ধূসর অতীত (যতীনবাবুর কর্মজীবন)
কিশোরগঞ্জ - পাকুন্দিয়া- হোসেনপুর ম্যাপ
ধূসর অতীত পর্ব ১৯
কালীপুজা অতিক্রান্ত। যতীনবাবুর যাওয়ার কথা ছিল কিশোরগন্জ আর হোসেনপুরের ডিহি কাছারী পরিদর্শনে। বৃষ্টি এবার আশানুরূপ হলেও, কাছারীর কর্মচারী মারফত খবর পেয়েছেন, এবারে একরকম রোগ হয়ে ধানগাছের পাতা গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ধানের ফলন কম হওয়ার আশংকা। যতীনবাবুর কপালে চিন্তার ভাজ। তিনি জানেন গভর্নমেন্টের রেভিনিউ অফিস, খাজনা উশুল করার ব্যাপারে খুব কড়া, সে ফলন কম হোক বা সাধারন ভাগচাষী না খেতে পেয়ে মরুক কি বাঁচুক। বেরোনোর কথা ছিল লক্ষীপূজার পরেই, কিন্তু তিনিই জমিদার প্রমোদকাকাকে বলে যাত্রা পিছিয়েছেন। ঐ সময়টাতে কয়েকবার ট্রেন অবরোধ হয়েছে, মায়মনসিংহ এবং কিশোরগন্জে। ঢাকা, বরিশাল, বগুড়া ইত্যাদি বেশ কিছু জায়গাতে থানা, পোস্টপিসে আগুন লাগানো হয়েছে। তার পরিচিত সরকারবাবুর ছেলে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্ররা পিকেটিং করবে এই আশংকায়, সেপ্টেম্বর মাস থেকে কলেজ বন্ধ করে, সব হোস্টেল খালি করে দেওয়া হয়েছে। কবে যে খুলবে সেটাও এখন অব্দি জানা যাচ্ছে না। কানাঘুষার শোনা যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, জাপানকে ঠেকাতে গোরা সৈন্যবাহিনী ভারতে ঢুকে পড়ে বেঙ্গলের দিকে আসছে। বার্মাও একটা ইংরেজ উপনিবেশ। সেখানে জোরকদমে ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে জাপানীদের যুদ্ধ চলেছে। যতীনবাবু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের সাক্ষী। তখন তিনি কলকাতা ইনসিওরেন্স অফিসে চাকরী করতেন। তাদের অফিসে ক্লেম সেটেলমেন্টের কেস অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অত্যাবশ্যকীয় জিনিষের দাম দুই তিনগুন হয়ে গিয়েছিল । সেবারের যুদ্ধে জাপান ছিল না। ভারতীয় ফৌজ সংখ্যাতে প্রায় তের লক্ষ, লড়াই করতে গিয়েছিল ইজিপ্ট, মেসোপটেমিয়া ও ইউরোপে। এবারেত মনে হচ্ছে যুদ্ধ ঘরের দোড়গোড়ায়। শোনা যাচ্ছে বার্মাতে জাপানিরা অনেকটা এগিয়ে এসেছে। আ্যংলো ব্রিটিশ ফৌজে বেশী ছিল বালুচ রেজিমেন্ট, নর্থ ওয়েস্টর্ন ফ্রন্টের সৈন্যরা ঐরকম জল-জঙ্গল, জোক অধ্যূষিত জায়গাতে অভ্যস্ত নয়। তাই ভারতীয় ফৌজ ক্রমাগত পিছু হঠছে। অনাগত ভবিষ্যতের আশঙ্কাতে যতীনবাবুর মন উদ্বেলিত হল।
কিশোকগঞ্জ রেল স্টেশনযতীনবাবু র এবারের সফরসঙ্গী বিজয়বাবু । সঙ্গে হরকুমারও আছে। হরকুমার থাকলে যতীনবাবু ভরসা পান।যতীনবাবুর কখন কি দরকার, খাওয়া দাওয়া সবেতেই প্রখর নজর তার। প্রতিভা ফেরত গিয়েছেন নেত্রকোনাতে। তাই কিরনবালা নিজে থেকেই বলেছেন হরকুমারকে নিয়ে যেতে। তাপসকে নিয়ে যেতে চেয়ছিলেন। কিন্তু তার কলেজ খুললেই পরীক্ষা। তাই সে রাজী হয়নি। ট্রেনেই যাবেন কিশোরগন্জ। স্টেশনে এসে দেখলেন, বেশ কিছু পুলিস মোতায়েন রয়েছে স্টেশনে সরকারী সম্পত্তি রক্ষায়। ট্রেনটা অবশ্য বেসরকারী, ময়মনসিংহ ভৈরব রেল কোম্পানি এই ট্রেনের মালিক। হরকুমারের হাতে যতীনবাবু আর বিজয়বাবুর সুটকেস । কাঁধে তার নিজের একটি ছোট পুটলি। অল্পক্ষণের সফর। যতীনবাবু ট্রেনে উঠলে বাইরের দৃশ্য দেখতে ভালবাসেন। একটি লোক যতীনবাবুর পোষাক ও চেহারা দেখে, জানালার পাশের জায়গাটা ছেড়ে দিল।
ট্রেনের চলন্ত গতি র সঙ্গে সঙ্গে, যতীনবাবু বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে চলেছেন। হেমন্তের মাঝামাঝি ধানগাছের রং বদলে হয়েছে হাল্কা সোনালী। কোথাও কোথাও ধানের ভারে গাছ গুলো নুইয়ে পড়েছে। দুই এক জায়গায় দেখা গেল ধান কাটা শুরু হয়েছে।
ক্ষেতে কৃষকদের কাজ দেখতে দেখতে যতীনবাবুর মনে হল রবি ঠাকুর যথার্থই লিখে গিয়েছেন:-
চাষী ক্ষেতে চালাইছে হাল,তাঁতী বসে তাঁত বোনে, জেলে ফেলে জাল,বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার, তারি পরে ভার দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার, ওরা কাজ করে দেশে দেশান্তরে, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ , সমুদ্র, নদীর ঘাটে ঘাটে, পান্জাব, বোম্বাই, গুজরাটে।
নদী পুকুর বেষ্টিত পূর্ববঙ্গ ধানের দেশ। অধিকাংশ লোক কৃষিজীবী নয়ত মৎস্যজীবী।
ফসলের ফলনের উপর গ্রামীন জীবনের অর্থনীতি দাড়িয়ে আছে। কিন্তু আজকের দিনে ভাগচাষী, অল্পজমির মালিক এদের জীবনে অন্নসংস্থানের জন্য কঠোর জীবনসংগ্রাম রুঢ় বাস্তব সত্য। অথচ যতীনবাবু ইতিহাসে পড়েছেন ব্রিটিশ শাসনের আগে বাঙ্গলার গ্রামীন অর্থনীতি যথেষ্ট ভাল ছিল। এখানের তাঁতশিল্পে তৈরী জামাকাপড় সারা বিশ্বে রপ্তানী হত। কিন্তু এই ইস্ট ইন্ডিয়া কোন্পানির রাজত্বের পরবর্তী সময়ে দেখা গেল বিদেশী মিলের কাপড়ে সারা দেশ ছেয়ে গিয়েছে। গরীব তাঁতিরা কাজ হারিয়ে কৃষি কি অন্য ছোটখাট কাজে নিয়োজিত।
কিশোরগন্জ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন দুর্গাদাস অধিকারী। এস্টেট ম্যানেজার আসছেন। তাকে যথাযোগ্য সন্মান সহকারে স্বাগত জানান একটি স্বাভাবিক প্রোটোকল। যতীনবাবু যে শুধু কর্মকুশল লোক তাই নন, সম্পর্কে আবার সম্পর্কে জমিদারের জ্ঞাতি। দুর্গাদাসবাবু একটা টাঙা নিয়ে এসেছেন। সবাই মিলে ডিহি কাছারীর উদ্দেশে রওয়ানা দিলেন। ডিহি কাছারী শহর থেকে তিনক্রোশ দূরে। সেখানের গ্রামের নামই হয়ে গিয়েছে কাছারীপাড়া গ্রাম। স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই পড়ল শোলাকিয়া ইদগাহ ময়দান।
শোলাকিয়া ইদগাহ ময়দানতার পিছনদিকে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নরসুন্দা। প্রায় সাত-আট একর জায়গা নিয়ে বিশাল মাঠ। ইদের দিনে এখানে লাখেরও বেশী মুসলিম নামাজ আদা করতে আসেন। শোলাকিয়া ময়দানে ইদের জমায়েত
সুদূর কোচবিহার, আসাম ছাড়াও সিলেট, নরসিংদি প্রভৃতি দূর জায়গা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা আসেন। ঐ সময়ে স্পেশাল ট্রেন দেওয়া হয়। এরকম ট্রেন হিন্দুদের রথযাত্রা এবং সংক্রান্তির সময় দেওয়া হয়। হিন্দু পুণ্যার্থীরা ময়মনসিংহে রথের মেলা ও সংক্রান্তিতে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করতে যায়। ঐ সময় যতীনবাবু নিজের বাড়ীর ছেলেদের ও অন্যান্য প্রতিবেশী ছেলেপুলেদের আঠারবাড়ী স্টেশনে পাঠান তীর্থযাত্রীদের জল খাওয়াতে। জলের সঙ্গে বাতাসা ও ফলও দেওয়া হয়। বাচ্চারা খুব উৎসাহের সঙ্গে কাজটা করে থাকে।
ডিহিকাছারী, পাকা দেওয়ালের ঘর, উপরে টিনের ছাদ। একটা পুরাণো ছাতিম আর শিরীষ গাছ, কাছারীবাড়ীর উঠোনটাকে ছায়াময় করে রেখেছে। পিছনে কিছুটা ধানক্ষেত, তারপরে ফুলেশ্বরী নদী। যতীনবাবুর আসার খবর পেয়ে কয়েকঘর প্রজা এসেছে। সবাই পুরুষ, শুধু একটি মধ্যবয়সী রমণী, বিধবার বেশ, সঙ্গে একটি ছোট ছেলে। দূর গ্রাম থেকে সবাই এসেছে। যতীনবাবু মেয়েটিকেই আগে ডাকলেন। সে এসে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বল্ল, তার বর কিছুদিন আগে খেতে কাজ করার সময় গোখরো সাপের কামড় খায়। এক ওঝাকে ডেকে এনেছিল। কিন্তু ঝাড়ফুঁক করেও শেষরক্ষা হয় নি। তার বর মারা গিয়েছে দুটি সন্তান রেখে। জমির ধান কাটিয়েছে ভাগচাষীকে দিয়ে। তার হিস্যা বাদ দিলে, বাকী ফসল থেকে সরকারকে ট্যাক্সো দিতে হলে তার পরিবার না খেতে পেয়ে মারা যাবে। যতীনবাবু এরকমক্ষেত্রে খাজনা মকুব করে দেন। গরীব চাষীর ন্যায্য অসুবিধাগুলি তিনি সাধারনত দয়ার সঙ্গে বিচারবিবেচনা করেন। বিজয়বাবুর একটু আপত্তি ছিল। যতীনবাবু তাকে বোঝালেন এরকম কেসে খাজনা মকুব হলে জমিদারের সন্মান বাড়ে। দেখছো না, গত ৩৭ এর ইলেকশনে, ফজলুল হকের তৈরী কৃষক প্রজা পার্টি কতগুলো সীট দখল করেছিল। ঐ পার্টি তো জমিদারী প্রথা বিলোপ করার জন্য ডাক দিয়েছে। ওরা বলছে সারা বাংলা জুড়ে জমিদারদের সম্পত্তির আসল হকদার হচ্ছে গ্রামের প্রান্তিক চাষীরা। ভেবে দ্যাখো, পূর্ববাংলাতে যে সীট গুলি মুসলীম সংরক্ষিত আসন ছিল, তাদের বেশীরভাগ গুলোতেই, মুসলীমলীগ প্রার্থী পরাজিত হয়েছে কৃষক প্রজা পার্টির হাতে। তাই জমিদারের প্রজাদের দুঃখ, অসুবিধা যতদূর সম্ভব সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার যাতে তারা দরকারের সময় জমিদারের পাশে দাঁড়ায়। বিজয়বাবু অবশ্য দুদিকে মাথা নেড়ে বল্লেন, সরকার তো জমিদারের কান মুচড়ে খাজনা আদায় করবে। যতীনবাবু বল্লেন- এরকম কেস তো গুনেগেথে সারা বছরে মাত্র দশ বারটা হয়ে থাকে। পটুয়াকান্দী, জ্বালাপুর, নীলগঞ্জ, এইসব আশেপাশের গ্রামের কিছু জমির স্বত্ব নিয়ে বিবাদ দেখা দিয়েছে। জমিদারীর বেশ কিছু জমি খাস বলে সেখানে এক মুসলিম মাতব্বর খাজনা দিতে মানা করে দিয়েছে। লেঠেল পাঠিয়েও লাভ হয় নি। মনে হচ্ছে মামলা করতে হবে। যতীনবাবু, দুর্গাদাসকে বল্লেন-‘কাল ঐ মুরুব্বীরে ডেকে পাঠাও। দেখি কথা কইয়া।’ বাকী সব প্রজাকে বিদায় দিয়ে, বিজয়বাবু বসলেন গতবারের বকেয়া খাজনার খাতাটা নিয়ে।
দুপুরে দুর্গাদাসবাবু কাছারীবাড়ীতেই রান্নার বন্দোবস্ত করেছেন। কুমড়ো আর বকফুলের ভাজা, বড়ি দিয়ে রুইমাছের ঝোল, মাছের মাথা দিয়ে মুগডাল দিয়ে তৃপ্তি করে খেয়ে যতীনবাবু আর বিজয়বাবু একটু জিরোতে গেলেন। বিকালের দিকে তিনজনে মিলে বেরোলেন। কাছেই চন্দ্রাবতীর মন্দির।
কবি চন্দ্রাবতীর মন্দিরময়মনসিংহগীতিকাতে চন্দ্রাবতী পালা আছে। যতীনবাবু শুনেছেন এই বিখ্যাত পালাটি ময়মনসিংহের বিভিন্ন গ্রামে গন্জে যাত্রাপালায় অভিনীত হয়ে থাকে। মন্দিরটা ডিহি কাছারী থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটা পথ। যেতে যেতে দুর্গাদাসবাবু চন্দ্রবতীর কাহিনী শোনালেন। বর্তমানে চন্দ্রাবতী মন্দির
বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। দীনেশ চন্দ্র সেন, যিনি ময়মনসিংহ গীতিকা পালাগুলি গ্রন্থ হিসাবে একত্রিত করেছেন, তার মতে কবি চন্দ্রাবতী ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
‘চাইর কুনা (চারকোণা) পুষ্করিণীর পাড়ে চম্পা নাগেশ্বর/ডাল ভাইংগা পুষ্প তোল, কে তুমি নাগর?’ ভোরে ফুল তুলতে এসেছিল কিশোরী চন্দ্রাবতী, তার পরিচয় জানতে চায় কিশোর জয়ানন্দ। উঁচু ডালের বড় ফুলটি নাগাল পায় না সে, জয়ানন্দ সেটি পেড়ে দেয়। দুই কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ভাব হয়ে যায়। এমনিভাবে দিন কেটে যায়। তারা বড় হতে থাকে। একদিন জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীকে বলে নতুন কথা, ‘ফুল তুল ফুল তুল কন্যা, তুমি ফুলের রাণী/ঐ না ফুলের সঙ্গে বান্দা আমার পরাণী।’
চন্দ্রাবতীর পিতা দ্বিজবংশী দাশ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একজন নামকরা কবি ছিলেন। ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে দ্বিজবংশী দাশ ছিলেন অন্যতম। তিনি নিজগৃহে একটি টোল পরিচালনা করতেন। সেই টোলে চন্দ্রাবতী সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন জয়ানন্দকে। দু’জনে একসঙ্গে লেখাপড়া করতেন, মন্দিরে পুজোর জন্য ফুল তুলতেন আর দ্বিজবংশী দাশের মুখে কাব্য শুনতেন। ক্রমে দু’জনেই বড় হলেন, একে অপরকে ভালবাসলেন।তাদের বিয়ে ঠিক হল।
কিন্তু জয়ানন্দ কথা দিয়েও বিয়ের দিন এলেন না। খবর পাওয়া গেল জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে এক ধনী মুসলিম কন্যাকে বিয়ে করেছে। এ খবর শুনে চন্দ্রাবতী শোকে একেবারে ভেঙে পড়ে, ‘না কান্দে না হাসে চন্দ্রা নাহি বলে বাণী/আছিলো সুন্দর কন্যা হইলো পাষাণী।’ চন্দ্রাবতী পিতার কাছে আজীবন কুমারী থাকার বাসনা ব্যক্ত করেন এবং একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেয়ার অনুরোধ জানান, যেখানে তিনি শিবের উপাসনায় জীবন কাটাবেন। তার কথামতো দ্বিজবংশী দাশ মেয়ের জন্য ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। কবি চন্দ্রাবতী প্রেমাস্পদ জয়ানন্দের বিচ্ছেদজ্বালা ভোলার জন্য ফুলেশ্বরী নদী তীরের সেই মন্দিরে শিবের ‘আরাধনা’য় মগ্ন হন এবং সেই সঙ্গে কাব্যচর্চায় মন দেন। তিনি একে একে রচনা করেন- দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, মলুয়া ‘পদ্মাপুরাণ’ প্রভৃতি কাব্যগীতি।
এরপর চন্দ্রাবতী হাত দেন রামায়ণ রচনায়।
অনেক দিন পর জয়ানন্দ ফিরে আসে নিজের ভুল বুঝে। কিন্তু চন্দ্রাবতী তাকে মন্দিরের দরজা থেকে ফিরিয়ে দেন। এমনকি দর্শন পর্যন্ত দেননি জয়ানন্দকে। চন্দ্রাবতীর দর্শনলাভে ব্যর্থ হয়ে অভিমানী জয়ানন্দ মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সন্ধ্যামালতী ফুল কুড়িয়ে ফুলের রসে মন্দিরের কপাটে চিরদিনের মতো বিদায় প্রার্থনা করে এক পত্র লেখে-
‘দ্বার খোল দ্বার খোল চন্দ্রা তোমায় একবার দেইখ্যা যাই/অভাগা জয়ানন্দ ডাকি আমি শেষ বিদায় চাই।’
চন্দ্রাবতী দ্বার খোলে না। দুঃখ, বেদনা আর অনুশোচনায় জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।
এদিকে পুজো শেষে মন্দিরের কপাটের লেখার ওপর চন্দ্রার চোখ পড়ে-
দ্বার খোল চন্দ্রাবতী দেখা দাও আমারে ॥
না ছুঁইব না ধরিব দূরে থ্যাকা খাড়া।
ইহ জন্মের মতন কন্যা দেও মোরে সাড়া ॥
দেব পূজার ফুল তুমি গঙ্গার পানি।
আমি যদি ছুঁই কন্যা হইবা পাতকিনী ॥
নয়ন ভরে দেখ্যা যাই জন্মশোধ দেখা।
শৈশবের নয়ন দেখি নয়ন ভঙ্গি বাঁকা ॥
জয়ানন্দকে শেষ দেখা দেননি চন্দ্রাবতী। একমনে মন্দিরে বসে শিবের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। পুজো শেষে মন্দিরের বাইরে এসে জয়ানন্দের চিঠি দেখতে পান। তারপর মন্দিরে ব্যবহারের জন্য চন্দ্রাবতী ফুলেশ্বরী নদীর ঘাটে জল আনতে গেলে দেখতে পান নদীতে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ। এই ঘটনার কয়েক দিন পর চন্দ্রাবতীও ফুলেশ্বরীর জলে বিসর্জন দিয়ে জয়ানন্দের অনুগামিনী হন। চন্দ্রাবতীর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘রামায়ণ কথা’ অসমাপ্তই থেকে যায়। দীর্ঘদিন এ কাব্য ময়মনসিংহের ঘরে ঘরে পঠিত ও গীত হয়েছে। লৌকিক, মানবিক ও অন্যান্য মৌলিক উপাদান সমৃদ্ধ এ কাব্যটি বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। মৈমনসিংহ গীতিকার জয়-চন্দ্রাবতী উপাখ্যানের নায়িকারূপে অমর হয়ে আছেন কবি চন্দ্রাবতী।
বিজয়বাবু কিশোরগন্জের বাসিন্দা, তিনি জানেন চন্দ্রাবতীর কাহিনী। বিজয়বাবু, যতীনবাবুকে বল্লেন দীনেশ চন্দ্র সেনের সম্পাদনায় বছর কয়েক আগে প্রকাশিত হয়েছিল মৈমনসিংহ গীতিকা। আঠারবাড়ীর লাইব্রেরিতে এই বইটা আছে। এই বইতে দশটি লেকগীতির সঙ্কলন আছে। তার মধ্যে জনপ্রিয় একটি পালা জয়-চন্দ্রাবতী।
কথোপকথন শেষ হতে না হতে তারা পৌছে গেলেন ফুলেশ্বরী নদীর কাছে চন্দ্রাবতী মন্দিরে। রাস্তায় বেশ কিছুটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল সুউচ্চ গোলাকার মন্দির চূড়াটি। কাছে পৌছে যতীনবাবু দেখলেন মন্দিরের একতলাটি আষ্টভুজাকৃতি, গর্ভগৃহে একটি বিশাল শিবলিঙ্গ। মন্দিরের শীর্ষদেশ, জমি থেকে চারতলা বাড়ীর উচ্চতায়। মন্দিরের পরিধি ছোট। গোলাকৃতি চাতাল। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা প্রাঙ্গনে খেলা করছে। তিন-চারটি বধূ এসেছে নদীর ঘাট থেকে জল নিয়ে শিবের মাথায় ঢালার জন্য। মন্দিরের পাশে একটি সুবিশাল বটগাছ। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। বটগাছটি অনেক পাখির আশ্রয়স্থল। পাখীরা ফিরে আসছে কুলায়। কিছুক্ষন ধরে তাদের কিচিরমিচিরে শোনা গেল। একটু পরে নেমে এল নিস্তব্ধতা। আজ কৃষ্ণপক্ষের তৃতীয়া। নিকষকালো অন্ধকারে ডুবে গেল চারিদিক। যতীনবাবু সঙ্গে টর্চ এনেছিলেন। সবাই মিলে ফেরার রাস্তা ধরলেন। কাল যেতে হবে হোসেনপুর।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ২০
বাতাসে একটু টানের ভাব। দিনের বেলায় না গরম না ঠান্ডা। সর্ষের তেল নিয়ে ডিহিকাছারীর পিছনে ফুলেশ্বরী নদীর ঘাটে গিয়েছিলেন যতীনবাবু। তেল মেখে নদীতে স্নান করে, পাশের খেয়াঘাটটা সরজমিনে দেখে এলেন। এটা আঠারবাড়ীর জমিদারের অধীন। ঘাট ইজারাতে দেওয়া আছে এক প্রজাকে। এবারের বর্ষাতে ঘাটের টুকটাক মেরামত লাগবে। গতবারে, ঘাটের সব বাঁশের খুঁটি চেন্জ করিয়ে, আলকাতরা দিয়ে রং করা হয়েছিল। যতীনবাবুর ধারণা হল,এবারে বড় কোন খরচা করতে হবে না।
হোসেনপুরে যাওয়ার পথে একটি পরিত্যক্ত নীলকুঠি আছে। যতীনবাবু ছোটবেলায়, তার বাবা রজনী মোহনের কাছে শুনেছেন বাংলার নানা জায়গাতে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা নীলকুঠি খুলে বসেছিল। তারা জোর করে কৃষকদের বাধ্য করত নীলচাষ করতে। সেই ইতিহাস ইংরেজ রাজত্বের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ‘নীলকুঠির সাহেব’ বল্লে, সাধারন মানুষের মনে চাবুক হাতে হ্যাটপরা লালমুখো সাহেবদের কথা মনে পড়ে। তাদের রমরমা, যশোর, নদীয়া, চুয়াডাঙ্গাতেই বেশী ছিল। কিশোরগন্জ, হোসেনপুর অঞ্চলেও নীলচাষ হত।
যতীনবাবু এক্কা থামিয়ে নামলেন। যতীনবাবুর নির্দেশ মোতাবেক আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন অমলবাবু ও এক বয়স্ক মুসলিম প্রজা। অমল বোস, হোসেনপুর ডিহি কাছারীর নায়েব। মুসলিম বৃদ্ধটি লুঙ্গি পরা ও উর্ধাঙ্গে ফতুয়া, কাঁধে একটা গামছা । বছর তিরিশ আগে, হোসেনপুর কাছারীতে অনেক কর্মচারী ছিল, তখন জমিদারীর আওতায় কৃষিজমি ছিল অনেক। বেশীরভাগটাই ছিল মহিম রায়চৌধুরীর স্ত্রী জ্ঞানদা সুন্দরীর নামে। একটা সময়ে পত্তনি প্রথায় তা হাতবদল হয়ে গংগাটিয়ার জমিদারের হাতে চলে যায়। গংগাটিয়ার জমিদারবাড়ীটিও হেসেনপুরে অবস্থিত। এরা অবশ্য আঠারবাড়ীর তুলনায় অনেক ছোট জমিদার। তাদের বাড়ীতে যতীনবাবু গিয়েছেন কয়েকবার। সামনে সুন্দর রোমান টাইপের উঁচু উঁচু স্তম্ভওয়ালা জমিদারবাড়ী। এরা আদতে পশ্চিমবঙ্গের লোক।
যতীনবাবুর সঙ্গে বিজয়বাবু ও হরকুমারও নামলেন।যতীনবাবু কোচায়ানকে বল্লেন, ‘ভালই হল, ঘোড়াটার একটু বিশ্রাম হবে। তুমিও একটু জিরিয়ে নাও।নীলচাষ বল্লে, যতীনবাবু, বাল্যকালে মনে করতেন ধানচাষের মতই একটা ব্যাপার। ধান মাড়াই করে ঢেকিতে চাল ছাটার মত ব্যাপার। নীল চাষ করা সময়সাধ্যি বটে, তার সঙ্গে, নীল গাছ থেকে নীল তৈরী করার জন্য দরকার কারখানা ও অনেক শ্রমিক। যতীনবাবু দেখলেন, জায়গাটা বেশ বড়, তিন চার একর তো হবেই। জায়গাটা অব্যবহৃত থাকায় বেশ অগাছা গজিয়েছে। সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রথম চোখে পড়ল দোতলা অফিস ঘর। দরজা জানালা বেশীরভাগই চুরি হয়ে গিয়েছে। তার পিছনদিকে একটা বড় দিঘী। অফিসঘর ও দিঘীর মাঝে নীল কারখানা। অমলবাবু সঙ্গে করে যে মুসলিম চাষীটিকে নিয়ে এসেছেন, সে তার যুবক বয়সে এই নীলকুঠিতে শ্রমিকের কাজ করত।
সে জানাল যে এই নীলকুঠির তদানীন্তন মালিক ওয়াইজস্টিফেন্স সাহেব উনিশ্শ তিন চার সাল নাগাদ নীলের কারবার বন্ধ করে দেশে চলে যান। গ্রামের লোকেরা তারপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
ভারতে নীল চাষের ইতিহাস কিছুটা এইরকম:-
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে পাওয়ারলুম আসার ফলে ইংল্যান্ডে নীলের চাহিদা শতগুনে বেড়ে যায়। তখন থেকে নীলচাষ ভারতে লাভজনক হয়ে ওঠে। ফলে বহু ইংরেজ কর্মচারী চাকরী ছেড়ে এবং বহু ইংরেজ তরুণ দেশ ছেড়ে ভারতে এসে নীলচাষের কারবার শুরু করে। পুরো উনিশ শতক ধরে নীলচাষের রমরমা বাড়তে থাকে, সাথে সাথে কৃষকদের দুর্দশাও বাড়তে থাকে।
কিন্তু প্রথমদিকে বেশীরভাগ চাষের জমি ছিল জমিদারদের অধীন। নীলচাষের সময়টা ছিল নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত। ফলে ধানের ফসল মার খেতে লাগল। চাষীর নীলচাষ করতে রাজী হত না। বেশীরভাগ চাষী ছিল জমিদারের অধীনে। ফলে ইংরেজরা জোর খাটাতে পারছিল না। তখন তাদের সাহায্য করল ইংরেজ সরকার। আইন করে পঁচিশ প্রতিষধ জমিতে নীলচাষ বাধ্যতামূলেক করা হল। পরে তো নূতন আইন এনে, ইংরেজ ব্যবসায়ীকে জমি কেনার অধিকার দেওয়া হল। এর ফলে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে প্রায় ছয়শত জমিদারী চলে যায় ইংরেজ মালিকদের হাতে। এতো গেল ইতিহাস।
যতীনবাবু পরিত্যক্ত নীলকুঠির ভিতরে ঘুরে ঘুরে নীল উৎপাদনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া বুঝতে লাগলেন আব্দুল নামক বৃদ্ধ কৃষকটির কাছ থেকে।
আব্দুল জানাল- ‘বড়কর্তা, নীলগাছ থিক্যা নীল বানাইতে, গাছগুলির্ চব্বিশ ঘন্টা পানিতে ভিজাইতে হয়। হেডার জন্য এত বড় পুকুর কাটন লাগছে। এই চৌবাচ্চাগুলিতে নীল গাছ ভিজাইত। চৌবাচ্চা গুলি জোড়ায় জোড়ায়, একটি উপরে ও একটি নীচে।’ যতীনবাবু ও বাকীরা সারি সারি চৌবাচ্চার সামনে এসে দাঁড়ালেন ।
আশেপাশের লোকেরা অনেক ইট খুলে নিয়ে গিয়েছে।
আব্দুল অদূরে একটা চিমনী দেখিয়ে জানাল-‘দ্যাখেন কর্তা। হেডারে কয় বয়লার’। যতীনবাবু কাছে গিয়ে দেখলেন পেটমোটা ধাতব বস্তুটি মোটা লোহার চাদরে মোড়া, উপরে ধূয়া বেরোবার চিমনি।
নীলের কারখানা শিল্পীর তুলির টানেআব্দুল জোড়া চৌবাচ্চার নীচেরটা দেখিয়ে বল্ল, চব্বিশ ঘন্টা গ্যাঁজানোর পর, উপরের চৌবাচ্চা থেকে তামাটে হলুদ পানি নীচের চৌবাচ্চাতে পাঠাইত। নিচের চৌবাচ্চায় রঙিন তরল জমা হইলে পর দশজন মজুর মিইল্যা একসাথে ডান্ডা লইয়া চৌবাচ্চায় যাইত। কোমর সমান পানিতে দুই সারিতে মুখোমুখি দাঁড়াইয়া বাঁশের লাঠি দিয়া তাঁরা রঙিন তরল নাড়াইতে থাকতো।
যতীনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন কি কারণে জলকে এত নাড়াতে হত। আব্দুল অত কারণ জানে না। আব্দুল বল্ল- হেডা জানি না, তবে আট দশ ঘন্টা পরে পানিডা নীল হইয়া যাইত।’ যতীন বাবু জানেন মাছের চারাপোনা শুদ্ধ হাড়ি সব সময় নাড়তে হয় যাতে জলে অক্সিজেন যায়। তিনি অনুমান করলেন যে ঐ নীল মিশ্রিত জলে অক্সিজেন দরকার যাতে কোন রসায়নিক প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের সংস্পর্শ এসে নীল তৈরী হয়।
আব্দুল জানাল, উপরের পানিটি ফেলে দিয়ে এই নীল রঙের তলানী পাশের ভবনের বয়লারে পাম্প করে নিয়ে যাওয়া হতো। বয়লারে ফুটানোর সময় এই ঘন নীলকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে মাঝে মাঝে নাড়ানো হতো। প্রায় দু’ঘন্টা ফুটানোর পরে আরও ঘন হয়ে যাওয়া নীল আরেকটি চৌবাচ্চার উপর বিছিয়ে রাখা চাদরের উপর ছড়িয়ে রাখা হতো তলানী ঝরানোর জন্য। জমাট বেঁধে যাওয়া নীল এরপর সাবানের আকারে ছোট ছোট সাইজ করে,বাক্সবন্দী করে নিলামের জন্য নদীপথে কলকাতায় পাঠানো হতো।
যতীনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন-‘আব্দুল চাচা, সব লোক কয়, নীলচাষে কৃষকদের লাভ হইত না, এ ব্যাপারে আপনি কি কন?’ আব্দুল বল্ল -‘সত্যি কইতে কি জানেন, আমার আব্বুরে চাষের শুরুতে নীলকুঠির মালিক দাদন দিসিল, কিন্তু সুদ ছেলো খুব চড়া। ফলে সেই ঋণ বাড়তেই থাকে। আব্বুর ছাওয়াল বইল্যা সেই ঋণের বোঝা আমার উপর আইস্যা পড়ে। আমার বিবিও নীলকুঠিতে বেগার খাটসে। আপনারে সত্য কই, সাহেবমালিক ছিল ঢাকার আরমানিটোলার লোক, হে অতটা খারাপ ছ্যালো না, কিন্তু, গোমস্তা, মুৎসুদ্দী, কুলিসর্দার, এরা সারাক্ষন বিভিন্ন উপায়ে চাষীদের ও নীল কারখানার শ্রমিকদের ঠকাবার চেষ্টা করত।’
সব শুনে যতীনবাবু বুঝলেন যে ক্রমাগত শোষনের ফলে, আঠারশ ষাট সালে নীল বিদ্রোহ হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজ সরকার শক্তহাতে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশ পায় দীনবন্ধু লিখিত নাটক নীলদর্পণ। বাঙালী জনমানসে এই নাটক বিপুল প্রভাব ফেলে।
রেভারেন্ড জেমস লং এই নাটকের ইংরাজী অনুবাদ করেন। এরজন্য সরকার তাকে ১০০০/- ফাইন করে। কিন্তু তিনি কলকাতার উচ্চবিত্তদের কাছে সমর্থন পেয়েছিলেন। কালী প্রসন্ন সিংহ তার হয়ে ফাইনের টাকাটা দিয়ে দেন। নানাবিধ আন্দোলনের ফলে ইংরেজ সরকার নীল কমিশন তৈরী করতে বাধ্য হয়েছিল।
কিন্তু কালের রথচক্রের চাকা থেমে থাকে না। উন্নিশ শতকের শেষ দশকে জার্মানীতে একজন কেমিস্ট, প্রথম রসায়নিক নীলের উদ্ভাবন করেন। কয়েক বছরের মধ্যে রসায়নিক নীল ছেয়ে যায় বিশ্বের বাজারে। উনিশশ দশ সাল নাগাদ ধীরে ধীরে নীলচাষের পরিসমাপ্তি ঘটে।
আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে সেই পরিত্যক্ত নীলকুঠি দেখতে দেখতে যতীনবাবু কি কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে আরো সত্তর বছর পরে তার একমাত্র পৌত্র তার কুড়ি পুরুষের পরিত্যক্ত ভিটেবাড়ীর সামনে দাড়িয়ে সেই সোনালী অতীতের স্মৃতিচারণ করবে। ইতিহাস চলমান। মানবজীবন তথা সমাজের উত্থান পতনের কাহিনী ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। তার বাঁক নেওয়া মুহুর্তগুলিতে, জীবনের রঙ্গমঞ্চে হয়ে যায় পটপরিবর্তন , যে ছিল রাজা সে হয় ফকির। যতীনবাবু চিন্তা করলেন, পলাশীর প্রান্তরে সেদিন যদি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা না করত, তাহালে পরাধীনতার শৃঙ্খল, যা এখনো বিদ্যমান, যার জোরে বিদেশী শক্তি ভারতকে কপর্দকহীন করেছে, সেটা কখনো সম্ভব হত না। যতীনবাবু ভাবলেন এরকম অনেক ছোট্ট ছোট্ট ‘যদি’ ঘটে নি বলেই ইতিহাস এত বর্ণময়।
পরিত্যক্ত নীল কুঠিনীলকুঠি থেকে ডিহিকাছারী মাইল পাঁচেক। দুপুরের খাওয়ার সময় তারা এসে উপস্থিত হলেন কাছারীতে। জিনিষপত্র কাছারীবাড়ীতে রেখে তারা এলেন অমল বোসের বাসায়। সেখানেই আজ মধ্যাহ্ন ভোজন। অতিথি আপ্যায়নে বোসগৃহিণী নিপুণা। অনেক পদের আয়োজন। যতীনবাবু কোথাও নেমন্তন্ন খেলে খালিহাতে যান না। আসার সময় একহাড়ি বালিশ মিষ্টি এনেছিলেন। বাচ্চাদের জন্য সুকুমার রায়ের লেখা ‘আবেলতাবোল’ বইটা এনেছিলেন, সেটা দিলেন। বিজয়বাবু অকৃতদার। তিনি অবশ্য এইসব লৌকিকতার ধার ধারেন না।
খাওয়া দাওয়ার পর ডিহিকাছারীতে গিয়ে বসা হল হিসাবপত্র নিয়ে। কয়েকজন চাষী এসেছে খাজনার ব্যাপারে কথা বলতে । এবার একরকম পোকা আক্রমণ করেছিল ধানগাছের পাতাকে। তার ফলে বৃষ্টি ভাল হলেও ধানের ফলন তেমনটা নেই। অমলবাবু বল্লেন, তার সঙ্গে কয়েকদিন আগে গাংগটিয়ার জমিদারবাবুর দেখা হয়েছিল। তিনি ঢাকা থেকে খবর এনেছেন যে খোলা বাজারে চালের বিক্রি কম করে, ইংরেজরা যুদ্ধের জন্য রসদ মজুদ করবে।
বিকালের দিকে যতীনবাবু ও বাকীরা বেড়াতে গেলেন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। কাছারীবাড়ী থেকে আধমাইল দূরে নদী। খাজনা তোলার সময় তিনি নদীপথে আসাটাই পছন্দ করেন। সেই কাজটা অবশ্য হয় মার্চ মাসে।
পরের দিন সকালটা কাটল হোসেনপুরের পাটোয়ারী অফিসে। হোসেনপুরের কালি মন্দিরের লাগোয়া জমিদারের কয়েকবিঘা জমি দেবোত্তর সম্পত্তি বলে একজন দাবী করছে। খাজনা ফাঁকি দেবার এটা একটা উপায়। তাই মামলা করার জন্য পাটোয়ারী অফিসে জমির রেকর্ড দেখতে গিয়ে বেশ কিছু সময় গেল।
দুপুরে খেয়ে দেয়ে, তিন জনে হোসেনপুর থেকে বেরোলেন। বিজয়বাবু আগে থেকে যতীনবাবুকে বলে রেখেছেন, ফিরতি পথে তার দেশের বাড়ী মৃধা গ্রাম হয়ে যাবেন। মৃধা গ্রামটা অবশ্য একটু ঘুরপথে। নরসুন্দার অপর পাড়ে। কিছুটা ঘুরপথে একটা সাঁকো পেরিয়ে যেতে হবে। পথে পড়ল পাকুন্দিয়া নামে এক গঞ্জ শহর। এখানের শাহ মামুদ মসজিদটির খুব নামকরা। দুপুরের খাওয়ার জন্য ওর কাছেই একটা হিন্দু হোটেলে নামলেন। যতীনবাবু বাইরে খাওয়া বেশী পছন্দ করেন না। বাইরে বেরোলে উপায় থাকে না। আঁতুড়ঘর নিয়মে নাস্তি।মসজিদটি প্রায় তিনশত বছরের পুরানো। শাহ মাহমুদ নামে এক ধনী ব্যাবসায়ী তৈরী করিয়েছিলেন। মুঘল স্থাপত্যশিল্পের এক নিদর্শন।
রাতটা আজ মৃধা গ্রামে বিজয়বাবুর বাসায় থাকবেন। পরের দিন সকালে দুই বন্ধু গ্রাম পরিদর্শনে বেরিয়েছেন। কয়েকজন পাড়ার লোক বিজয়বাবুকে দেখে কুশলবিনিময় করলেন। বিজয়বাবুর বাড়ীর রাস্তার শেষে গুপ্ত দের বাড়ী। খুব সম্পন্ন পরিবার। বাড়ীর সামনে এক তরুন যুবককে দেখা গেল। তার নাম ভূপেশ। বিজয়বাবু বল্লেন-‘চল তোমার স্কটিশ কলেজেরই ছাত্র। ভূপেশ বিজয়বাবুর থেকে ২২/২৩ বছরের ছোট। ভূপেশের বাবাকে বিজয়বাবু ‘দাদা’ বলেন। যতীনবাবু ভূপেশের কথা বিজয়বাবুর কাছে আগেই শুনেছেন। সে স্কুলে পড়ার সময়েই অনুশীলনী নামক বিপ্লবীদলের সক্রিয় সদস্য ছিল। সেই অপরাধে কলেজে ঢোকার পরেই তাকে জেলে পাঠান হয় ১৯৩০ সালে। জেল থেকেই তিনি বিএ পাশ করেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভূপেশ যান ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে। সেখানে ভূপেশ কমিউনিস্ট ভাবধারায় দীক্ষিত হন। বিজয়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন-‘ কেমন আছ ভূপেশ, ব্যারিস্টারি পাশ কইরা গ্রামে বইস্য কি কর? ভূপেশ জানালেন তিনি ব্যারিস্টারী করতে চান না। তিনি এখন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। দেশের শ্রমিক ও কৃষকদের উন্নতিসাধন তার লক্ষ্য। যতীনবাবুর সঙ্গে ভূপেশের আলাপ করিয়ে দিলেন বিজয়বাবু। বল্লেন- ভূপেশ , যতীনবাবুর তোমার মত স্কটিশচার্চ থেকে বিএ পাশ করেছিলেন, তবে তোমার থেকে বিশ বছর আগে। কথায় কথায় ভূপেশ বল্লেন তার পার্টি ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে সমর্থন করে না। যতীনবাবু বল্লেন- যদি এই আন্দোলনের ফলে ইংরেজরা দেশ ছেড়ে যায় তবে তো আমরা স্বাধীন হব। ভূপেশবাবু বল্লেন- যতীনকাকা, ইংরেজ যাওয়া না যাওয়াটা এখন আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, দেশের সাধারন শ্রমিক এবং কৃষক শ্রেনী যে ভাবে জমিদার ও শিল্পপতিদের হাতে নিপীড়িত হচ্ছে, আমাদের প্রথম কাজ তাদের সংঘটিত করা। এদের কে যদি আমরা সঙ্গবদ্ধ করতে পারি, তারা যদি তাদের শ্রমের প্রকৃত দাম পায় তবেই দেশের প্রকৃত উন্নতিসাধন হবে। স্বাধীনতা তখন আসবে এই সঙ্ঘবদ্ধ গোষ্ঠীর বিপ্লবের মাধ্যমে। যতীনবাবু এতদিন জানতেন ইংরেজদের উৎখাত করতে সশস্ত্র বিপ্লবের বড় ভূমিকা আছে। ভূপেশের কাছে শুনলেন যে অনেক পুরাতন বিপ্লবী, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে, কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন । এদের মধ্যে আছেন- অনন্ত সিংহ, গনেশ ঘোষ, কল্পনা দত্ত যারা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে মাস্টারদার সহযোগী ছিলেন। এছাড়া পি সি যোশী, মুজফ্ফর আমেদ, অরুণা আসফ আলির মত পুরানো জেলখাটা বিপ্লবীরা এখন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। যতীনবাবু বল্লেন- এই যে সুভাষ বোস আমাদের বিশেষ ভরসার জায়গা, তিনি তো সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষে। ভূপেশ বল্লেন - যতীনকাকা - সশস্ত্র বিপ্লবের বীজ তৈরী করতে হবে দেশের মধ্যে। আমাদের ধারনাতে এখন নিরক্ষর কৃষক, মজদুরকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে হবে। তবেই তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসবে। এখন দ্যাখেন না কেন, দুমুঠো ডাল ভাত যোগাড়ের চিন্তায় লোকেদের সারাদিন ব্যয় হয়। তাদের চিন্তাশক্তির বিকাশ চাই। তারপর হবে গণঅভ্যুথ্থান। দেখেননি, বলশেভিক দল কেমন করে জারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। সমস্ত সাধারণ মানুষ তখন বলশেভিকদের সাথে ছিল, কারণ তারা সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল। যতীনবাবু ভাবলেন একবার বলেন যে ভারতবর্ষ তো বিদেশীদের অধীন, ভারতবাসীর সম্পদ, তাদের সৈনিকের রক্ত তো ইংরেজদের সুবিধার্থে ব্যবহার হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কি এক আসনে বসান যায়। জলখাবারের দেরী হয়ে আসছিল। তাই দুজনে ভূপেশের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তবে যতীনবাবুর ছেলেটির কথাবার্তার মধ্যে আগামীদিনের এক রাজনৈতিক নেতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখলেন। ইনি পরবর্তী জীবনে ব্যারিস্টারি পাশ করেন ও আজীবন কমিনিউস্ট পার্টির বড় নেতা ছিলেন।
ক্রমশঃ














Comments
Post a Comment