ধূসর অতীত (আঠারবাড়ীর ঘটনাবলী)

         আঠারবাড়ী রেল স্টেশন দূর থেকে
 
ধূসর অতীত পর্ব ২১
পুজোর ছুটি কাটিয়ে তাপস ফিরে গিয়েছে আনন্দ মোহন কলেজ হোস্টেলে। তাপস ফিরেছে একাই।
         তাপস ও শীলা - বিয়ে হয়েছিল ১৯৫৬ সালে জুন মাসে
আরতি, মিনতি রয়ে গিয়েছে আঠারবাড়ীতেই। কারণ বিদ্যাময়ী কর্তৃপক্ষ খবর পাঠিয়েছেন যে সরকারী আদেশ অনুযায়ী হোস্টেল  এই সময় খোলা হবে না। কবে খুলবে সেই সম্বন্ধে পরিষ্কার করে কিছু জানানো হয় নি। আরতি এখন উপরের ক্লাসে, সে কিছুটা চিন্তিত। তবে মিনতি খুব খুশী যে আপাতত স্কুলে যেতে হবে না। হোস্টেল তার ভাল লাগে না, কড়া নিয়মকানুন, খেলার বেশী সময় নেই, তার উপর দিদিমনিদের বকুনি তো আছেই। বাড়ীতে, আঠারবাড়ী  এম সি স্কুলের মাস্টারমশাই এসে লতিকা পিসী দুই বোনকে নিয়ম করে পড়িয়ে যান। দুই বোনের আজকাল সেলাই শেখার খুব শখ হয়েছে। কিরণবালা ছুঁচের কাজে খুব দক্ষ। তিনি দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়ে কাজ শুরু করেন।তবে সূচীশিল্পকর্ম মানে কিছুটা ধৈর্যের পরীক্ষা।

কাথার মাঝখানে তিনি একটা ময়ূরের ডিজাইন করছিলেন। আরতি আর মিনতি এসেছে তারাও শিখবে কাঁথা বানান। কিরণবালা তাদের প্রথমে সাইডের বর্ডার দিতে লাগালেন। কয়েকদিন বেশ উৎসাহের সঙ্গে, আরতি, মিনতির কাঁথার কাজ চলল। পরেরদিকে মনে হল কাজটাতে একঘেয়েমি এসে যাচ্ছে। তখন দুজনে মিলে যুক্তি করে বায়না ধরল যে তারা উল বুনবে। তারজন্য তাদেরকে ক্রুশ কাটা আর উল কিনে দিতে হবে। কিরণবালা জানেন, এই বয়েসে হঠাৎ করে কত কি শখ জাগে, আবার দুদিন পরে তা চলেও যায়। তিনি দুই মেয়েকে বল্লেন- ‘তোরা আগে পুরো কাঁথার বর্ডার লাগাবি, তারপর উল-কাঁটা কেনার কথা ভাবা যাবে। 

লতিকা একটা বই এনেছে লাইব্রেরি থেকে। বইটির নামশিশুগল্পিকা গল্পগুলি যেমন সুন্দর, তেমনি পৃষ্ঠাগুলি সব সবুজ কালিতে লেখা, আর গল্পের সাথে আঁকা ছবিগুলোরও তুলনা নেই। একটা গল্প লতিকার খুব পছন্দ হল। তপতীকে সে মাঝে মাঝে গল্প শোনায়। এই গল্পটা সে একদিন তপতীকে শোনাল। গল্পটার বিষয়বস্তু কিছুটা ছিল এইরকম:-

এক বাড়ীতে থাকে মিনু আর তার দাদা, সঙ্গে বাবা মা। ফুটফুটে সুন্দর মিষ্টি মেয়ে, টানা টানা চোখ, মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। মিনু ছটফটে, দুরন্ত। তার হাজারো প্রশ্নের জ্বালায় বাবা মা পেরে ওঠেন না। মিনু বুদ্ধিমতী, ছোট বেলা থেকে সে লক্ষ করে দাদা ছেলে বলে তার প্রতি বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ব বেশী। খেতে বসলে বড় মাছটা দাদা পায়, ভাইফোটায় দাদাকে সে ফোঁটা দেয়, সঙ্গে উপহার, পুজোতে দাদার জামা প্যান্ট বেশী দামী, দাদা বেশীক্ষণ বাইরে খেললেও কেউ বকে না, মিনুর বেলা খালি মায়ের মুখঝামটা। মিনুর মনে বাজে এই একপেশে বিভেদ। সে ভাবে যদি আমি বাড়ী থেকে দূরে কোথাও চলে যাই, তখন সেটা হবে বাবা মার পরীক্ষা, তারা তাকে কতটা ভালবাসে সেটা বোঝা যাবে। মিনু ঠিক করল যে দিকে দুচোখ যায়, সে বেড়িয়ে পড়বে। কিন্তু মেয়ে হয়ে বেরোলে বাচ্চা বলে সে ধরা পড়ে যাবে। তাই মিনু ঠিক করল গতবার দাদা পূজোতে যে সুট আর হ্যাট পেয়েছিল সেটা পরে, মিনু ছেলে সেজে বেরোবে। যা ভাবা তাই কাজ। দাদার কোটটা মোটামুটি ফিট হয়ে গেল, কিন্তু প্যান্টটা লম্বা। কি আর করা। মিনু মায়ের সেলাইমেশিনের কাচি নিয়ে এসে প্যান্টের তলাটা কেটে ছোট করে নিল। টুপিটা পরতে গিয়ে এক সমস্যা। মাথার চুল বেরিয়ে থাকছে। মিনুর অত সুন্দর ঝাঁকড়া চুল। কিন্তু মিনু ঠিক করেছে সে বাবা মাকে বুঝিয়ে ছাড়বে মিনু বিহীন বাড়ীতে তারা কি করে থাকে। চোখের জল চেপে মিনু তার চুল, সেই কাঁচি দিয়ে খানিকটা কেটে নিল। চুলগুলো উপরে করে হ্যাটটা পরে নিল। দাদার হ্যাটটা তার মাথায় একটু ঢিলে হচ্ছিল। এখন চুল উপরে করে হ্যাট পরাতে, হ্যাটটা মাথায় বেশ ফিট হয়ে বসল। মিনু আয়নায় নিজেকে দেখে আর নিজে চিনতেই পারে না। দিব্যি ছেলেদের মত লাগছে। এরপর বাবার পার্স থেকে টাকা বার করে মিনু বেরিয়ে পরল, অজানার উদ্দেশে। বাড়ীর কাছেই বড় রাস্তা। মিনু এই প্রথম একা বাসস্টপেজে। বেশ ভয় ভয় করছে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সাহস হল না। দাদার দামী প্যান্ট কেটেছে দেখলে মা কি তাকে আস্ত রাখবে। যা আছে কপালে। মিনু হাওড়া স্টেশন লেখা একটা বাসে উঠে পড়ল। সবাই মিনুকে চেয়ে চেয়ে দেখল। কেউ কিছু বলল না। মিনু বুঝল তার ছদ্দবেশ ভালই হয়েছে। হাওড়া স্টেশনে নেমে, মিনু ঢুকে পড়ল প্লাটফর্মে। একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। মিনু তাতে চড়ে বসল। ট্রেন একটু পরে ছেড়ে দিল। মিনুর বুক ঢিবঢিব করছে। পাশে তার বাবার বয়সী একজন বসে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-‘খোকা তুমি কোথায় যাবে। মিনু জানে না ট্রেন কোথায় যাচ্ছে, সে বল্ল-‘মামা আপনি কোথায় যাবেন। ভদ্রলোক বল্লেন আমি যাব বর্ধমান। মিনু বল্ল - হ্যাঁ মামু আমিও বর্ধমানে নামব। একটু পরে চেকার এসেছে। সবাই টিকিট দেখাচ্ছে। চেকার ভাবলেন এই বাচ্চা ছেলেটার কেউ নিশ্চয়ই অভিভাবক আছে। কিন্তু মিনুর টিকিট কেউ দেখাল না। তখন চেকার মিনুকে জিজ্ঞাসা করলেন-‘টিকিট কোথায়’, তোমার সঙ্গে কে আছে। মিনু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পাশের লোকটিকে দেখিয়ে বল্ল, এই যে আমার মামা, টিকিট দেবে। পাশের ভদ্রলোক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বল্লেন-‘কি ডেঁপো ছেলে, কস্মিনকালেও আমি ওকে চিনি না, আমি ওর মামা হব কোথা থেকে। চেকার বল্লেন-‘এই যে ছোকরা, তোমার সাহস তো কম নয়, বিনা টিকিটে যাচ্ছ, তার উপর মিথ্যা কথা। এই তো ব্যান্ডেল স্টেশন এল, নাম বাছাধন আমার সঙ্গে। রেলপুলিশের হাতে তোমায় হ্যান্ডওভার করব।মিনুকে নিয়ে তিনি ট্রেন থেকে নামলেন। মিনু বেচারার পুলিশে ভীষন ভয়। সে চেকারের হাত ছাড়িয়ে পালাতে গেল। চেকার দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেললন। তিনি প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললেন -‘ তো প্রচন্ড গুন্ডা বদমাইশ লাগছে। দাঁড়া তোকে শিক্ষা দিচ্ছি।এই বলে চেকারসাহেব সপাটে মিনুর গালে এক চড় মারলেন। নিমেষের মধ্যে মিনু কেঁদে ফেলল আর তার হ্যাট চড়ের ধাক্কায় মাথা থেকে ছিঁটকে পড়ল, মিনুর ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল তার সুন্দর মুখের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। চেয়ার এবং আশেপাশের লোক বিস্মিত। সবাই হৈ হৈ করে উঠল- ‘ মা এতো ফুটফুটে বাচ্চা একটা মেয়ে।মিনুর চোখের জল আর আধ স্ফুরিত অধরের ফোঁপানি দেখে, চেকারসাহেব যারপরনাই ব্যাথিত দুঃখিত। তিনি মিনুকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন- ‘কাঁদে না মামণি। কে বলেছে তোমার টিকিট লাগবে। কোথায় তোমার বাড়ী? তুমি বাড়ী থেকে কেন একা এসেছ? ভয় পেয়ো না, আমি তোমায় বাড়ী পৌছে দেব। তোমার মুখ দেখি শুকিয়ে গিয়েছে। চল কিছু খাবে চলএরপর তিনি মিনুকে দোকানে নিয়ে গিয়ে চকলেট, মিষ্টি কিনে দিলেন।

সেদিন বিকাল চারটে নাগাদ মিনুকে নিয়ে রেলপুলিশ মিনুর বাড়ীতে হাজির। মিনুর মা এতক্ষণ কান্নাকাটি করছিলেন, বাবা থানায় যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন।  মিনু আসাতে সাড়া বাড়ী জুড়ে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। মিনু মন মনে ভাবল-‘ভাগ্যিস, আমি মেয়ে হয়েছি বলেই না  আজ এত আদর পাচ্ছি। আমার জায়গায় দাদা হলে এতক্ষন শ্রীঘরে থাকতে হত। মেয়ে হয়ে জন্মানো অনেক ভাগ্যি, সবাই কতো আদর করে।

 

এই গল্পটা তপতীর খুব পছন্দ। তাকে মাঝে মাঝে গল্পটা শোনাতে হয়। তবে, লতিকা আজকাল শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ছে। বাঙালী সমাজজীবনের চিত্র এবং সাধারন মানুষের দোষ, গুন, ভাল, মন্দ নিয়ে লেখা গল্প বা উপন্যাস লতিকার মন ছুয়ে যায়। 

শীত পড়ে গিয়েছে। সেদিন সকালে কিরণবালারাখালকে দিয়ে, খাটের তলা থেকে লেপের গাঁটরী বার করে, লেপগুলিকে রোদে দিচ্ছিলেন। ওদিকে হরকুমার বসে সব ঘরের হ্যারিকেন নিয়ে তার কাঁচ সাফ করছে। এরপর হ্যারিকেনে কেরোসিন ঢালাটাও একটা কাজ। এর মধ্যেই, পিওন চিঠি নিয়ে এসেছে। চিঠি এসেছে মিনতির নামে। মিনতি রোমাঞ্চিত। এই প্রথম তার নামে চিঠি। বেশ টাইপ করে তার নাম লেখা। প্রেরক -‘মনিমালা সঙ্ঘ, ময়মনসিংহ আঠারবাড়ীর জমিদারের মেয়ে উমাদির হাত দিয়ে, আরতি কলকাতায় মনিমেলার হেডঅফিসে চিঠি লিখেছিল। সেই চিঠির জবাবে, হেড অফিস থেকে চিঠি এসেছে ময়মনসিংহের ব্রাঞ্চ অফিসে। তাঁরাই চিঠি দিয়ে সম্মতি দিয়েছেন। মিনতি চিঠি নিয়ে দিদিকে, লতিকা পিসিকে দেখাল। ঠিক হল বিকালে আশেপাশের যত সমবয়সীরা আছে সবাইকে ডেকে মনিমেলার কথা বলা হবে। সেখানে কি কি হয়, কি নিয়মাবলী আছে সব আলোচনা হবে। নিজের নামে আসা চিঠিটা বাবাকে দেখানোর জন্য মিনতি উসখুস করতে লাগল। মা কে বলে তিন বোন আরতি, মিনতি, তপতী বেরোল কাছারী বাড়ীর দিকে। তাদের সঙ্গে জুটে গেল যতীন্দ্র মোহনের পোষা পাহাড়ী কুকুর, নাম তার বাঘা। সে হিমালয়ান শিপডগ। তাকে শিশু অবস্থায় যতীন্দ্র মোহন কিনে এনেছিলেন দার্জিলিং থেকে। সে এখন পূর্ণবয়স্ক। পাহাড়ী কুকুর, গরমকালে তার কষ্ট, দুপুরের দিকে খাটের তলায় তার বেশী সময় কাটে। তবে শীতকাল এলেই তার লাফালাফি বেড়ে যায়। জমিদারের বড় মেয়ে অমিয়া তাকে একটা ডগবোন দিয়ে গিয়েছিল। সেটা আজকাল বাঘার খুব প্রিয়। ডগবোনটা সঙ্গে নিয়ে সে চলেছে সবার আগে আগে। যতীনবাবু সব শুনে বল্লেন-‘ভালই হইসে, তোদের ইস্কুল খোলার তো কিছু আশা দেখি না, বাসায় মাস্টারের কাছে শিক্ষা নিতাসস, বিকালে খেলাধূলা করা, নানারকম হাতের শিক্ষা এগুলি করলে শরীর সুস্থ থাকব।


পুজোর পর, তাপস ময়মনসিংহ হোস্টেলে ফিরে এসেছে মাস দুয়েকের উপর। আর দুইদিন পরেই ইংরাজী বছরের শুরু। তবেমর্নিং শোজ দি ডেজ মত সামনের বছরটা ভাল কাটবে কিনা তাপসের মনে সন্দেহ জেগেছে। কয়েকদিন আগে কলকাতা শহরে জাপানীরা বোমা ফেলেছে। তাপসের বন্ধু সৈয়দ নজরুল একটা দৈনিক সংবাদপত্রআজাদনিয়ে এসেছিল। এই কাগজটা ঢাকা থেকে প্রকাশ হয়। তাতে লিখেছে, কলকাতা পোর্টের অনেক ক্ষতি হয়েছে, অনেক বোমা কলকাতা শহরের মধ্যে যে গড়ের মাঠ ছিল, সেখানে পড়েছে।



এজন্য হতাহতের সংখ্যা নগন্য। রোজ কলকাতায় ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। অনেকে নাকি শহর ছেড়ে দেশের বাড়ীতে চলে যাচ্ছে। তাপস মাঝে একদিন গিয়েছিল বিদ্যাময়ী স্কুলে, এটা জানতে হোস্টেল কবে খুলবে। হোস্টেল ওয়ার্ডেন হেমাঙ্গিনী মিত্র জানালেন, এখন হোস্টেল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। এর কারণ, গোরা মিলিটারীরা আসছে, জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে, তারা এই হোস্টেলে থাকবে। জাপানের সঙ্গে একদিকে বার্মা আর অন্য ফ্রন্টে চীনের লড়াই চলছে। 

দুর্গাপুজার সময়ও তাপস ভাবে নি, ঝট করে দেশের মধ্যে একটা যুদ্ধের আবহাওয়া দেখা দেবে। নজরুল, তাপস, প্রভাত সেদিন ময়মনসিংহের প্রধান সড়ক, কাছারী রোড ধরে শশী লজে বেড়াতে গিয়েছিল। লাল রংএর খুব সুন্দর বিল্ডিং।

শশী লজ

মুক্তাগাছার জমিদার এর মালিক। শহরে এলে তিনি এখানেই ওঠেন। ভিতরে শ্বেতপাথরের ম্যাডোনার অপূর্ব মূর্তি। গেটের ভিতরে ঢোকার অনুমতি নেই। দারোয়ান বল্ল, এই মূর্তি আনা হয়েছে ইটালী থেকে। ফেরার পথে তাপস বল্ল- ‘আমার বোনেদের হোস্টেলে মিলিটারী থাকবে বলছে।হঠাৎ করে এদেশে কি এমন ঘটল? নজরুল বল্ল- ‘তুমি জান না বছরখানেক  আগেই তো অমেরিকা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। অমেরিকার অনেক যুদ্ধজাহাজ ছিল হনলুলুতে পার্ল হারবার  নামে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা দ্বীপে। সেখানে এই তো গতবছর  ৭ই ডিসেম্বর জাপানীরা বোমা ফেলে সব যুদ্ধজাহাজ নষ্ট করে ফেলেছে। তার পরদিনই তো অমেরিকার প্রেসিডন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে, জাপান জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা দিয়েছে। এখন লড়াই জমে উঠেছে।’   প্রভাতের কাকা ভারতীয় সৈন্যবাহিনীতে আছে। প্রভাত বল্লহ্যা, আমার কাকা তো এখন বার্মাতে ওয়ারফ্রন্টে আছে 

কয়েকদিনের মধ্যে খবর এল, এবার তাপসদের হোস্টেল খালি করে দিতে হবে। কয়েকজন ছাত্র ক্লাস মনিটার মিলে যাওয়া হল প্রিন্সিপালের ঘরে। প্রিন্সিপাল বল্লেন- কলেজ কর্তৃপক্ষের কিছু করার নেই, সরকারী আদেশ, তোমরা মেস করে থাক বা আত্মীয়ের বাড়ীতে গিয়ে কিছুদিন থাক।পনের দিন সময় হোস্টেল ছাড়ার। তাপস চিঠি দিল বাবাকে সব জানিয়ে। জমিদার প্রমোদবাবুর একটা ছোট বাড়ী আছে ময়মনসিংহতে। যতীনবাবু বা কাছারীর অন্যন্য কর্মচারীরা ময়মনসিংহ গেলে ওখানেই রাত্রিবাস করেন। কিন্তু সেখানে রান্না করার লোক নেই। নরেন্দ্র মোহন এসব পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য, যতীনবাবুর ডানহাত। যতীনবাবুর কথায়, নরেনবাবু, তার পরিচিত রায়ের বাজারের এক দোকানদারের ভাইকে ধরে আনলেন। তার নাম সুধীর। সে নাকি রান্না করতে পারে। আপাতত সে বাড়ীতেই বসা। তার মাইনে ঠিক হল দশ টাকা। যতীনবাবু আরো পঞ্চাশ টাকা দিলেন, ট্রেনভাড়া, ময়মনসিংহতে বাজার করার জন্য। সুধীর মিনতি করতে লাগল, তাকে দুইমাসের বেতন অগ্রিম দেওয়ার জন্য। বাড়ী থেকে চাল, ডাল, তেল দিয়ে দেওয়া হল, সঙ্গে সত্তর টাকা যাতে মাসখানেক ওতেই চলে যায়। কিরণদেবী কিছু তক্তি বানিয়ে কৌটার মধ্যে করে দিয়ে দিলেন। যতীনবাবু তাকে দুটো পুরানো ধুতি, শার্ট আর একটা আলোয়ানও দিয়ে দিলেন। শীতও পড়েছে। সুধীরকে দেখে বেশ গরীব মনে হল। যতীনবাবু নিশ্চিন্ত, যাক, এবার আর তাপসের অসুবিধা হবে না। তাপস হোস্টেল থেকে যাওয়ার আগেই সুধীর পৌছে যাবে। তাই চিন্তা নাই। সুধীর সব পরিস্কার করে রাখবে আগে থেকে। নরেনবাবু সেইমত নির্দেশ দিয়ে সুধীরকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলেন। 

কয়েকদিন পরে ডাত্তারখানার কম্পাউন্ডার তলাপাত্র ডিসপেনসারীর ঔষুধ কিনতে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহতে। তিনি এসে যা খবর দিলেন, তাতে সবার মাথায় হাত। সুধীর তো ময়মনসিংহে যায়ই নি। তাপস বেচারা নাকি নূতন বাসায় গিয়ে একলা হিমশিম খাচ্ছে। সকালে কি দুপুরে বাইরে পাইস হোটেলে খায়। হোটেলটা কলেজের সামনে। কিন্তু রাতে খুব অসুবিধা। যতীনবাবু তড়িঘড়ি করে নরেনকে ময়মনসিংহ পাঠালেন, তার বন্ধু রসময় দাসের বাড়ীতে। রসময় তার ছোটবেলার বন্ধু। দুজনে একসঙ্গে স্কুলে পড়তেন। রসময় এখন ময়মনসিংহ কোর্টের পেশকার। পরিবার নিয়ে সে সরকারী কোয়ার্টারে থাকে। কোর্টের কাজে ময়মনসিংহ গেলে তার সঙ্গে যতীনবাবুর দেখা হয়। রাতে সাধারনত, যতীনবাবুর খাওয়ার নেমন্তন্ন থাকে রসময়ের বাড়ীতে। যতীনবাবু অবশ্য প্রতিবারই কিছু না কিছু নিয়ে যান রসময়ের বাড়ীর জন্য। যতীনবাবু রসময়কে চিঠি লিখে সব পরিস্থিতি জানালেন এবং অনুরোধ করলেন যে তাপস কিছুদিন রসময়ের বাসায় থাকবে। সেইমত সব ব্যবস্থা হল। তাপস চলে এল রসময়কাকার বাড়ীতে। তাপসের ভালই হল। তবে একটা ব্যাপার হল রসময়বাবুরা বৈষ্ণব। রসময়বাবু তার স্ত্রী রাধারাণী দেবী দুজনেই কন্ঠীধারী। তারা মাছ খান বটে তবে হেসেলে পেয়াজ রসুন ঢোকে না। রোজ সন্ধ্যায় বেশ কিছুক্ষণ ভজন, কীর্তন হয়। কয়েকবার রসময়বাবু তাপসকেও নিয়ে বসেছেন আসরে। মন্দিরা দিয়ে বলেছেন, তুই এটা বাজাতে বাজাতে চোখ বন্ধ করে ভজন শোন, দেখবি মনটা কেমন কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর হয়ে উঠবে। তাপস তো এমনিতে ঠাকুর দেবতা থেকে শতহস্ত দূরে। কিন্তু রসময় কাকাকে সোজাসুজি না বলতেও বাধো বাধো ঠেকে। কয়েকদিন পরে তাপস পড়াশুনা, পরীক্ষার দোহাই দিয়ে ভজনের আসর থেকে নিস্কৃতি পেল।

এদিকে নরেন্দ্র মোহন রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন। সুধীর যে তার মুখে এরকম চুণকালি মাখাবে, তা তিনি ভাবতেও পারেন নি। তিনি গোপনে খবর লাগিয়ে জানতে পারলেন, সুধীর গৌরিপুরে নেমে তার শ্বশুরবাড়ী, শালিহার, পূর্বপাড়া গ্রামে গিয়ে মুদির দোকান দিয়েছে। নরেনবাবু তক্কে তক্কে রইলেন- ব্যাটা নিশ্চয়ই কিছুদিন পরে আসবে, তার দাদার বাসায়। কিছুদিন পরে খবর পাওয়া গেল সুধীর এসেছে। তাকে পেয়াদা দিয়ে ধরে আনা হল। সুধীর এসে যতীনবাবুর দুই পা জড়িয়ে ধরে মাপ চাইতে লাগল। নরেনবাবু ছাড়ার পাত্র নন। সুধীরকে হাত পিছমোড়া করে বেধে কষে জুতো পেটা করলেন। সুধীর তো বাবা গো , মা গো বলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে লাগল। হঠাৎ বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। যতীনবাবুর ছোট ছেলে আশিস, তার বয়স বছর আড়াই হবেসে গুটি গুটি পায়ে বাইরে এসেছে। এরকম পেটানো দেখে সে জুড়ে দিয়েছে কান্না।

ক্রমশঃ


ধূসর অতীত পর্ব ২২

চৈত্র শেষের দিক। বেশ গরম পড়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগেও বিকালে সান্ধ্যভ্রমনের সময় সুন্দর বসন্তের হাওয়া ছিল। কাছারীবাড়ীর সিঁড়ির পাশের পলাশ গাছটায় লাল ফুল ভারি সুন্দর লাগত দেখতে। যতীনবাবুর বরাবরই ফুলের শখ। বছর তিনেক আগে জমিদার প্রমোদকাকাকা আর সাহেব ম্যানেজার লিডওয়ার্ড সাহেবের সঙ্গে দার্জিলিং গিয়েছিলেন বেড়াতে।

               দার্জিলিং এর ম্যাল
যতীনবাবু  চোখ বুজলে এখনও কাঞ্চনজঙ্ঘার হিমশৈলী দেখতে পান। জায়গাটা ভারী সুন্দর। তাদের লজের জানালা দিয়ে মেঘ ঢুকে এসেছিল। যতীনবাবুর চোখে ছিল অপার বিষ্ময়। ম্যলে যেতেন রোজ বিকালে। ভর্তি সাহেব মেম। মনে হয়েছিল যেন বিদেশে এসে পড়েছেন।যতীনবাবু দার্জিলিং থেকে ম্যাগনেলিয়া-গ্যান্ডিফ্লোরা গাছ নিয়ে এসেছিলেন।  সেটা যত্ন করে কাছারীবাড়ীর সামনে লাগিয়েছিলেন।

দশটাকা দাম দিয়ে কেনা সার্থক হয়েছে। লিডওয়ার্ড বলেছিলেন, তাদের দেশ এমেরিকাতে এই গাছটার খুব কদর। সারাবছর সবুজ পাতা থাকে। অনেক উঁচু হয়।  গাছটা এরমধ্যেই একতলা বাড়ীর উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে সবচেয়ে সুন্দর এর সাদা রংএর ফুলগুলি। এইসময়টাতেই ফুল ফোটে। গন্ধটা অনেকটা লেবু আর সিট্রালেনা মেশানো। কাছারীবাড়ীর বারান্দার পাশে একটা বেলফুল গাছও আছে। যতীনবাবুই মালিকে বলে বাঁশের কঞ্চি লাগিয়ে সেটার মাচা তৈরী করেছেন। বিকালে যাওয়ার সময় হাতে করে বাড়ী নিয়ে যান। এখন বেলফুল ফোটা শুরু হয়েছে। বর্ষা অব্দি থাকবে। 

গেলবার আউষ ধানের ফলন ভাল হয় নি। অথচ গভর্নমেন্ট ট্যাক্সে কোন ছাড় দেয় নি। নামেই স্বায়ত্বশাসন। সত্যি কথা বলতে প্রভিনশিয়াল গভর্নমেন্টের হাতে অর্থনৈতিক ডিসিশন এর ক্ষমতা নাই। কৃষকদের ঘরে মজুদ চালের পরিমাণ খুব কম। খোলাবাজারে চালের দাম দ্বিগুণ। কানাঘুষোয় শুনছেন আরো দাম বাড়তে পারে। বার্মা থেকে পূর্ববঙ্গে চাল আসত। এবার যুদ্ধের জন্য তাও বন্ধ। গেলবার তার পারিবারিক তালুক রামেশ্বরপুরে অনেকটা জমিতে পাট লাগিয়েছিলেন। দাম ভালই পেয়েছেন। তবে খাজনাপত্র, প্রজাদের খরচা দিয়ে বিশেষ কিছু থাকে না। তাপস, আরতি, মিনতির স্কুল, হোস্টেলের খরচা, ছোটভাই পরিমল হোসেনপুরের স্কুলে পড়ে। আঠারবাড়ীর মহিমচন্দ্র বিদ্যালয় কিছুদিন আগেও ক্লাস এইট অব্দি ছিল। যতীনবাবু নিজেই উদ্যোগ নিয়ে ময়মনসিংহতে ডিস্ট্কিক্ট ইন্সপেক্টর অফ স্কুলসের কাছে আবেদন পত্র জমা দিয়েছিলেন। তাতে কাজ হয়েছে। যিনি স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন, যতীনবাবু কথায় কথায় জানতে পারলেন ইনিসপেক্টারও স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে পাশ করেছিলেন। যতীনবাবুরই সমসাময়য়িক। তাই সহজেই আবেদন মন্জুর হয়ে গেল। কিছুদিন আগে মহিম চল্দ্র বিদ্যালয় হাইস্কুলে উন্নীত হয়েছে। চারজন নূতন টিচারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশেপাশের অনেকেই যতীনবাবুকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। যতীনবাবুর বোনপো হরিদাস বারহাট্টা স্কুল থেকে ফোর পাস করে এখন মামাবাড়ী থেকে হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে।


দুপুরে খাওয়ার সময় যতীনবাবু তার সেজ ভাই নরেনকে বল্লেন- বোরো ধান আর কিছুদিন পরেই কাটা হবে। চাল যতটা সম্ভব এনে চৌকরী ঘরে রাখতে হবে। যুদ্ধের সময়। জিনিষপত্রের যোগানের ঠিকঠিকানা নাই। 

আজ বাঙলা শুভনববর্ষ। যতীনবাবু, বিজয়বাবু নরেনবাবু  বেরিয়েছেন হালখাতা সারতে। রায়ের বাজারে পরিচিত দোকান অনেক। তবে মাসকাবারী মুদীখানা মিস্টির দোকান এই দুইখানে সময় কাটল বেশী। মুদির দোকানের মালিক বামাচরণকে বল্লেন - শুভ নববর্ষ, সামনের বছর তোমার ভাল কাটুক। বামাচরণ, যতীনবাবুকে নমস্কার কর বল্ল- নূতনবছর ভাল কাটুক আপনারও। তবে কি বড়কর্তা, চারিধার্ দ্যাখতাসি অশান্তির পরিবেশ। ব্যাবসায় মন্দা যাইতাসে। মাগ্গীগন্ডার বাজারে খরিদ্দার কম পাই। আড়তদাররাও চাল ডাল মজুদ করতাসে। কয় কি দাম বাড়ব, তখন লাভ উঠাইব। সরাসরি তো কয় না। আন্দাজ করি। আপনারে কই বড়কর্তা, ডাইলও স্টক কইরা রাখেন এই সময়। যতীনবাবুরও মনে হল বামাচরণ ঠিকই বলছে। দুই টিন সর্ষের তেল আর দু মন ডাল পাঠানর জন্য বলে এলেন মুদীখানায়।


নরেনবাবু জ্ঞানদা সুন্দরী প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারমশাই। মেয়েদের শিক্ষার প্রসার গ্রামে গন্জে এখনও কম। বিদ্যাসাগরই বঙ্গভূমিতে প্রথম নারীশিক্ষায় অগ্রনী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তার মৃত্যুও পঞ্চাশ বছরের বেশী হয়ে গেল, তবুও মেয়েদের পড়াশুনার ব্যাপারে আজও তেমনভাবে আগ্রহ নেই বাবা মায়েদের। শিক্ষিত বর্ণহিন্দুরাই মেয়েদের স্কুলে পাঠায়। নরেনবাবু দ্যাখেন ক্লাস থ্রী-ফোরে পড়তে পড়তে অনেক মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে।


কোনমতে বর্ণপরিচয়ের অক্ষরজ্ঞান আর হাতে একশ অব্দি গুনতে পারলেই মেয়ের বাবা মা খুশী। সেই তো বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ীতে গিয়ে হেঁসেল সামলাতে হবে। তবে নরেনবাবুর নিজের পছন্দ লেখাপড়া জানা মেয়ে। পড়াশুনা জানলে বই, পেপার পড়া যায়, বাইরের জগতটাকে জানা যায়, মনের প্রসারতা বাড়ে। নরেনবাবুর সারাদিনে কাজ থাকে অনেক। তালুকের দেখভালের জন্য সপ্তাহে একদিন তো বেরোতেই হয়। বিকালে আবার লাইব্রেরিতে বসেন। লতিকা বা আরতিকে ডেকে নেন, যখন কলকাতা থেকে ডাকে নূতন বই আসে। পন্জীকরন, লাইব্রেরির স্ট্যাম্প লাগান, মলাট দেওয়া এইসব কাজগুলো লতিকা খুব মনোযোগ দিয়ে করে। তবে অলিখিত শর্ত হচ্ছে, নূতন বই এলে প্রথম পাঠিকা হবে লতিকা।


সেদিন বিকালে নরেনবাবু লাইব্রেরিতে বসে আছেন। সন্ধ্যা হয় হয়। এমনসময় লতিকা এল, সঙ্গে সমবয়সী একটি মেয়ে। নরেনবাবু ভাবলেন আশেপাশের বাড়ীর কোন মেয়ে। অন্ধকার হচ্ছে, তাই নরেনবাবু হ্যারিকেনটা জ্বালালেন। নূতন মেয়েটিকে চিনতে পারলেন না। লতিকা বল্ল, - সেজ-দাদা, হচ্ছে রাণী, সুধন্য কাকার শ্যালিকা। রাণী নরেনবাবুকে নমস্কার করল। নরেনবাবু প্রতিনমস্কার করতে ভুলে গেলেন। তিনি অচেনা মেয়ের সামনে তেমন সাচ্ছন্দবোধ করেন না। লতিকা জানাল কলকাতায় থাকে। দিদির বাড়ী বেড়াতে এসেছে। নরেনবাবুর মনে হল কিছু একটা কথা শুরু করা উচিত। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কেমন লাগছে আমাদের গ্রাম। রাণী বল্ল- খুব ভাল লাগছে। কি সুন্দর ফাঁকা ফাঁকা।  কোনটা সবচেয়ে ভাল লাগছে, নরেনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন। রাণী একটু ভেবে বল্ল- কি বড় বড় পুকুর এখানে। তাতে আবার পদ্মফুল ফুটে থাকে। ওটাই সবচেয়ে সুন্দর। লতিকা বল্ল - রাণী সাঁতার জানে না, তাই ওর খুব দুঃখ। নরেনবাবু বল্লেন-তা, তুই ওকে শিখিয়ে দে। লতিকা বল্ল - সে তো একমাস লাগবে। রাণী বল্ল- কি জানি, কতদিন থাকব, এখন অবশ্য জাপানি বোমারু বিমানের ভয় নেই। শীতকালে তো সন্ধ্যের পর বাড়ীতে সব দরজা জানালা বন্ধ করে বসে থাকতে হত।

কেন, কেন?

রাণী কলকল করে বলে উঠল- সে কি। ব্ল্যাকআউট জানেন না?

কিশোরীর গৌরবর্ণা সরল সুন্দর মুখখানির দিকে তাকিয়ে নরেনবাবু নিজের অজ্ঞতায় বেশ লজ্জা পেলেন। একটু সামলে নিয়ে বল্লেন- হ্যা শুনেছি বটে। তা আমাদের এখানে ওসবের ভয় ছিল না।  লতিকা আর রাণী দুটো বই নিয়ে চলে গেল।


নরেনবাবুর বেশ কৌতূহল হল রাণীর ব্যাপারে। ঠিক বুঝতে পারছেন না আকর্ষণটা কিসের। কায়দা করে একবার লতিকাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ওই যে তোর সঙ্গে সেদিন এল একটা মেয়ে, নামটা ভুলে গিয়েছি, কি পড়াশুনা করে কলকাতায়? কতদিন থাকবে? আর তো লাইব্রেরিতে এল না। লতিকা বল্ল- নাম মনে নেই যখন তখন এত খবরের কিসের দরকার?

নরেনবাবু কপট গাম্ভীর্য দেখিয়ে বল্লেন- হু, আমার বয়ে গেছে ওর খবর নিতে। লাইব্রেরির বইটা ওর কাছে আছে না। ফেরত দেবে তো? নইলে আবার আমার বিপদ।

ঠিক আছে। ঠিক আছে, বলে দেব বই ফেরত দিতে।

পরের দিন রাণী একাই এসেছে বই ফেরত দিতে। নরেনবাবু বই ফেরত নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-এবার কোন বই নেবে?

না বাবা আর বইয়ের দরকার নেই। যদি আমি বই নিয়ে কলকাতায় চলে যাই তখন আপনি কি করবেন?’

সেরেছে, লতিকাটা তো মহা দুষ্টু রাণীকে সব বলে দিয়েছে মনে হচ্ছে। মুখে বল্লেন- আরে না, কি যে বল। আমি চাই তো যে সবাই বই পড়ুক। তুমি এই বইটা নিয়ে যাও নূতন এসেছে।

নরেন রাণীকে খুশী করতে আনকোরা আনানো অবনীন্দ্রনাথেররাজকাহিনীবইটা দিলেন। 

দুদিন পরে লতিকা এসে বল্লসেজ-দাদা, লাইব্রেরিরতে আমি আর বেগার খাটব না। শুনতে পাচ্ছি নূতন বই অন্য কাউকে দেওয়া হচ্ছে। বলি ব্যাপারটা কি।’ 

নরেন ভুলে গিয়েছিলেন মেয়েদের মধ্যে গল্প বেশী হয়, তাই কোন কথা গুপ্ত থাকে না। তায় আবার লতিকা আর রাণী সই পাতিয়েছে। 

আমতা আমতা করে বল্লেন- মানে , আর কি। তখন আর উঠে আলমারী খোলার সময় ছিল না। হাতের কাছে যা ছিল, সেটাই দিয়ে দিয়েছি।

কয়েকদিন পরে সুধন্যবাবু তার পত্নীর সঙ্গে রাণী চলে গেল কলকাতায়। মাঝে একদিন নরেন গিয়েছিলেন সুধন্যবাবুর বাড়ী কোন একটা কাজে। কয়েকটা পদ্মফুলও নিয়ে গেলেন। কাজের জন্য এলেন না রাণীর সঙ্গে দেখা করার জন্য, কোনটা মুখ্য উদ্দেশ্য, সেটা নিজে বুঝতে পারছিলেন না। রাণীর সঙ্গে দেখা হল। ফুলগুলি তার হাতে দিয়ে বল্লেন- আজ বাড়ীতে অনেকগুলো ফুল এসেছিল, ভাবলাম কয়েকটা বৌদিকে দিয়ে আসি। রাণী মুচকি হেসে বল্ল, ফুলগুলি দিদির জন্য এনেছেন। আমার জন্য কি আছে? তাই তো, নরেনবাবুর মুখ ফুটে বলতে পারলেন না, যে ফুলগুলি তিনি রাণীর কথা ভেবে এনেছেন। তার খালি মনে হল এই সদ্য কিশোরী কন্যার কাছে তিনি বাকযুদ্ধে বারবার হেরে যাচ্ছেন। তবে হেরে গিয়ে তো রাগ হচ্ছে না, রাণীর প্রতি আগ্রহ বেড়েই চলেছে। সে কথাবার্তায় সাবলীল, নরেন আড়ষ্ঠ, মনের মধ্যে হাতড়াচ্ছেন, আর কি বলবেন।তবে ভাগ্য ভাল, তারিমধ্যে সুচরিতা(সুধন্য রায়ের স্ত্রী) এসে পড়েছেন। একটা ঠাকুরের সিংহাসন বানানোর কথা। সেই ব্যাপারে কথা হচ্ছে সুচরিতার সঙ্গে। রাণী উঠে গেল ভিতরে। একটু পরে চা নিয়ে এল। নরেনের মনে হল চা টা কি একটু বেশী মিস্টি। সেটা চিনির কল্যাণে না রাণী বানিয়ে এনেছে বলে, সেটা ঠিক ধরতে পারলেন না।

রাণী চলে যাওয়ার পর নরেন কয়েকদিন কাজকর্মে মন বসাতে পারলেন না। 


যতীনবাবুর পরের তিন ভাই এখন বিবাহযোগ্য। বাবা, রজনী মোহন গত হওয়ার পর থেকে, যতীনবাবুই সবার অভিভাবক।ফটন তো এখন  কলেজ পাশ দিয়ে ভাল চাকরী করছে। গতবার কালীপুজার সময় যতীনবাবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন - কি রে? চা বাগানে হাত পুড়িয়ে রান্না করছিস, এবার তোর বিয়ের জন্য মেয়ে দেখি। ফটন বড়দার সঙ্গে এসব কথাবার্তায় একটু আড়ষ্ট। সে বল্ল - আরে না, এখন তো আমার বাবুর্চি আছে। যতীনবাবু বল্লেন - তা না হয় হোল, ভাল চাকরী করছিস, তাই বলে সারা জীবন বাবুর্চি দিয়ে চলবে নাকি? ফটন বল্ল- আর বাকী দুই দাদা? তাদের বিয়ে না হলে আমি কি করে বিয়ে করি?

 ‘সে আমার দায়িত্বএই বলে শেষ পাতের ডালটা খেয়ে যতীনবাবু উঠে পড়লেন।

মেজ-ভাই মনির (বীরেন্দ্র মোহন) দোকানটা যতীনবাবু করে দিয়েছেন। সেটা থেকে যা নগদ আসে আর বিষয়সম্পত্তির যা ভাগ আছে তাতে, মনির সংসারধর্ম করতে অসুবিধা হবে না। যতীনবাবু ভাবেন মনিটা যা সোজা সরল, ওর জন্য নরম স্বভাবের মেয়ে দরকার।  নরেন স্কুলের চাকরী আর লাইব্রেরির কাজ মিলিয়ে ভালই মাইনে পাচ্ছে সেরেস্তা থেকে। তাই যতীনবাবু ঘটককে বলে রাখলেন দু জনের জন্যই কাছে পিঠের পাত্রীর খবর আনতে।   


বৈশাখের শেষাশেষি। কয়েকদিন ধরে গরমের চোটে প্রাণ ওষ্ঠাগত। পরিমল এসেছে গরমের ছুটিতে। তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ। পরিমল, হরিদাস আশেপাশের সমবয়সীরা পুকুরে নেমে আর আসার নাম করে না। রোজ ঘন্টা খানেক ধরে সবাই জলে ঝাপাঝাপি করে। হরিদাস একদিন আশিস কে নিয়ে এসেছিল পুকুরে। হরিদাস খুব চেষ্টা করল আশিসকে জলে নামানর। চকলেটের লোভ দেখানোর পরেও আশিসের কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। পরিমল একবার আশিসকে কোলে করে পুকুরের জলে নামাল, কিন্তু আশিসের চিলচীৎকারে তাড়াতাড়ি পুকুরের ঘাটে বসিয়ে দিল। 


সেদিন দুপুরের পরে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল। মনোরমা দিদিমনি সব বাচ্চকে ডেকে বাইরে নিয়ে এলেন। বাইরে তখন কালো মেঘের আস্তরণ ঢেকে ফেলেছে ধরণীতে। স্তব্ধ চরাচর। গাছের পাতাগুলোও একফোটাও নড়ছে না। একটু পরে হাওয়া দিল। কী আশ্চর্য, ঠান্ডা শীতল হাওয়া। মুহুর্তের মধ্যে এসে গেল ধুলার ঝড়। মনিও বেরিয়ে এসেছে দোকান ছেড়ে। কিরণবালা, দিদিমনি আর লতিকা তাড়াতাড়ি বাড়ীর মধ্যে ঢুকে গেলেন দরজা জানালা বন্ধ করতে। সেই ফাঁকে হরকুমার, পরিমল আর রাখালের পিছন পিছন দৌড়াল সব বাচ্চারা। কাছারীবাড়ীর পাঁচিলের দরজা পেরিয়ে, বাগিচা পুকুর আর মহিম চন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঝে তিনটে বড় বড় আম গাছ। অনেক আম হয়েছে। স্কুলের ছেলেরা সুযোগ পেলেই ঢিল মেরে কাঁচা আম পাড়ার চেষ্টা করে। তবে স্কুলের দারোয়ান সনাতনের সজাগ দৃষ্টি ছাড়িয়ে আম পাড়া কঠিন। তাছাড়া হাতের টিপ থাকা চাই। আঠারবাড়ীর ডিহি কাছারীর নূতন ম্যানেজার হরেকৃষ্ণ সান্যালের ভাইপো নবু সবে এসে হরিদাসের ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। তার হাতে খুব টিপ। হরিদাস, হরকুমারকে ধরে একটা গুলতিও বানিয়েছে। নবুর সঙ্গে মিলে দুজনে সুযোগ পেলেই আম গাছের কাছে হাজির হয়। কালবৈশাখীর ঝড়ের দৌলতে আজকে যেন লটারী লেগেছে। ধুলোর ঝড়ের মধ্যে চোখ আর্ধেক বন্ধ করে যখন আমবাগানে সবাই পৌঁছেছে, তখন আমগাছের ডাল হাওয়ায় দুলছে। বেশ কিছু আম ঝড়ের কারনে নীচে পড়ছে। বাচ্চারা মনের খুশীতে আম কুড়াচ্ছে। হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে আকাশের বুক চিরে  বিদ্যুৎের চমক। ভয়ানক শব্দ করে বাজ পড়ল। হরকুমার চিৎকার করে বল্ল- ঠাঠা পড়তাসে, সাবধান। উচা গাছের সামনে থিক্যা হগলে পালাও সবাই দৌড়ে এসে কাছারীবাড়ীর বারান্দায়। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাচ্চাদের মধ্যে জোর কদমে চেঁচামেচি চলছে, কে কটা আম কুড়াতে পারল। যতীনবাবু হুটোপাটি শুনে কাছারীবাড়ীর নিজের ঘর থেকে বেরিয়েছেন। তিনি সব দেখেশুনে হুকুম দিলেন, সব আম নিয়ে দিদিমনির কাছে জমা দাও। এগুলো দিয়ে আচার হবে। 


ফটনের জন্য বেশ কয়েকটা সম্বন্ধ এসেছে। মনি আর নরেনের জন্যও ঘটক সম্বন্ধ এনেছে। দিদিমনি যতীনবাবু পরামর্শ করে নরেনের জন্য গৌরিপুরে পাল্টিঘরে একটি মেয়েকে পছন্দ করলেন। মনির জন্যও কিশোরগন্জের একটি মেয়েকে দেখতে যাওয়ার কথা হল। নরেন এখনও রাণীকে ভুলতে পারেন নি। তার কথাবার্তা সপ্রতিভ ভাবভঙ্গী নরেনের খুব পছন্দ হয়েছিল। তবে বড়দাকে একথা বলতে নরেনের খুব সংকোচ। তাই নরেন বড়বৌদি কিরণকে তার পছন্দের কথা জানাল। কিরণবালা শান্ত স্বভাবের। কোন জিনিষ নিয়ে অযথা তিনি বিরক্ত হন না বা হট্টোগোলের মধ্যে তিনি যান না। তিনি নিজেই পশ্চিমের হিস্যার সুধন্য রায়ের স্ত্রী সুচরিতাকে সব ব্যাপারটা জানালেন। সুচরিতা সব জানিয়ে তার মাকে চিঠি দিলেন। রাণীরও সম্মতি পাওয়া গেল। নরেনের ফর্সা, টানা ঋজু চেহারা আর সর্বপোরি তার সহজ সরল ব্যবহার, তারও ভাল লেগেছিল। আর মেয়েদের সহজাত বুদ্ধিতে ভালই টের পেয়েছিলেন নরেনের মনোভাব। পুরো ব্যাপারটা পাকা হওয়ার পর, কিরণবালা ঘটনাটা জানালেন যতীনবাবুকে। যতীনবাবু সব শুনে টুনে বল্লেন- ‘ঘটকবিদায়টা তো তোমাকেই দিতে হবে দেখছি’!  

ফটনের জন্য সিলেটের কনে ঠিক করা হল। মেয়েটি সিলেটের। নাম মনিকা।সেখান থেকেই স্কুল পাশ দিয়ে কলেজে পড়ে বিএ পাশ করছে। উচ্চশিক্ষিতা। পাত্রীর বাবার নাম ছিল প্রমোদ চন্দ্র নন্দী মজুমদার মা  সুবর্ণ প্রভা। ওনারা বহু দিন ধরেই সিলেট শহরের নিবাসী। প্রমোদ নন্দী মহাশয় ছিলেন সরকারী অডিটার।পরিবারে আর্থিক  স্বচ্ছলতা আছে। পাত্রীরা নয় বোন এক ভাই। সবাইশিক্ষিত পাত্রী সবার বড়। যতীনবাবুর বেশ পছন্দ হয়েছে সম্বন্ধটা। ধনে মানে সমগোত্রীয় হলে স্বামী-স্ত্রীর মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়। যতীনবাবু হেসে বড়মা মনোরমা দেবীকে বল্লেন- ভালই হলসিলেটের মেয়ে, ফটনের আসামের চাবাগানে মাছের সুবিধা নাই, নূতন বৌ শুটকি রেঁধে খাওয়াবে। 

মনির জন্যও পাত্রী ঠিক হল তার নাম সুমতি। কিশোরগঞ্জের কাছে আউষবঙ্গা গ্রামে তাদের বাড়ী। জায়গাটা আঠারবাড়ী আর কিশোরগন্জের মাঝে। যতীনবাবু আর বিজয়বাবু একদিন টমটমে চড়ে মেয়ে দেখে পাকা কথা দিয়ে এলেন। অনেকদিন পর রায়বাড়ীতে শুভকাজ। তাও আবার একটি নয়। তিনটে বিয়ে। 

শুভস্য শীঘ্রম। জমিদারবাড়ীর দুই পুরোহিত রাজেন্দ্র মোহন আর বিপিন মোহন পাঁজি নিয়ে হাজির হলেন যতীনবাবুর বৈঠকখানায়। সেখানে ঠিক হল বৌভাতটা একইদিনে করা হবে। একদিক দিয়ে ভালই হবে। সময়টা বৃষ্টি বাদলার সময়।  বিয়ে ঠিক হল ফটনের ৮ই অগাষ্ট। ৬ই অগাস্ট ফটনের দুই দাদার। ওই দুই দিনই পাঁজিতে বিবাহের শুভদিন দেখাচ্ছে। একদিনে করলে অনেকেই যে কোন একটি বিয়েতে যেতে পারবে। কাছাকাছি দুদিন হলে অনেকের পক্ষে দুটো বিয়েতে বরযাত্রী যাওয়া সম্ভব।


  ঠিক হল বিয়ের বাজার করতে ময়মনসিংহ যাওয়া হবে। কিরণবালা এই সুযোগে তাপসকেও দেখে আসতে পারবেন। লতিকা, আরতি মিনতি, তপতী সবাই ধরেছে তারাও যাবে। কিরণবালা ভাবলেন বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভাল। আঠারবাড়ীতে একলা মনোরমা দেবী এতজনকে সামলাতে পারবেন না। তাছাড়া পুজোর বাজারটাও এই ফাঁকে সেরে নেওয়া যাবে।

যতীন বাবু, কিরণবালা, মনোরমা দেবী, সবাই এসেছেন ময়মনসিংহতে। উঠেছেন আঠারবাড়ী লজে। হরকুমারও আছে। বাজার করা, রান্নার কাজ সবই তো আছে। তাপসও এসে গেল। কয়েকদিন মায়ের হাতের রান্না খাবে। যাওয়া হল ময়মনসিংহের সবচেয়ে বড় সোনার দোকানলক্ষী জুয়েলার্সে মালিক জয়গোপাল সাহা, যতীনবাবুর পূর্বপরিচিত। যতীনবাবুর বিয়ের গয়নাও এখান থেকে বানান হয়েছিল। এবার তিনটে বিয়ের গয়নাপত্র। জয়গোপাল হার, বালা, চুড়ি, বাউটির ডিজাইন দেখাচ্ছে। শেষমেষ পানপাতা ডিজাইনের লকেট ওয়ালা হার পছন্দ হল। সবকিছু অর্ডার করে যতীনবাবু কিছু অগ্রীম টাকা দিলেন। মাঝখানে তিনি একবার জয়গোপালের সঙ্গে কথা বলে নিলেন কিরণবালার চোখ এড়িয়ে। মনোরমা দেবী তার নিজের তিনজোড়া করে আংটি আর কানপাশা নিয়ে এসেছিলেন। সেগুলি পালিশ করতে দেওয়া হল। বিয়ের পর নূতন বৌদের আশীর্বাদ করার সময় দেবেন। পরের দিন সকাল থেকে বৃষ্টি। দিনের বেলা বেরোন গেল না। বিকালে দিকে কাছারী রোডে গেলেন। সেখানে অনেক শাড়ীর দোকান। যশোদা বস্ত্রালয়, সিদ্ধেশ্বরী স্টোর, কলকাতা শাড়ী ভান্ডার, ঢাকেশ্বরী শাড়ী সেন্টার- এগুলি বেশ বড়। প্রণামীর শাড়ী, বিয়ের বেনারসি শাড়ী দেখা হল। বিয়েতে পরিবারের সবার নূতন জামাকাপড় চাই। এছাড়া পুজার বাজার তো আছেই। বাচ্চাদের জন্য থানকাপড়ই নেওয়া হবে। আঠারবাড়ীতে পারিবারিক দর্জি বানিয়ে দেবে। বেশ বড় লিস্ট। সব কটি দোকান ঘোরা হল। তবে হ্যাজাকের আলোয় শাড়ীর রং বোঝা মুস্কিল। তাছাড়া সব দোকান ঘুরতে ঘুরতে রাত হয়ে গেল। পরের দিন সকালে রাস্তায় গটগট আওয়াজে সবাই বাইরে এসে দেখলেন, গোরা সৈন্যরা মার্চ কর যাচ্ছে। যতীনবাবু বল্লেন-এরাই সব হোস্টেলগুলোকে কব্জা করে রেখেছে। 

আরতি, মিনতি বায়না ধরেছে তারা স্টুডিওতে গিয়ে ফটো তুলবে। গেলবার পুজাতে, কিরণবালা একটা নূতন ডিজাইনের কলারওয়ালা জামা বানিয়ে দিয়েছিলেন মিনতিকে। মিনতি সেটা চুপিচুপি নিয়ে এসেছে। ওটা পরে সে ফটো তুলবে। যতীনবাবু বেড়াতে গেলে দরাজহস্ত।আজ সকালে মনোরমা দেবী বেরোন নি। সবাই মিলে যাওয়া হল কাছারী ঘাটে। সেখানেভাইভাই পাইস হোটেল ভাল ইলিশমাছ ভাত পাওয়া যায়। মাছের তেল আর পোড়ান শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভাত মেখে তার সঙ্গে দুপিস করে ইলিশ মাছ ভাজা সবাই খুব তৃপ্তি করে খেলেন। যতীনবাবুর মনে আছে কলকাতা যাওয়ার সময়, কয়েকবার তিনি গোয়ালন্দ ঘাটে এরকম ইলিশ খেয়েছেন। কেনাকাটি সম্পন্ন করে সবাই ফিরে এলেন আঠারবাড়ীতে। হরকুমারের সবসময় সজাগ চোখ ছিল বাক্স, ব্যাগের উপর। সব নূতন জামাকাপড়। চুরি হওয়া কিছু আশ্চর্য নয়। সবাই মিলে নির্বিঘ্নে পৌঁছালেন।

ফিরে আসার পর রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে যতীনবাবু ঘরে এসেছেন। একটু পরে কিরণবালা সব কাজ সেরে ঢুকলেন। যতীনবাবু বল্লেন - এদিকে এসে বসো দিকি। 

-‘আরে আগে বিছানাটা ঠিক করে নিই

-‘না, না আগে বোস আর চোখটা বন্ধ কর দেখি

যতীনবাবুর আর তর সয় না। কিরন বসতেই বল্লেন-‘দেখি হাত পাতো তো।

একটা ছোট্ট বাক্স কিরণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বল্লেন-‘নাও এবার চোখ খুলে দেখ দিকি। কিরণ সবিষ্ময়ে বাক্সটির খুলে দেখলেন তার মধ্যে একটা চন্দ্রমুখী হার।যতীনবাবু বল্লেন - ‘এই হচ্ছে তোমার ঘটকবিদায়ের প্রাপ্তি 

ক্রমশঃ


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments