কারিগরী শিক্ষা


 কলেজ শিক্ষার যথার্থতা

কলেজ ছাড়ার পর চাকরী জীবনেরও ইতি টেনেছি। অনেক ক্লাসমেটরা, কোর সাবজেক্ট ছেড়ে, ম্যানেজমেন্ট, সফটওয়্যার, ফাইনান্স অথবা কন্ট্রাকটস ইত্যাদি লাইনে কর্মজীবন অতিবাহিত করেছে। কিছু আমার মত মুস্টিমেয় ক্লাসমেটরা, হার্ডকোর ইলেকট্রিকাল ডিজাইন অথবা মেনটেন্যান্স এরিয়াতে কাজ করেছি। আমার আলোচনার বিষয় হচ্ছে পুঁথিগত বিদ্যা কতটা কাজে লেগেছে। ইন্জিনিয়ারিং এর বাংলাটা হচ্ছে কারিগরী বিদ্যা অর্থাৎ কিনা কারিগর হওয়ার কৌশল আয়ত্ত করা। সেটা করতে গেলে বই থেকে থিয়োরী পড়া যতটা না দরকার তার থেকে হাতে কলমে শিক্ষাটা অনেক বেশী জরুরী। আমাদের কোর্স ডিজাইনাররা ল্যাব ক্লাসের ভাল ব্যাবস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু এতে দুটো প্রবলেম ছিল। এক তো ল্যাবের এক্সপিরিমেন্ট কোনমতে করে মাদার (সিনিয়ারদের করা একই এক্সপিরিমেন্টের রেজাল্ট) থেকে টুকে রিপোর্ট জমা দেওয়ার প্রবনতা, কারন মাস্টারমশাইরা এই ব্যাপারে একদম স্ট্রিক্ট ছিলেন না। না তো কোন আলাদা পরীক্ষা ছিল, তাই শেখার ইচ্ছে বা তাগিদ দুটোই ছিল কম। ল্যাবের যন্ত্রপাতিও ছিল মান্ধাতার আমলের। একটু উদাহরণে আসি।

মোটর পড়েছি, মানে ইনডাকশন আর সিংক্রোনাস মোটরের ডিফারেন্স, লোড এন্গেল ইত্যাদি, কিন্তু কিছু বেসিক জিনিস, যেটা হয়ত কিছুটা মেকানিকাল জড়িত, যেমন বিয়ারিং, কাপলিং উইথ ফ্যান অর পাম্প, এলাইনমেন্ট, ভাইব্রেশন এগুলো কিছুই শিখি নি। অথচ মেনটেন্যান্সে কাজ করতে গেলে এগুলো জানা বেশী জরুরী। থিয়োরী কম পড়িয়ে, ল্যাবে এগুলো শেখানো উচিত। ল্যাপ, ওয়েভ ওয়াইন্ডিং খুব থিয়োরী পড়েছি, কিন্তু চাকরী জীবনের শুরুতে জে কে স্টীলে চাকরি করতে গিয়ে, মোটর রিওয়াইন্ডিং শপে গিয়ে থিয়োরী বিদ্যা কোন কাজে আসে নি। ওয়াইন্ডাররা জ্বলে যাওয়া মোটরের কয়েল কেটে রিওয়াউন্ড করে দিত, ল্যাপ ওয়েভের বিদ্যা না নিয়েই। ল্যাবে উচিত একটা ওয়াউন্ডারকে ডেকে সামনে ওয়াইন্ড করে দেখানো।

ট্রান্সফরমারেও ব্যাপারটা তাই। থিয়োরী পার্ট খুব ভাল ছিল, কিন্তু কি করে ওয়াইন্ডিং বানানো হয় বা ট্রান্সফরমার অয়েল প্যারামিটার ডিজিএ এন্যালিসিস, যেটা কিনা ট্র্যান্সফরমার অপারেশন মেনটেনেন্সে জরুরী সেগুলি কখনো প্রাকটিক্যালি দেখানো হয় নি।

আমাদের একটা প্রোজেক্ট করতে দেওয়া হয়েছিল, বারুইপুরের ইলেক্ট্রিফিকেশন। বারুইপুরে কেউ গিয়ে ভিজিট করেছিল কিনা জানা নেই, সাবস্টেশন সম্বন্ধে কোন সম্যক ধারণাই ছিল না, তাহালেও প্রোজেক্ট জমা দিয়ে ভাল মার্কসহ এসে গেল।


ফল্ট লেভেল ক্যালকুলেশনের কলেজে শেখা ফান্ডা পরে কাজে লেগেছে। এটা পুরো থিয়োরী শেখা, ল্যাবে কিছু করনীয় ছিল না।

উপরে উদ্ধৃত জিনিসগুলো কিন্তু ফান্ডামেন্টল, আমি কমপলিকেটেড ৪০০কেভি টাওয়ার ডিজাইন বা, ৫০০ মেগাওয়াট জেনারেটর ডিজাইন বা তার হাতে কলমে শিক্ষা বলছি না

আমার মনে হয় পলিটেকনিকের যে ডিপ্লোমা কোর্স, শেখানে হাতে কলমে বেশী জোর দেওয়া হয়। ডিগ্রীর ক্ষেত্রে থিয়োরীটা বেশী। তাই ইন্জিনিয়ারিং পড়ে বেশীরভাগ আজকাল, কমপিউটার, ম্যানেজমেন্ট, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ইত্যাদি লাইনে সুইচওভার করছে। এক তো মাইনে বেশী, তুলনামূলকভাবে ফিজিক্যাল  খাটুনি কম। ক্যাচ টোয়েন্টিটু সিচুয়েশনের মত, ভাল ইন্জিনিয়ার বেরোচ্ছে কম, ম্যানুফ্যাকটারিং ইন্ডাস্ট্রী কমে আসছে, রোবটিক্স, সিএনসি মেশিন, অটোমেশনের কল্যানে ইন্জিনিয়ার লাগেও কম, তাই ওভারঅল ইন্জিনিয়ারের ডিমান্ড কম। স্টুডেন্টরা বেশী যাচ্ছে হোয়াইট কলার জবে। এই কারনে ইন্জিনিয়ারিং পড়ার ক্রেজ কমে আসছে। সবাই চাইছে কম্পিউটারের সামনে বসে বিনা ফিজিক্যাল লেবারে, মগজ খাটানোর কাজ।

আমার মনে হয় সত্যিকারের ইন্জিনিয়ার বানাতে গেলে, থিয়োরী কমিয়ে, ইন্ডাস্ট্রী ওরিয়েন্টেড কোর্স এবং নট মোর দ্যান থ্রী ইয়ার্স করতে হবে। নইলে খাতায় কলমে ইন্জিনিয়ার হয়েও, ডিগ্রী এবং কলেজের নাম ভাঙিয়ে ছাত্ররা অন্য প্রফেশনে সুইচওভার করবে।

দেবদত্ত

১৫/০৬/২০


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments