বাঘে ছুলে আঠারো ঘা (সত্যি ঘটনা অবলম্বনে)

 



বাঘে ছুলে আঠার ঘা

কথায় আছে-ডাক্তার, উকিল, পুলিশ এদের সঙ্গে যত কম এনকাউন্টার হয় ততই মঙ্গল। শুধু যে মানসিক শান্তি বিঘ্নিত তাই নয়, টাকা যে জলবত তরলমের ন্যায় পার্স থেকে বিপক্ষের দিকে ধাবিত হবে তার কোন ইয়ত্তা থাকবে না। 

নিম্নলিখিত ঘটনা তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। কালকে পার্কে হাঁটার সময় এক পরিচিতর সঙ্গে দেখা। অনেকদিন ধরে চিনি। কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরের সন্তান। আমার থেকে কয়েক বছরের ছোট। সফ্ট স্পোকেন এবং ভদ্র। পড়াশুনার ব্যাকগ্রাউন্ড হচ্ছে রাশিয়ার রিগা ( ল্যাটাভিয়া) থেকে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে আগে ইউক্রেনের মিগ ২৯ ফ্যাক্টরিতে ছিল পরে এম বি করে, ডিসিএম, আইএফবি ইত্যাদি তে চাকরী করে বছর তিনেক আগে আইএলএফএস চাকরী করছিল। বিগত বিশ ধরে আন লাইন এডুকেশন প্রোগ্রামের উপর কাজ করছে। সেল্স লাইনে থাকায় বিদেশ টিদেশ খুব যেতে হয়।

বছরখানেক আগে চাকরী ছেড়ে দিয়েছে শুনেছিলাম। পার্কে হাঁটতে হাঁটতে তার কারন জিজ্ঞাসা করছিলাম। তারপর সে প্রায় একঘন্টা ধরে তার দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানাল। এটা পড়লে বোঝা যাবে দুর্নীতি বীজ আমাদের দেশে কি ভাবে গভীরে ঢুকে। ধরা যাক ছেলেটির নাম সুবীর। ২০১২ সালে সুবীর ভিপি পজিশনে ছিল নিউ হরাইজন কোম্পানির। এটা ছিল ডিসিএম এর সিস্টার কনসার্ন। এরা মূলত এডুকেশন সফ্টওয়ার বিক্রি করে। ওরা বিহার মহাদলিত বিকাশ মিশন( নীতিশ কুমার তৈরী করেন ২০০৭ দলিত সম্প্রদায়ের কল্যানে) থেকে একটা প্যাকেজ কনট্রাক্ট পায় ১৩/১৪ কোটি টাকার, তাতে সফ্টওয়ার ক্লাস রুম ট্রেনিং ছিল under a programme of skill development of Dalits. সুবীর নিউ হরাইজনের পক্ষ থেকে চুক্তিপত্রে সাইন করেছিল।

২০১৪ তে কনট্রাক্টের টার্মস অনুযায়ী যখন  execution শুরু হবে, তখন এক বিহারী কে সিনিয়ার ভিপি করে ওর উপর বসান হয়। নূতন বসের সঙ্গে মতান্তর হওয়াতে সুবীর ২০১৪ জানুয়ারীতে অন্য ডিপার্টমেন্টে transfer নেয় একবছর পরে চাকরি ছেড়ে অন্য একটা বিদেশী কোম্পানীতে যোগ দেয়। ২০১৭ তে আইএফএসএল জয়েন করে ইন্aটারন্যাশানাল মার্কেটিং এর প্রধান হিসাবে। 


সেই সফ্ট-ওয়্যার ও ক্লাসরুম ট্রেনিং এর চুক্তির দীর্ঘ চার বছর পর, 2018 সালে সূত্র মারফত হঠাৎ জানতে পারে ওর নামে বিহারে FIR এর দায়ের হয়েছে এবং কেস ফাইল তৈরী হয়ে এখন কোর্টে মামলা দায়েরেরজ মুখে বিহার গভর্নমেন্টের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্ট কেস ফ্রেম করছে। সুবীর তড়িঘড়ি করে পাটনা ছোটে। প্রথমে গিয়ে বিহার গভর্নমেন্টের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্ট দেখা করে এবং বলে আমি তো অনেক আগে চাকরী ছেড়ে দিয়েছি, কি কারনে আমার নাম এল? ডিলিং ক্লার্ক বলে, আপনার ব্যাচে যত ছাত্র থাকার কথা তার থেকে অনেক বেশী ছাত্র দেখিয়ে ফলস বিলিং করেছেন। সুবীর বলে - এটা হতেই পারে না। ওই শীটে গভর্নমেন্ট অফিসারের সই থাকে। ওর ল্যাপটপ থেকে সেটার কপি দেখায়। তখন একজন সরকারী অফিসারকে ডাকে সুবীরের সামনে। তারপর সুবীরকে বলে, চিন্তা করার কিছু নেই। তোমার নাম ডিলিট করে দেব। বেশ কয়েকমাস পরে কিছু কমিউনিকেশন না পেয়ে সুবীর আবার যায় বিহার গভর্নমেন্টের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্টে। লোকটা বলে - “আরে আপ কিউ দুবারা কষ্ট কিয়া। do not worry, আপকা নাম নেহী হোগা এসময় আমি সুবীরকে বল্লাম তুমি writing সব লিখে registered post পাঠাওনি কেন? মুখের কথায় কেউ বিশ্বাস করে? সুবীর বল্ল সেটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছিল।


এরপর খবর আসে,বিহার গভর্নমেন্টের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্ট টাকা নয়ছয়ের জন্য বিহার মহাদলিত বিকাশ মিশনের CEO রামাইয়া( পরে প্রিন্সিপাল secretary) এবং সুবীর সহ আরো দশজনের against কেস frame হয়ে পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে। তাতে সুবীরের বিরুদ্ধে  কোন প্রত্যক্ষ অভিযোগ নেই, শুধু লেখা যে -“He was the signatory on behalf of new horizon.” তখন   বিহার গভর্নমেন্টের ভিজিলেন্স ডিপার্টমেন্টে যায় এবং জানতে পারে new horizon থেকে লোক এসেছিল ডাইরেক্টর লেভেলের, তারা ঘুষ দিয়ে উপরের অফিসার অরবিন্দ কুমারকে হাত করে, নিজেদের নাম কাটিয়ে, সুবীরের নাম ঢুকিয়েছে। আরো একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার হল চার্জশিট এর ধারা অনুযায়ী যে ধারা প্রযোজ্য সেটা “নন-বেলেবল অফেন্স”. তখন পাটনাতে লোয়ার কোর্টে বেল এপ্ল্যিকেশন করে। দুটো হিয়ারিংএর পর জাজ বলেন যে সুবীরের জন্য তো কোন কেসই নেই, পুলিশ যদি পরবর্তী শুনানীর  আগে কিছু না দেয় তো বেল গ্রান্ট করে দেব।

কিন্তু বিধি বাম। বিহারে তখন তদানীন্তন principal secretary রামাইয়া, IAS খুবই ঘনিষ্ঠ নীতিশকুমারের। ওর বিরুদ্ধেই মেন মামলাটা ছিল। উনি২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে একমাস সময় দলিত বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকার সময় সে দুটো চেক ইসু হয় new horizon কে, প্রায় তিন কোটি. যেদিন চেক সাইন করে, তার দুদিন পর ওর VRS নেওয়ার কথা। তো রামাইয়া এবং কয়েকজন হাইকোর্টে anticipatory bail এর জন্য apply করে। কিন্তু জাস্টিস প্রদীপ কুমার “considering the gravity of the crime” বেল ডিনাই করে। বিহারের জুডিশীয়ারিতে এতই করাপশন যে কয়েকদিন পর রামাইয়া lower Court বেল এ্যপ্লাই করে। যেদিনকে কেসটার ডেট পড়ে, সেদিনটার জন্য রেগুলার জাজ ছুটি নেয় এবং যে সেদিন যে জাজ কেসের হেয়ারিং নেন, তিনি রামাইয়া এবং বাকী শাগরেদদের বেল মন্জুর করে দেন। এই ঘটনা কয়েকদিন পরে, হাই কোর্টের জাজ প্রদীপ কুমার জানতে পারে এবং হুইপ জারী করে explanation চায় সংবাদ মাধ্যমে corruption in judiciary এবং foul play ব্যাপারে কথা বলেন।


এর দুদিন পরে, সুবীরের 3rd hearing হয়,  lower court এ। জাজ নাকি জনান্তিকে বলেন - এই scam এখন আমি বেল দিলে আমার চাকরী নিয়ে টানাটানি। জাজমেন্টে সুবীরের ইনোসেন্স নিয়ে সব observation দিয়ে লাস্টে লেখেন, however there are some aspects in this sensitive case which requires some more investigation.. so bail is not granted.

 

এর কয়েকদিন পর পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ১১ বেঞ্চের জাজ বসে এবং জানায়প্রদীপ কুমার has outreached his judicial power’ এবং ওর রায় কে খারিজ করে রামাইয়ার বেল বৈধ বলে ঘোষনা করে। এর পরে নভেম্বর ১৮ তে প্রদীপ কুমারকে সুপ্রিম কোর্টের কলোজিয়াম কর্নাটকে transfer করে দেয়। করাপ্ট সিস্টেমের সঙ্গে একলা লড়তে গেলে এটাই এইদেশে প্রাপ্য। তবুও কিছু তো সৎ লোক এখনও আছে এই দেশে।


এরপর ২০১৯ এর মাঝামাঝি সুবীরের কাছে ফোন আসে পাসপোর্ট অফিস থেকে যে, নন বেলেবল warrant থাকায় ওর পাসপোর্ট impound করা হচ্ছে। তখন ওকে অফিসের কাজে প্রায়ই বিদেশ যেতে হয়। পাসপোর্ট না হলে তো ভিসাও হবে না, ট্যুরে যাওয়ার দফারফাএরপর অফিস সব শুনে, ওকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বলে কারন কোম্পানির স্টেক অন্য কোন খরিদ্দার কোম্পানিকে কে হস্তান্তর করা হচ্ছিল। ২০১৯ শের মিডল থেকে বেকার হয়ে যায়। অথচ মজা হচ্ছে, এতদিনের মধ্যে বিহার পুলিশ ওকে কাস্টডিতে নেয় নি। তার কারন হিসাবে সুবীর যা খবর পেয়েছে, সেটা হচ্ছে, পুলিশ জানে যে সুবীর নির্দোষ .এরপর সুবীর খবর নিয়ে জানতে পারে, পাসপোর্ট রিভোক করতে গেলে বেল নেওয়া জরুরী। তখন পাটনাতে উকিল লাগিয়ে হাইকোর্টে বেল এপ্লিকেশন দেয়। সেখানেও দুটো হিয়ারিং হয় ২০২০ এর জানুয়ারী ফেব্রুয়ারি তে। এই জাজও সব দিক দেখে পুলিসকে বলে কোন কেস গঠন না করতে পারলে  ওকে আমি সামনের ডেটে বেল দেব। পরবর্তী শুনানীর সময় ওর সিরিয়াল নম্বর ছিল ৮। কিন্তু আবার দুর্ভাগ্য। কেস ওঠার ঠিক আগে করোনার চক্করে আবার কোর্ট বন্ধ হয়ে যায়।  এই কয়েকদিন আগে আবার কোর্ট খুলেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এবারে ওর জাজ পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে, এবং নূতন লিস্টে ওর নম্বর ১৮০। আমাকে এই ব্যাপারে ওর পাটনার উকিলের what’s app মেসেজ দ্যাখাল। মানে বেশ কয়েকমাস কেস উঠতেই লাগবে এবং বেল হবে কিনা কে বলতে পারে। সম্পুর্ন নির্দোষ একটা ছেলে শুধুমাত্র পলিটিক্স এবং জুডিশিয়ারীর corruption ঘুরপাক খাচ্ছে। কেরিয়ার বরবাদ, চাকরি নেই, রোজগারপাতি বন্ধ, ভবিষ্যত অনিশ্চিত। বাড়ীতে বৌ এক মেয়ে।


সুবীর এরমধ্যে সরকারী উঁচু লেভেলে পরামর্শ নিয়েছে। অনেকে বলেছে সোশাল মিডিয়া বা কোন চ্যানেলে গিয়ে সব জানাতে। কিন্তু সরকারী আমলারা বলছে, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। বিহার গর্ভনমেন্ট পুলিশ রেগে গিয়ে জেলে পুরে দিতে পারে এবং কেসের ডেট ইচ্ছেমত পিছনে করে দেবে। ততদিন লকআপে বসে থাকবে।

জুডিশিয়ারি করাপশনের আখড়া। বেশ কিছুদিন আগে একটা টিভি চ্যানেল লোয়ার কোর্টে sting operation করেছিল, দেখা যাচ্ছে পরপর ১৭ টা কেসে জাজ টাকা খাচ্ছে, কাউকে বেল দিতে, কাউকে পছন্দমত জেল choose করতে। সর্ষের মধ্যেই ভূত। 

কি করুন আমাদের দেশের অবস্থা। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি বহাল তবিয়তে আছে পুকুর চুরি করে, আর একটা ইনোসেন্ট লোকের চাকরী চলে গেল কিছু না করে, এক পয়সা ঘুষ না না নিয়ে নিজের হার্ড আর্নড মানি থেকে উকিলের পয়সা গুনে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতও অনিশ্চিত।

এর পরের ঘটনা আরো কঠিন লড়াইএর। ২০২০ তে জুন মাসে সুবীরের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এখন ২০২৪। মাঝে দীর্ঘ চার বছর কেটে গিয়েছে। এর মধ্যে সুবীরের সঙ্গে দেখা হয় নি। মাঝে শুনেছিলাম ও কলকাতায় আছে। মাসখানেক আগে সুমিতা ওর বান্ধবীকে (যার ভাই সুবীর) ফোন করেছিল। তখনই পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ জানা গেল। ২০২৩শের ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ সুবীরের কাছে ফোন আসে ওকে পাটনা পুলিশ ডেকেছে। যাবার সময় সুবীর, দিদির কাছে আশংকা প্রকাশ করেছিল -“এবার না কাস্টডিতে নিয়ে নেয়।” সেই আশংকাই সত্যি হল। পাটনা যাওয়ার পরই ওকে পুলিশ লকআপে পুরে দেয়। এদিকে শীতবস্ত্রও নিয়ে যায় নি। আত্মীয় মারফৎ খবর পেয়ে দিদি-জামাইবাবু ও সুবীরের বৌ এর মাথায় হাত। কলকাতা থেকে সবাই তৎক্ষনাৎ পাটনা হাজির হল। জেলের নাকি নিয়ম একজন দেখা করার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে দেখা করা যায় না। অগত্যা আদিম পন্থা নিয়ে ঘুষ দিয়ে দেখা করার অনুমতি পাওয়া গেল। একজনই দেখা করতে পারবে। দিদি একাই গেল শীতবস্ত্র ও কিছু খাবার-দাবার নিয়ে দেখা করতে। সুবীরের তখন খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মুখ চোখ বসে গিয়েছে। দিদিকে বল্ল ভাল কোন ল-ইয়ারকে দিয়ে বেল এপ্লাই করতে। এরপর অবশ্য সুবীর বেল পেয়েছে দুইমাস পর। কিন্তু কেস এখনও চলছে। এই হল ইন্ডিয়ান জুডিশিয়ারির করুণ অবস্থা।


দেবদত্ত ২৫/০৬/২০২০

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments