ধূসর অতীত ( যতীনবাবু ও আঠারবাড়ী)

 

আমার ঠাকুর্দা যতীন্দ্র মোহন রায়। কোলে নাতি অমিত ছোটমেয়ে তপতীর ছেলে)
ধূসর অতীত পর্ব ১৪

যতীনবাবু আজ কাছারীবাড়ী থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। খাজাঞ্চিবাবুকে বলে এসেছেন, সব ডিহি কাছারীর বকেয়া খাজনার হিসাবগুলি আলাদা একটা খাতায় তুলে রাখতে। গতবছর কয়েকঘর হোসেনপুরের প্রজা খাজনা দেয় নি। জমিদার প্রমোদকাকা আজ এসেছিলেন কাছারীবাড়ীতে। বল্লেন-‘যতীন ভাইপো, দুর্গাপূজা তো শেষ হল, কাল লক্ষীপূজা, সপ্তাহ খানেক পরে বেরোও। নান্দিয়াল, হাজিপুর, হোসেনপুরে- এইসব জায়গার ডিহি কাছারীগুলো একবার পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এই কাছারীগুলির নায়েবদের নিয়ে, জমিসংক্রান্ত বিবাদগুলি তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেলতে হবে। এসব কেস কোর্টে গেলে মুশকিল। ফয়সলা সহজে হতে চায় না। হোসেনপুরে শুনেছি জমি নিয়ে তিনটে লাঠালাঠির ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটা ফেরীঘাটের ইজারার সময়সীমা অতিক্রান্ত। নীলাম ডেকে, ফেরীঘাটের নূতন ইজারা দেওয়া দরকার।

                            কাছারীঘাট
ঘাটগুলির মেরামতি দরকার। বর্ষা শেষ হয়েছে। শীতকালে যাতে ঘাট সারানোর বন্দোবস্ত করা যায়, তারজন্য নূতন ঠিকাদার নিয়োগ দরকার। সপ্তাহখানেকের মত সময় হাতে রেখ।

যতীনবাবু, তার ভাই গোরা-কে নিয়ে রায়ের বাজারে এসেছেন লক্ষীপূজার কেনাকাটি করতে। বাজারটা মাইলখানেক দূরে তাদের বাড়ী থেকে। অনেক পুরানো বাজার। কথিত আছে অনেক আগে এই জায়গার নাম ছিল গোবিন্দবাজার। দীপ নারায়ণ রায়চৌধুরী, যখন এখানে জমিদারী পত্তন করেন, তখন যশোর থেকে আঠারটি পরিবার নিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে এই জায়গার নামকরণ হয় আঠারবাড়ী, আর পারিবারিক উপাধিরায়থেকে গেবিন্দবাজার পরিচিত হয় রায়ের বাজারনামে। এই বাজারে সপ্তাহান্তে খুব বড় হাট বসে। তল্লাটে সবচেয়ে বড় হাট। ধান, পাটের পাইকারী বাজার হিসাবে সারা পূর্ববঙ্গে অনেক নাম।

 যতীনবাবু আর গোরাবাবুর সঙ্গে হরকুমার আর শশীও আছে। কিশোরগন্জ থেকে ছোট মাঝারি সাইজের লক্ষীর প্রতিমা নিয়ে দোকান বসছে। যতীনবাবু একটা মাঝারি সাইজের ছাঁচের লক্ষীমূর্তি কিনলেন। দশকর্মা ভান্ডারের ফর্দ বড়মা করে দিয়েছিলেন। দোকানদার নিমাই মজুমদার তার পরিচিত। সে-‘আসেন বড়কর্তাবলে শশব্যস্ত হয়ে দুটো টুল বাইরে নিয়ে বসতে দিয়েছে। যতীনবাবু মান্যিগন্যি ব্যাক্তি। তার ব্যাক্তিত্বে সাধারন লোক একটু সমীহ করে চলে। তবে যতীনবাবু পরিচিত লোক দেখলে তাদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন। নিমাই বেশ খবর রাখে। তার কাগজ পড়ার অভ্যাস। সে বল্ল-‘বলেন দেখি বড়কর্তা-‘ ইউরোপে তো যুদ্ধ চলছে। নেতাজী পৌছে গিয়েছেন ছদ্মবেশে, অফগানিস্থান রাশিয়া হয়ে জার্মানী। আপনার বাসায় রেডিও আছে জানি। নেতাজী আজকাল জার্মানী থেকে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কি শুনছেন? বাঘের বাচ্চা বটে। দম আছে। উনাকে কি জার্মানী সাহায্য করবে।যতীনবাবুর এপ্রশ্নের উত্তর জানা নেই, ভবিষ্যতে কি হবে। যতীনবাবু বল্লেন- ‘দেখ নিমাই, শত্রুর শত্রু  তো বন্ধুই হয়। তা তারা তো এখন নিজেদের যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত। আবার শুনছি চার্চিল সাহেব নাকি অমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সাহেবকে খুব রিকোয়েস্ট করছে যুদ্ধে যোগ দিতে। এখন বড় টালমাটাল সময় হে। দেখছ না আমাদের কংগ্রেস পার্টিভারত ছাড়োআন্দোলন শুরু করেছে।আরে কিছুদিন অপেক্ষা কর। বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল বলে দেবে কি হতে চলেছে।’ 

রায়ের বাজারে,ফলের দোকান বেশ কয়েকটা। সাধারণ দিনে ফল কেনার লোক কম।গ্রামের দিকে এমনিতেই লোকজন বাড়ীর পেয়ারা, নারকেল, আম, জাম, আতা ইত্যাদি নিজের ঘরের গাছ থেকেই পেয়ে যায়। বঙ্গবাসীরা আপেল, ন্যাসপাতি, কলা, আঙুর, বেদানা, কমলালেবু এসব কেনে কচ্চিত কদাচিৎ। কেউ অসময়ে মানে কোন পূজার দিন ছাড়া, ফল কিনলে, চেনা লোকজন জিজ্ঞাসা করে-‘কি ব্যাপার, বাসায় সব কুশল মঙ্গল তো?’ এর কারণ, অসুস্থ রোগীদের গায়ের জোর বাড়াতে , ডাক্তারবাবুদের অবশ্যম্ভাবী নিদান থাকে, ফল খাওয়ানোর জন্য, তাতে আকাঙ্খিতফললাভহোক বা না হোক। জ্বর হলে তো প্রথম পরামর্শ ভাত খাওয়া যাবে না। সাবু বা বার্লি। 

গোরাবাবু বাজারহাটে পোক্ত। তিনি ভালকরে দেখে শুনে গোটা কয়েক জাম্বুরা (বাতাবীলেবু), দু ডজন কলা, গোটা তিনেক আখ, দুসের শাকালু, দুসের শশাও কিনলেন। বাতাসা আর খই দশকর্মা দোকান থেকেই কেনা হয়েছে। প্রসাদ দেওয়ার জন্য ঠোঙাও কেনা হল। হরকুমার আর শশী সব মালপত্র নিয়ে তাড়াতাড়ি হেটে চলে গেল। যতীনবাবু ধীরেসুস্থে একটা জর্দাপান কিনে, পানের বোঁটার ডগায় চুণ লাগিয়ে গোরার সঙ্গে বাড়ীর পথ ধরলেন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তার হাতে একটা এভারেডী কোম্পানির টর্চ। টর্চ জিনিষটা বেশীদিন হয় নি বাজারে এসেছে। যতীনবাবু শৌখিন লোক। নূতন জিনিষ কেনার প্রতি, তার একটা শখ সবসময়ই বিদ্যমান। টর্চটা অবশ্য কেনা ইস্তক খুব কাজে লাগছে। তবে আজ আকাশে চতুর্দশীর চাঁদ টর্চ জ্বালাবার দরকার পরছে না। চাঁদের স্নিগ্ধ কিরণে রাস্তা আলোকিত।যতীনবাবু সাধারনভাবে রোজ বিকালে হাটতে বেরোন। আগে ছড়িটা সবসময় হাতে থাকত। আজকাল তার সঙ্গে যোগ হয়েছে টর্চ। রাস্তায় নজর রাখতে খুব সুবিধা হয়। রাস্তার আশেপাশের বাড়ী থেকে শাঁখের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বেশীরভাগই মাটির বাড়ী। হিন্দু বাড়ীর সামনের নিকানো দাওয়াতে একটি করে তুলসী মঞ্চ।সব বাড়ীতেই কিছু না কিছু ফুলের গাছ।আজকাল বাচ্চাদের পড়ার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। পূজোর মাসটাতে তারা মনের আনন্দে খেলে বেড়ায়। অন্যান্য সময়ে সন্ধ্যার পর স্কুলপড়ুয়াদের দুলে দুলে, জোরগলায় পড়া মুখস্থ করার আওয়াজ পাওয়া যায়। সাধারনবাড়ীর কিছু কিছু মেয়েরা জ্ঞানদা সুন্দরী প্রাইমারী স্কুলে পড়ে। মেয়েদের কোন হাইস্কুল নেই। মেয়েদের বিয়ে ১২/১৬র মধ্যে দিয়ে দেওয়াই রেওয়াজ।খিড়কি থেকে সিংহদুয়ারএরই মধ্যে  জীবন কাটে কন্যাসন্তানদের বিয়ের আগে পর্যন্ত। যতীনবাবু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মশাইএর ভক্ত।যতীনবাবু, বিদ্যাসাগরের জীবনী পড়ে, স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে তাঁর মতামত কাজ সম্পর্কে জেনেছেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর হল তিনি গত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মত সমাজসংস্কারক আর কোথায় জন্মাল বাংলাতে। বাড়ীতে এখনো বিদ্যাসাগরের লেখা বর্ণপরিচয় দিয়ে তার ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখার হাতখড়ি। তাঁরই আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে, দুই মেয়েকে ময়মনসিংহতে পড়তে পাঠিয়েছেন। তার ছোটবোন লতিকাকে পাঠাতে পারেন নি, সেটা একটা মনের কোনে দুঃখ রয়ে গিয়েছে। অথচ লতিকাই পড়াশুনার ব্যাপারে বেশী উৎসাহী। লাইব্রেরীর সবচেয়ে একনিষ্ঠ পাঠিকা লতিকাই।

রায়ের বাজার থেকে ফেরার সময় রেলস্টেশন হয়ে শর্টকাট রাস্তাটা ধরলেন। পায়ে হাঁটা রাস্তা। সঙ্গে টর্চ আছে। তাই অসুবিধা নাই। স্টেশনের পাশেই মসজিদ। সন্ধ্যার নামাজ শেষ করে সবাই বেরোচ্ছে। সবাই চেনে জমিদারবাড়ীর এই ম্যানেজার বাবু। একটু দূরত্ব রেখে কয়েকজন -আদাব, বড়কর্তাবলে উঠল। 

ক্রমশঃ


ধূসর অতীত পর্ব ১৫


ছোটরা সব ভীড় করে কিরণবালাকে ঘিরে উৎসুক হয়ে দাড়িয়ে আছে। আজ লক্ষীর ঘট ভাঙা হবে। এটা কিরণ ফি বছর করে থাকেন। সারা বছর ধরে, বাজার এলে পরে যে খুচরো পয়সা থাকে, তা তিনি একটা ফুটোওয়ালা মাটির ঘটে জমান। সাধারন লক্ষীর ঘট কিনে, সেটা রং করে, কড়ি আর ধান দিয়ে মালার মত করে, উপরে জড়িয়ে দেন, সুন্দর লাগে দেখতে। লক্ষীপূজার দিন সেই ঘট ভেঙে যে পয়সা বেরোয়, তা বাড়ীর বাচ্চা কাজের লোকেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেন। পাঁচ সাত সিকে সবারই ভাগ্যে জুটে যায়। পয়লা বৈশাখের মেলা বা রথের মেলা বা দোকান থেকে বাচ্চারা  জিনিষ কিনতে পারে নিজের ইচ্ছে মতন।

মালতী চালের গুঁড়ো করে জল মিশিয়ে আলপনার দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। বড়মার তত্বাবধানে চলছে আলপনা আর লক্ষীর পায়ের ছাপের কাজ। হেনা, লতিকা, আরতি, মিনতি, দীপ্তি  সবাই মিলে লক্ষীর পায়ের ছাপ আঁকতে ব্যস্ত।   পায়ের ছাপের মধ্য্খানে ধানের ছড়াও আঁকা হচ্ছে। দিদিদের দেখে তপতীরও ইচ্ছে সেও আল্পনা দেবে। মিনতির ফ্রক ধরে সে টানাটানি শুরু করছে। মিনতি তাকে একটা সরাতে কিছুটা গোলা আর কাপড় দিয়ে দেখিয়ে দিল, কেমন ভাবে লক্ষীর পা আঁকতে হবে। আরতি তপতীকে বল্ল -‘ তুই তো সবে শিখছিস, তুই চৌকরী ঘরের (চাল, ডাল ইত্যাদি রাখার ঘর) সামনের সিঁড়ি আর রান্নাঘরের সিঁড়িতে বানা। 

ঠাকুরের মুখ কলাপাতা দিয়ে বাঁধা। লক্ষী ঠাকুর অধিষ্ঠান করেছেন জলচৌকির উপর পাতা একটা লাল মখমলের আসনের উপর। কিরণবালা  চক দিয়ে চারিপাশে সুন্দর করে আল্পনার ডিজাইন করে দিয়েছেন। হেনা আর আরতি তার উপরে চালগোলা দিয়ে আলপনা দিচ্ছে। বাগিচা পুকুর থেকে পদ্মফুল আনা হয়েছে। কিরণবালা সকাল থেকে ব্যস্ত। হরকুমার সকাল সকাল গোয়ালের গরুর দুধ দুইয়ে দিয়েছিল, সেটা পিতলের কড়াইতে জাল দেওয়া হচ্ছে। বড়মা নূতন ছাঁচ বানিয়েছেন মাটি দিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে।হাতী, হরিণ, আম আর লিচুর নকশা। গোটা চারেক ঝুনো নারকেল গাছ থেকে পাড়া হয়েছে। সেটা দিয়ে প্রতিভা বসেছেন নাড়ু তৈরী করতে।


আজ বিকাল থেকে দুই পুরোহিত ভাই রাজেন্দ্র মোহন আর বিপিন মোহন খুব ব্যস্ত। প্রথমে জমিদার বাড়ীর লক্ষীপূজা, তারপর রায়বাড়ীর সব হিস্যা পূজো, এছাড়া চার পাঁচজন যজমান, তাদের বাড়ীর পূজা সবই সারতে হবে।পূজার মাসটাতে প্রণামীর শাড়ী, গামছা, ধুতি যা পাওয়া যায়, তাতে তাদের পরিবারের সারা বছরের কাপড় হয়ে যায়। 

জমিদারবাড়ীর পূজা সেরে সন্ধ্যে নাগাদ পুরুতমশাই এলেন। কলার থোড়ের বাকলটাকে কে অর্ধেক কেটে হরকুমার ডোঙা বানিয়েছে। আরেকটা ছোট টুকরা আড়াআড়ি দিয়ে ঠিক নৌকার আকৃতি হয়েছে। তার উপর টাকা, স্বর্ণ মুদ্রা, ধান, পান, কড়ি, হলুদ হরিতকী দিয়ে সাজানো হয়ছে পূজা স্থানটিকে। আজকাল রেলগাড়ী হয়েছে। আগে শস্য রপ্তানী হত নৌকাতে। অন্য বাণিজ্যও হত জলপথে। তারই প্রতীকি হিসাবে ডোঙার নৌকা।  হরিদাসের সবেতেই কৌতূহল। সে ঠাকুরমশাই জিজ্ঞাসা করল - ‘প্যাঁচা কেন লক্ষীঠাকুরের বাহন?’ বিপিন মোহন শাস্ত্রজ্ঞ লোক তিনি বল্লেন-‘চাল , অন্ন , খাদ্যশস্য হল লক্ষ্মীর প্রতীক। ধানক্ষেতের আশেপাশে ইঁদুর বা মূষিকের বাস এবং এরা ধানের ক্ষতি করে থাকে। পেঁচার আহার হল এই ইঁদুর। গোলাঘরকে লক্ষ্মীর প্রতীক বলা হয়। গোলাঘরের আশেপাশে ইঁদুরের বসবাস। পেঁচা এই ইঁদুরকে খেয়ে খাদ্যশস্য রক্ষা করে। তাই থেকে পেঁচা লক্ষীর বাহন।ঠাকুরমশাইএর তাড়া আছে। আরো কয়েকটা পূজা বাকী। সিধের ফলমূল, মিষ্টি, চাল, ডাল সব গামছার বেধে দেওয়া হল। এরপর লক্ষীর পাঁচালী পাঠ। ওটা বড়মা ভাল পারেন। রাতে প্রসাদের সঙ্গে লুচি তরকারী। পূজোর দিন আজ নিরামিষ।আজকে ছেলেরা সব রাত জাগবে। লক্ষী চঞ্চলা। তাকে ধরে রাখতে সবার চেষ্টা। যে গৃহস্থের ভান্ডার উপচে পড়ছে, সে চায় সম্পত্তি রক্ষা করতে, যে অভাগার সবই বাড়ন্ত, সে প্রতীক্ষা করে, পূজা শেষে কখন লক্ষী ঠাকুরণ তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। জনশ্রুতি আছে, কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন দেবী রাত্রে খোঁজ নেন - কে জেগে আছেন? যে জেগে অক্ষক্রীড়া করে মানে পাশা খেলে, লক্ষ্মী তাকে ধন সম্পদ দান করেন  

নিশীথে বরদালক্ষী জাগরীতিভাষিণী।

তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ।।

তবে শাস্ত্রে যাই লেখা থাকুক, পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আলোয় গৃহস্থ বাড়ী থেকে ফলমূল চুরি করাটাই, রাত জাগা পার্টির মুখ্য আকর্ষণ থাকে।মনোরমা দেবীর ছেলে ফটন, তাপসের ফটন কাকা তার ছোটভাই পরিমল, যদিও সে সম্পর্কে তাপসের কাকা, সে তাপসেরই বয়সী, হরকুমার শশী, রাখাল, আশেপাশে কয়েকজন বন্ধু আর তাপস মিলে রাতের এডভেঞ্চার শুরু হল। হরিদাসের খুব ইচ্ছে ছিল দলে সামিল হওয়ার, কিন্তু তার মা প্রতিভা তাকে ছোট বলে যেতে দেন নি। সারা রাতে তাদের সংগ্রহ বেশ কয়েকটা পেঁপে, পেয়ারা আর নাশপাতি। রাতে বোঝা যায় নি তাই অর্ধেক পেঁপেই দেখা গেল কাঁচা।

বড়মায়ের অভ্যাস দুপুরে খাওয়ার পর একটু গড়িয়ে নিয়ে, রামায়ণ বা মহাভারত পাঠ। আজকাল মেয়ে লতিকা আর নাতনিদের আবদারে সেটি হওয়ার যো নেই। তিনি বসে যান সবার সাথে লুডো খেলতে। তবে আজকে মাঝরাস্তায় খেলা বন্ধ করে তাকে উঠতে হল। উত্তরের হিস্যা থেকে সোনা দিদিমনি এসেছেন। তার বর দুর্গাদাস রায়। ছেলে বিমল, নটবর তারা তাপস পরিমল এর বন্ধু। জমিদার গিন্নি খবর পাঠিয়েছেন বিকালে একটু গল্পগুজব করার জন্য। বড়মা, কিরণবালা, সোনা দিদিমনি, প্রতিভা সবাই মিলে চল্লেন জমিদারবাড়ী। যতীনবাবুর বাড়ীর লাগোয়া পাঁচিলের মধ্যে খিড়কী দরজা। পাশেই চত্বরের চারকোনে চারটে বাড়ী। মেন গেটটাকে সিংহদুয়ার বলা যায়। খুব উঁচু। উপরে কারূকার্যখচিত। মহিম রায়ের আমলে তৈরী। মেন গেটের পশ্চিমে দোতলা বাড়িটিতে জমিদারবাবুরা থাকেন। বাড়ীর ভিতটা বেশ উঁচু। টানা বারান্দা। পাঁচটি চওড়া সিঁড়ির উপরে বারান্দা। জমিদারগিন্নি বীণাপাণী দেবী সার্থকনামা, শ্বেতশুভ্রা, সুন্দর মুখশ্রীর অধিকারিণী, তার কন্ঠস্বরটিও মিষ্টি কোমল। তার কোমরছাপানো ঘন কেশগুচ্ছ। তার গৌরবর্ণের জন্য রায়বাড়ীর মহিলারা তাকে রাঙ্গাদি বলে ডাকে।বীণাপাণী দেবী বাকি সব মহিলারা বসলেন সিঁড়িতে। সোনাদি পরিপাটি করে চুল আঁচড়াতে পটিয়সী। জমিদারগিন্নির মেয়ে অমিয়া জবাকুসুম তেলের শিশি দিয়ে গেল।তেল লাগানো হলে, সোনা দিদিমনি হাতির দাঁতের চিরুণি দিয়ে অনেক্ষণ ধরে চুল আঁচড়ে বেনুনী বাঁধলেন। রাঙ্গাদি বলছিলেন, তাদের কলকাতায় ভবনীপুরের বাসস্থান রূপচাঁদ মুখার্জি লেনের সামনের বড়রাস্তায়বিজলীনামে একটি সিনেমা হল নির্মান শুরু হয়েছে। আজকাল নির্বাক বাংলা ছবির সময় আর নেই। এখন সংলাপ শোনা যায়। কথা শোনা যায় এরকম সিনেমাকেটকিবলে। সাহেবপাড়াতে যে হলগুলি আছে নিউ এম্পায়ার, মেট্রো, লাইটহাউস সেগুলোতে সব ইংরাজী সিনেমা আসে, বীণাপাণি দেবীর তাতে কোন উৎসাহ নেই। তবে জমিদারবাবু তাকেদি এডভেন্চার অফ মার্কো পোলোদেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেক মারকাটারি বই। গত শীতে তিনি সপরিবারে পার্ক সার্কাস ময়দানে, দি গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস এর খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। শূন্যে ট্রাপিজের খেলা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। সবচেয়ে অবাক করা কান্ড রিং মাস্টার একটা ইয়া বড় বাঘ নিয়ে এল। রিং মাস্টারের হাতে একটা চাবুক। অতবড় বাঘ, পোষা বিড়ালের মত তার পায়ে পায়ে ঘুরছে। সোনা দিদিমনি বল্লেন-‘ বাঘ তো বনের রাজা, তাকে পোষ মানাল কি করে?’ সব শুনে প্রতিভা দেবীর সপ্রতিভ উত্তর-‘নিশ্চয়ই বাঘটাকে আফিম খাইয়ে নেশা করিয়ে দিয়েছে, তাই ওটার বিড়ালের মত হাবভাব।কিরণবালা ভাবলেন, শীতকালে ময়মনসিংহ শহরে সার্কাস এলে সবাইকে নিয়ে যাবেন। সত্যিই তো পৃথিবীতে কত কি যে দেখার আর জানার আছে। 


এরমধ্যে, আরতি, মিনতি, হেনা, দিপ্তী,তপতী সবাই এসে গিয়েছে। সিঁড়ির দুদিকে দুটো করমচা গাছ। কন্টকময় গাছ, তবে এর  ফলগুলো পাকলে পরে লাল রংএর সুন্দর দেখতে হয়। খেতে অবশ্য টক। বাচ্চারা মহা উৎসাহে করমচা পাড়ার চেষ্টা করছে। জমিদার গিন্নির মেজো মেয়ে উমা একটা ডান্ডা নিয়ে বেশ কয়েকটা করমচা নামাল। অন্দরমহল থেকে সুসজ্জিত ট্রেতে করে কফি এল, সঙ্গে কলকাতা থেকে আনা কেক।জমিদারগিন্নির বিকালে চা খাওয়া অভ্যাস, তবে কেকের সঙ্গে কফি ভাল চলে তাই আজ কফি এসেছে। বীণাপাণী দেবী বল্লেন-‘ সাহেব পাড়াতে ফ্লুরিস বলে একটা কেক, চকলেটের দোকান আছে। বছর দশ বার আগে খুলেছে। এর মধ্যে সেটা খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। খেয়ে বল তো কেমন লাগল? সবাই একবাক্যে জানালেন খুবই সুস্বাদু। কথায় কথায় জমিদারগিন্নি জানালেন, ময়দা আর ডিম লাগে কেক বানাতে। ডিম শুনে কিরণবালার মনে হল, তাদের বাড়ীতে তো ডিম, মুরগী ঢোকা বারণ। শুনেছেন ডিমে খুব গন্ধ হয়। কিন্তু কেকটাতো দারুণ খেতে। সত্যি সাহেবরা কত কি জিনিষ আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছে।

   মহিলারা সবাই উঠে পড়েছেন। সবাই মিলে হাটতে বেরোলেন। জমিদারবাড়ীর ভিতরের পুকুরটাকে ডানদিকে রেখে সোজা গেলে পাঁচিলের পাশে গেট পেরোলে একটা রাস্তা। এই রাস্তায় লোকজন কম। পাশে একটা আমবাগান। সেটাও জমিদারের। বীণাপাণী দেবীর বাপের বাড়ী পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার জয়নগরে। তিনি বিয়ের পর পূর্ববঙ্গীয় রীতিনীতি শিখেছেন। ভাষাটা পুরোপুরি রপ্ত হয় নি। তার কারণ বছরের বেশীরভাগ সময়টাই তিনি কলকাতায় থাকেন। তিন ছেলে তিন মেয়ে নিয়ে তার ভরা সংসার। আজকাল ছোট ছেলে প্রবীরকে ব্যারিস্টারী পড়াবার জন্য চিন্তা ভাবনা চলছে। 

ক্রমশঃ


ধূসর অতীত পর্ব ১৬

 

আর দুই তিনদিন পরে কালীপূজা। সন্ধ্যার পর হাল্কা হাল্কা ঠান্ডা ভাব। যতীনবাবু শুজনিটাকে গায়ে ভাল করে জড়িয়ে নিয়েছেন জমিদার বাড়ীর পাঁচিলের গেটের পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলোর তলায় অনেক শামা পোকার জমায়েত। এই ডায়নামো বসানোর পর জমিদারবাবুরা যখন আঠারবাড়ীতে থাকেন তখন ইলেকট্রিক লাইটের আলো চারিদিক আলোকিত করে রাখে। যতীনবাবুর কলেজের বন্ধু বিজয়বাবু কাছারীবাড়ীর খাজাঞ্চির চাকরী করেন। খুব দায়িত্বপূর্ণ কাজ। ডিহি কাছারী থেকে যখন খাজনা ভর্তি সিন্দুক নিয়ে আসে পেয়াদারা, সেই সমস্ত টাকাকড়ির হিসাব বুঝে নেওয়া, জমা খরচের হিসাব, সবই তার দায়িত্বে। একটু পরেই বিজয়বাবু এসে উপস্থিত হলেন যতীনবাবুর বৈঠকখানায়। প্রায় রোজই বসে সান্ধ্য আড্ডার আসর।


স্কটিশচার্চ কলেজ জীবনে তিনি যতীনবাবুর জিগরী দোস্ত ছিলেন। একই মেসে থাকতেন। তবে বিজয়বাবু পড়তেন বঙ্গবাসী কলেজে। উনার দেশের বাড়ী কিশোরগঞ্জের কাছে মৃগা গ্রামে। ময়মনসিংহ শহরে, স্কুলেও দুজন সহপাঠী ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গান্ধীজির ডাকে অসহযোগ আন্দোলনের সময় দুজনে তকলিতে সুতো কাটতে শিখেছিলেন। যতীনবাবু বিএ পাশ করার পর, ‘হিন্দুস্থান কোঅপারেটিভ ইনশিওরেন্স সোসাইটি’  নামক কোম্পানীতে চাকরী পেয়েছেন। ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন স্বয়ং নলিনী রন্জন সরকার। তিনি এই কোম্পানির প্রেসিডেন্ট আবার বেঙ্গল কংগ্রেসের হোমরা চোমড়া নেতা। ইন্টারভিউ দেবার সময় যতীনবাবু জানতেন না যে, নলিনী সরকারের আদিবাড়ী ময়মনসিংহের কেন্দুয়াতে। কেন্দুয়ার অনেক জায়গা আঠারবাড়ীর জমিদারির আওতায় পরে।এপ্লিকেশনে, যতীনবাবুর বাড়ী আঠারবাড়ী শুনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন জমিদারকে চেনেন কিনা। জমিদারমশাই যে সম্পর্কে কাকা হয় সে কথা জানিয়েছিলেন যতীনবাবু। বংশপরিচয়, ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ চার্চ কলেজ, তদুপরি গৌরকান্তি সুপুরুষ ছেলেটিকে তার পছন্দ হয়েছিল। চাকরীটা সহজেই হয়ে গেল। সব বন্ধুরা এই কারণে তাকে খুব প্রশংসার চোখে দেখছে।  যতীনবাবু প্রথমে ভাবছিলেন এম পড়বেন। আঠারবাড়ীতে বাবাকে জানিয়ে পরামর্শ চেয়েছেন। কালই চিঠির উত্তর এসেছে। রজনী মোহন লিখেছেন, বিএ পাশও বড় ব্যাপার, যতীন রায়বাড়ীর মুখোজ্জ্বল করেছে। ইনশিওরেন্স কোম্পানীর চাকরি তো অতি উত্তম। চাকরীতে যোগদান করা যতীনের পক্ষে মঙ্গলদায়ক। আজ মার্কশীট পাওয়া যাবে। যতীন আজ বন্ধু বিজয় কে নিয়ে কলেজে গেলেন। মেস থেকে হাঁটা পথ। রাস্তায় ভীড়। আজ উল্টোরথ। মেলা বসেছে। দুজনে ট্রামে উঠেছেন।


বছর দশেক হল ইলেকট্রিক ট্রাম চলছে। তার  আগে মানে ১৯০২ সালের আগে চলত ঘোড়ায় টানা ট্রাম। মাত্র দশমাস আগে ব্রিটিশ সরকার কলকাতা থেকে রাজধানী তুলে নিয়ে গিয়েছে দিল্লিতে। মার্কশীট নিয়ে যতীনবাবু, বিজয়বাবুকে বল্লেন - ‘চল যাই হেদোয়, কবে আবার কলেজ আসব ঠিক নেই। বিকাল হচ্ছে, ওখানে পুকুরপাড়ে বসে কিছু খাওয়া যাবে। সঙ্গে আরেক বন্ধু দীপক কৃষ্ণ দেব। সে শোভাবাজারের দেব পরিবারের ছেলে। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। দীপকদের বাড়ী যতীনবাবু গিয়েছেন দুর্গাপুজার সময়। বিশাল বনেদী চকমিলানো জমিদারবাড়ী অবনীদের।গত বছর এই পূজা দেখার জন্য যতীনবাবু কলকাতায় ছিলেন। আঠারবাড়ী গিয়েছিলেন লক্ষীপূজার সময়। তিনজনে এসে বসেছেন পুকুরের পারে। হেদোর একপাশে কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট আর আড়াআড়ি ভাবে চলে গিয়েছে বিডন স্ট্রীট। তিনজনে বসে কথাবার্তা হচ্ছে। দীপক আর পড়াশুনা করবে না। পৈত্রিক ব্যবসা দেখবে। তার বিয়েও ঠিক হয়ে গিয়েছে। যতীনবাবু দোটানার মধ্যে। কলেজের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড ডক্টর জেমস ওয়াট খাঁটি স্কটিশ সাহেব। তার সঙ্গে রেজাল্ট নিয়ে দেখা করেছিলেন। তিনিও উৎসাহ দিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। তবে পিতৃআজ্ঞা শিরোধার্য করে চাকরী করাই মনস্থ করলেন।

তবে বিধিলিপি কে খন্ডাতে পারে। চাকরিজীবন শুরু হল। পুরানো মেস থেকে অফিস যান। মিনার্ভা থিয়েটার তার মেসের কাছে। যতীনবাবু শৌখিন লোক। রবিবার ছুটির দিন নাটক দেখতে যান। গিরিশ চন্দ্র ঘোষ কিছুদিন হল মারা গিয়েছেন। আজকাল তারই রচিত নাটক চলছে। চৈতন্যলীলা, সিরাজদ্দৌলা, প্রফুল্ল পালাগুলি দেখলেন। ঐতিহাসিক পালাই তার বেশী পছন্দ।বছরদুয়েক কাটল। ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। সবদিকে অস্থিরতা। জিনিষপত্রের দাম বাড়ছে। যুদ্ধে ব্রিটেনের যা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তার সিংহভাগ পূরণ হচ্ছে ভারতের অর্থব্যবস্থা থেকে। একদিন যতীনবাবু চিঠি পেলেন তাদের রায় পরিবারের পশ্চিম হিস্যার শরিক অশ্বিনী রায়ের কাছ থেকে। তিনি আঠারবাড়ীতে থাকেন এবং জমিদারী দেখাশোনা করার জন্য জমিদার প্রমোদ রায়চৌধুরী তাকেই সর্বময় কর্তা করে রেখেছেন। যতীনবাবুর কাছে অশ্বিনী রায় বড়ভাইএর মত। অশ্বিনীবাবুও স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশুনা করেছেন। চিঠির বক্তব্য হচ্ছে, এতবড় জমিদারির সমস্ত কাজ তার একার পক্ষে দেখাশুনা সম্ভব হচ্ছেনা। তিনি প্রমোদবাবুর সঙ্গে কথা বলে রেখেছেন। যতীন যদি জমিদারির কাজে যোগ দেয় তাহালে তিনি খুশী হবেন। মাইনেও বেশী। যতীনবাবু জ্যেষ্ঠ পুত্র, তার তলায় আর সাতটি ভাইবোন। তিনি বরাবরই কর্তব্যপরায়ণ। তিনি চিন্তা করে দেখলেন, দেশের বাড়ীতে থেকে চাকরি করা, পরিবারের দায়িত্ব বহন করা, নিজেদের তালুকের সম্পত্তির দেখভাল করা সবই সম্ভব হবে। কিছুদিনের মধ্যে ইনসিওরেন্সের চাকরিতে রেজিগনেশন দিয়ে চলে এলেন আঠারবাড়ীতে, জমিদারের চাকুরীতে। সেও প্রায় সতের বছর হয়ে গেল। তিনি আসার কিছুদিন পরে খাজাঞ্চির পোস্ট খালি হয়েছিল। যতীনবাবু নিজেই উদ্যোগ নিয়ে পুরানো বন্ধু বিজয়কে নিয়ে এলেন খাজাঞ্চি হিসাবে। 


বিজয়বাবু আসার একটু পরেই সাধন সরকার বাবু এলেন। সরকারবাড়ী কাছেই। তাদের বাড়ীতে লেখাপড়ার চল আছে। কাছারী বাড়ীর কর্মচারী নিখিল চক্রবর্তী আর পশ্চিমের হিস্যার সুধন্য রায় এলেন।যতীনবাবুর সেজ-ভাই নরেন্দ্র মোহন, ডাকনাম সুন্দর, লাইব্রেরী বন্ধ করে যোগ দিলেন আড্ডাতে।একটু পরেই রেডিওতে নেতাজীর বক্তৃতা শুরু হবে। যতীনবাবু হাঁক পাড়ল্নমিনতি রেডিওটা চালিয়ে দিয়ে যা রেডিওতে হাত দেওয়ার অনুমতি সবার নেই। মিনতি আর তাপস জানে রেডিও চালাতে। মিনতি এসে এরিয়ালের কানেকশন জুড়ে, ব্যাটারীর তার রেডিওতে লাগিয়ে, পিছনের সুইচ টিপে অন করল। এরপর শর্টওয়েভের নব টিপে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে টিউন করা।  ঘড়ঘড় আওয়াজ হচ্ছে। একটু পরে রেডিও স্টেশন পাওয়া গেল। মিনতি ভিতরের ঘরের স্পিকারের তারটা রেডিওতে জুড়ে চলে গেল। ভিতর ঘরে কয়েকমাস হল নূতন স্পিকার লাগান হয়েছে। আশেপাশের বেশ কিছু শিক্ষিত হিন্দু, দুই একজন মুসলিম রেডিও শুনতে আসেন।তাই রেডিওর স্থান এখন বৈঠকখানার ঘরে। অন্দর মহলে যাতে মহিলারা শুনতে পান, সেইজন্য স্পিকারের বন্দোবস্তো করা হয়েছে। একটু পরে নেতাজীর আওয়াজ ভেসে এল বার্লিন রেডিও থেকে। সংক্ষিপ্ত ভাষণ ইংরাজীতে। স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে বলছেন। সরকারবাবু বল্লেন- এই যে ৮ই অগাস্ট,দেশব্যাপীভারত ছাড়োআন্দোলনের ডাক দিয়েছেন গান্ধিজী, দেখছেন তো গভর্নমেন্ট কেমন শক্ত হাতে মোকাবিলা করছে। কংগ্রেসের সব বড় বড় লীডারকে ধরে পরেরদিনই জেলে পুরে দিয়েছে। দ্যাখেনদিকি, লিডারের অভাবে আন্দোলন মাঠে মারা যাচ্ছে। যতীনবাবু বল্লেনতার উপর ধরেন মুসলীমলীগ সমর্থন দেয় নাই। শুনছি ছোটখাট ব্যাবসায়ী বা কল কারখানার শ্রমিকরাও এতে যোগ দেয় নাই বিজয়বাবু বল্লেনইউরোপে যুদ্ধ লাগছে, দ্যাখতাসেন না জিনিষপত্রের দাম হু হু কইরা বাড়তাছে। দোকানদার, আড়তদারদের হাতে অনেক কাঁচা টাকা। তারা কি কারণে যোগ দিব এই ঝামেলার মধ্যে?’ নরেন্দ্র মোহন, কয়েকদিন আগে ময়মনসিংহ থেকে ঘুরে এসেছেন। তিনি বল্লেনবড়দা, আপনারে কই, শহরেই আন্দোলন, মিছিল হইতাসে। কলেজের পুলাপানদের দ্যাখলাম ময়মনসিংহ শহরে কাছারীঘাটের কাছে মিছিল কইরা যাইতাসে।শুনতাসি, বম্বে, কলকাতা শহরে পুলিশ লাঠি চালাইতাসে মিছিলের উপর। আমাগো আঠারবাড়ী চুপচাপ। গ্রামে গন্জে বিশেষ কিছু বোঝা যাইতাসে না কথার মাঝখানে আরতি সবার জন্য চা নিয়ে এল। যতীনবাবু বল্লেন তার ভাইফটনএবার দুর্গাপূজায় ছুটি পায় নাই। সে চাকরী করে আসামের চা বাগানে। তার আসার কথা কালীপুজার দিন। তবে সে কাউর হাত দিয়ে দু পাউন্ড উৎকৃষ্ট চা পাঠিয়েছে। একটু পরে আড্ডা শেষ হল। 

কিছুক্ষণ পর রাতের খাওয়ার পালা। ভিতরের টানা বারান্দায় পরপর আসন পাতা। যতীনবাবুর আজকাল মনোযোগ কনিষ্ঠা কন্যা তপতীর প্রতি। সে অত্যধিক রোগা। তপতীর খাওয়ার ব্যাপারে প্রচন্ড অনীহা। তার বয়স এখন সাড়ে তিন। কিরণবালা তাকে সাধাসাধি করেও কিছু খাওয়াতে পারেন না। তার হাতে সময়ও কম। সবার প্রতি নজর দিতে হয়। আজকাল যতীনবাবুর নির্দেশে তপতীর আসন পাতা হয় তার পাশে। যতীনবাবু লক্ষ করেছেন, তপতীকে সাধলে সে কিছুতেই নিতে চায় না। ভেবেচিন্তে তিনি একটা নূতন পদ্ধতি ধরেছেন। তাতে মনে হচ্ছে বেশ কাজ হচ্ছে। যখনই কিরণবালা তপতীকে কিছু দিতে চান, যতীনবাবু বলে ওঠেননা, বোধহয় খাইব না, আমারে দাও-দেউ খাইনতারপর একটু চেখে বলেন- ‘-বড়ই সুস্বাদুএই শুনে তপতী পিটপিট করে বাবার দিকে তাকায়, তখন কিরণবালা বলে ওঠেন-‘কি রে তপতী , একটু খাইয়্যা দেখবি নাকি’? তপতী তখন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।

ক্রমশঃ


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments