতে একটা ছোট গর্ত বানিয়ে, বুড়ো আঙুলটা মাটিতে রেখে, অপেনেন্টের গুলিকে মেরে পয়েন্ট বানাতে হতে। যে হারত তার শার্টের পিছনদিকের মধ্যে দিয়ে গুলি ঢেলে দেওয়া হত।ওটাকে বলা হত ডিম পাড়া। রথের মেলায় এই গুলি বা মার্বেল আর লাট্টু কেনা হত। মার্বেল বিসর্জনের দিন ছিল হোলির আগেরদিনটা।  বুড়ীর ঘর জ্বালানোর পর গুলিগুলো আগুনে ফেলা হত। রথের মেলায় আর যেটা থাকত সেটা হচ্ছে ছোট ছোট প্লাস্টিকের খেলনার দোকান। ওটাই ছিল ছোটবয়েসের মূল আকর্ষন। কারন ওখান থেকে কেনা সবরকম পুতুল লাগত জন্মাষ্টমীর দিনে ঝুলন সাজাতে। ছোট্ট ছোট্ট প্লাস্টিকের নৌকা, গরু, ঘোড়া, দোলনায় রাধাকৃষ্ণ, সবই কিনতাম। এছাড়া মহিলাদের জন্য, গেরস্থালির সরন্জাম, শাখা, পলা, নোয়ার দোকান আর ঠাকুর দেবতাদের বাঁধানো ছবির দোকান, লক্ষীর পাঁচালি ব্রতকথার দোকানও থাকত। হই হই করতে করতে তারমধ্যে রথ এসে পড়ত। চারিদিকে হুলুস্থুল। আমার পুণ্যের শখ বরাবরই কম, ভীড় হলে তো কথাই নেই। তাই দড়ি ধরার সৌভাগ্য কখনই হয় নি।


রথ, উল্টোরথ চলে গেলে চেয়ে থাকতাম জন্মাষ্টমীর জন্য। কারণটা ছিল ঝুলন। আমার বাড়ীর বারান্দায় ঝুলন সাজাতাম। সঙ্গে পাড়ার দুই এক বন্ধু আর স্কুলের প্রাণের বন্ধুরা। যৌথ উদ্যোগ। তার জন্য কত প্রস্তুতি। স্কুল থেকে ফেরার পথে কাঠচেরাই এর কল পড়ত। সেখান থেকে যোগাড় হত ডাস্ট। ওটার মধ্যে সবুজ আবীর মিশিয়ে হত মাঠ। খালি ডাস্ট দিয়ে হত রাস্তা। পাহাড় তৈরী হত সবার পিছনে দেওয়ালের গায়ে। প্রথমে লাগান হত ইট। তার উপরে সামনের মাঠ থেকে কোদাল দিয়ে ঘাস শুদ্ধ চাপড়া কেটে এনে হত পাহাড়। সময়টা ভরা বর্ষা। তাই পাহাড় দেখতে লাগত শ্যামল সবুজ। পাহাড়ের এক কোনে হত লেক। একটা বড় বাটি বসিয়ে তাতে জল ঢেলে তৈরী হত লেক। লেকের পাশে থাকত চেয়ার। সেটাও মেলা থেকে কেনা। একটা বড়সড় খেলনা রেল ইন্জিন ছিল। পাহাড়ে টানেল বানিয়ে সেখান ইন্জিন রাখা হত। মাটি দিয়ে তৈরী হত রেললাইন।রেল লাইনের উপর দিয়ে ওভারব্রিজও তৈরী হত। সবচেয়ে ইনোভেটিভ আইডিয়া ছিল ফোয়ারা বানানোর। সাইকেলের হাওয়া ভরার ভালভটার সাথে একটা লম্বা ভাল্ব টিউব লাগিয়েভাল্ব টিউবের অন্যদিকটা একটা উচুতে টাঙানো জল ভরা রসোগোল্লার হাড়িতে লাগিয়ে সাইফন পদ্ধতিতে ফোয়ারার বন্দোবস্তো হত। ঝুলন পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে থেকে শুরু হত ঝুলন সাজান। পূর্ণিমার দিনটা ছিল ঝুলনের শেষ দিন। সেদিনটা স্কুল ছুটি থাকত। কিন্তু তার আগের দিন গুলোতে স্কুল যেতে হত। স্কুলে গিয়ে মন পড়ে থাকত ঝুলনের দিকে। টেনশনের শেষ থাকত না যদি স্কুলে থাকাকালীন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ত। বারান্দায় জলের ছাঁট এসে মাটির রাস্তা, ট্রেন লাইন, পার্ক ধুয়ে যাওয়ার ভয় থাকত। জোরে জোরে সাইকেল প্যাডেল করে বাড়ী পৌছতাম সব ঠিক আছে কিনা দেখতে। পাড়াতে অনেক বাড়ীতেই ঝুলন সাজান হত। সবাই সবারটা দেখতাম, আর তর্ক চলত কাদেরটা বেশী ভাল হয়েছে। ঝুলন পূর্ণিমার দিন সন্ধ্যেবেলা বাড়ীতে খিচুড়ি সহ ভোগ হত। সঙ্গে ভাজা আর মিষ্টিমুখ হত পায়েস দিয়ে। যে সব বন্ধুরা ঝুলন সাজানোতে সহযোগী থাকত, সবাই নিমন্ত্রিত সেই ভুরিভোজে। সেই ঝুলনের ছবিও। সঙ্গে দিলাম। এইসব লিখতে লিখতে, ছোটবেলার সেই স্মৃতিঘন আনন্দময় দিনেগুলির কথা উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে ভাসছে। কোন সন্দেহ নেই যে, কৈশোরের দিনগুলি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল।

দেবদত্ত 

২৩/০৬/২০২০


ঝাড়গ্রামের বাড়ীর বারান্দায় ঝুলন। সনটা ৬৯/৭০


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments