কান্ডকারখানা (রম্যরচনা)


 কান্ডকারখানা পার্ট

জীবনের পথ চলতে চলতে, কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলোকেআশ্চর্যজনকঅথবাকাকতালীয়আখ্যা দেওয়া যায়। কখনো কখনো চরম ঘটনাগুলোভূতুড়েবললেও অত্যুক্তি হয় না। আর কিছু ঘটনা থাকে মজার। নিজের জীবনের সেইরকম কিছু স্মৃতি নিয়ে, আজকের এই কাহিনী।

ঘটনাটা ৮৫ সালের। চাকরী করছি, থাকি সি আর পার্কে, লোকে বলে বাঙ্গালী কলোনি। অফিসেও আমাদের গ্রুপে বেশীরভাগ বাঙ্গালী। মনই হয় না কলকাতা ছেড়ে আছি। শংকরদা আমাদের গ্রুপেই সি আ্যন্ড আই ডিপার্টমেন্টে। আমার থেকে বছর চারেকের সিনিয়ার। তখন কিছুদিন হল শংকরদা একটা এ্যমব্সাডার গাড়ী কিনেছে। বলাবাহুল্য সেটা সেকেন্ডহ্যান্ড। তখনও মারুতি সেরকম ভাবে বাজারে আসে নি। সবার কাছেই স্কুটার বা বাইক। বাইক বলতে তখন রাজদূত বা ইয়াজদি। যারা শৌখিন বা এডভেন্চারাস তারা কিনত বুলেট। বেশ সমীহ জাগানো চেহারা, গুরুগম্ভীর আওয়াজ। তখন আমায় ফরাক্কা যেতে হত মাঝে মাঝে অফিসের কাজে। আমার ব্যাচের অনেকেই তখন থাকত ফিল্ড হেস্টেলে। সকালে আমি প্রায়ই গেস্ট হাউস থেকে চলে যেতাম বন্ধুদের ডেরায়। অনেকেই আবার আমার ক্লাসমেট। সবারই বাইক। নয়টার সময় সবাই বেরোত প্ল্যান্টের উদ্দেশে। সিড়ির তলায় রাখা সব বাইকগুলো একসঙ্গে স্টার্ট হত, চলতে শুরুর আগে একটু এক্সিলেটার দাবিয়ে রাখত, সম্মিলিত আওয়াজে মনে হত যুদ্ধের ট্যাঙ্ক বেরিয়েছে। আমার ক্লাসমেট শিবু কিনেছিল বুলেট। প্রায়ই এর বাইকে করে যেতাম ফরাক্কা ব্যারেজে। ওই রোগা পাতলা চেহারা নিয়ে ভারী বাইক কি করে চালাত কে জানে। শংকরদার কথায় ফিরে আসি। শংকরদা তখন ড্রাইভিং ইস্কুলে কোর্স করছে, অফিস অব্দি নিয়ে আসার সাহস হয় নি। গাড়ী বা বাইক কিনলে, দিল্লিতে অফিসে মিষ্টি খাওয়ানো একটা কাস্টমের মধ্যে পড়ত। আমরা কয়েকজন বাঙ্গালী কলিগ বাড়ীতে গিয়েও মিস্টিমুখ করে এলাম। গাড়ী কেনার মাসখানেক পরের ঘটনা। অফিসের কাজে  একদিন আমি, শংকরদা, সিধুদা ট্যাক্সি করে বেরিয়েছি। নেহেরুপ্লেস থেকে কোন একটা অফিসে মিটিং হবে। তখন রাস্তায় গাড়ী হাতে গোনা। খালি খালি রাস্তা, কিছু স্কুটার, বাইক, অটো আর কিছু ডি টি সি বাস। আমরা সবাই তখন পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতাম। প্রাইভেট গাড়ী যথাসমান্য। আজকাল রাস্তার মাঝে ডিভাইডার থাকে, উল্টোদিকের গাড়ী যেন ওভারটেক করতে গিয়ে, অন্য লেনের গাড়ীকে না একসিডেন্ট করে। তখন ওইসব ডিভাইডারের বালাই ছিল না। আমাদের ট্যাক্সিটা সবে জি কে টুর রেড লাইট ক্রস করে একটু এগিয়েছে, সিধুদা বল্ল- শংকরদা দেখুন, আপনার গাড়ীর কালারের একটা এমব্যাসাডার আসছে। গাড়ীটা একটু কাছে আসতে শংকরদার আর্তনাদ- আরে, এটা তো আমারই গাড়ী নম্বরটা যে এক, গাড়ী রোকিয়ে ড্রাইভার এরপর শংকরদার হাত পা নেড়ে প্রবল চিৎকার- চোর, চোর, মেরা গাড়ী চুরাকে ভাগ রহা হ্যায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার হতভম্ব হয়ে গাড়ী দাঁড় করাতেই, শংকরদা গাড়ীর দরজা খুলে দৌড়, পিছন পিছন ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত আমরা দুজনেই শংকরদার পিছন পিছন। যে লোকটা গাড়ী নিয়ে পালাচ্ছিল, সে অলরেডী শুনেছে শংকরদার চিৎকার। লোকটা গাড়ীর স্পীড বড়িয়ে পালাবার ধান্দায় ছিল। কিন্তু বিধি বাম। ততক্ষনে রেডলাইট হয়ে গিয়েছে। গাড়ীটা একটা ডিটিসি বাসের পিছনে গিয়ে ব্রেক মারতে বাধ্য হল। আমরা কাছাকাছি আসার আগে, সে ব্যাটা দিয়েছে চম্পট। আমরা কিছুটা দৌড়লাম চোর ধরার বৃথা চেষ্টা করে। ফিরে দেখি শংকরদা গাড়ীর মধ্যে বসে, ইন্জিন তখনো চালু। আমাদের মাথা তখনো ভো ভো করছে এরকম অদ্ভুত এনকাউন্টারে। শংকরদাকে বল্লাম চল কালকাজী পুলিশ থানায় যাই, রিপোর্ট লেখাই। শংকরদা বল্ল- তোদের কি মনে হয় পুলিশ আমাদের কোনকথা বিশ্বাস করবে, পাগল বলে আমাদেরই না লকআপে পুরে দেয়, লোকে তো গাড়ী চুরি হলে কমপ্লেন লেখাতে যায়। গাড়ীতো পেয়েই গিয়েছি। খালি কয়েক লিটার পেট্রোল যা গচ্ছা গেল। ঘটনাটা যখন অফিসে এসে বেশ ফলাও করে বলছি, অনেকে তো বিশ্বাস করতে চাইল না।

আরেকটা ঘটনা, খুব যে মজার তা নয়, আমারই ব্যাচমেট, এন টি পি সি তে, নাম পুলক পালিত, দিল্লিরই ছেলে, সি আর পার্কেই তার বাড়ী। খাস দিল্লির হলে কি হবে, খুবই লাজুক, মেয়ে টেয়ে নিয়ে কথা উঠলে ওর ফরসা দুই কান লাল হয়ে যায়। সে এমনই লাজুক যে একদিন দেখি সি আর পার্ক মার্কেট টুর একটা টেলারিং শপের সামনে চিন্তিত মুখে দাড়িয়ে। হাতে একটা প্যাকেট। আমার সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞাসা করলাম- কি রে, কি ব্যাপার। পুলক বল্ল- আমার বিয়ের পান্জাবী বানাতে দিতে হবে। আমি- কোথায় দিবি? পুলক- এই দোকানটাতেই ভাবছি। বললাম- তা, ভিতরে না ঢুকে বাইরে কেন। বল্ল না রে একটু লজ্জা লাগছে, তুই চল আমার সঙ্গে। এই হচ্ছে পুলক। পুলক তখন নূতন বাইক কিনেছে। সি আর পার্ক থেকে তিন কিমি দূরে নেহেরু প্লেস অফিসে বাইক নিয়েই আসে। ওর বোন কলেজে পড়ে। পুলক মাঝে মাঝে ওকে বাসস্যান্ড অব্দি লিফ্ট দেয়। সেদিনও এরকমই। বাইক স্টার্ট দিয়ে পুলক রেডী, বোন গেট খুলে বেরিয়ে বাইকের পিছনে। পুলক বাইক নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখে বোন তো নেই। পুলক বেশ ঘাবড়ে গেল, কিন্তু বিপদের মুহুর্ত মাথা বোধহয় গুলিয়ে যায়, বাড়ী গিয়ে দেখার পরিবর্তে সে রোজকার মত অফিসে চলে এল। অফিস থেকে বাড়ীতে ফোন করে খবর পাওয়া, বোন বসতে বসতেই পুলক স্টার্ট করে দিয়েছে, বোন রাস্তায় পড়ে গিয়েছে, কেটে ছড়েও গিয়েছে, বেচারী কলেজও যেতে পারে নি। পুলক এমনই হাদু, যে কিছু বুঝতেই পারে নি বোন যে পিছনে বসে নেই, সেটা জানার পরও পুলকের কান্ড দেখে আমরা সব বন্ধুরা অবাক। ওর এরকম একটা আরো মজার কেস ছিল। এটা ট্রেনিং পিরিয়ডের ঘটনা। তখন আমাদের ট্রেনিং হত বদরপুরে, আমরা থাকতাম হোস্টেলে, আর পুলক বাড়ী থেকে রোজ যাতায়ত করত। একদিন দেখি পুলক এসেছে বেশ লেট করে, মুখখানা বেশ ফ্যাকাশে মেরে আছে। সেদিন পুলক আর মুখ খোলে নি। কয়েকদিন পর জানা গেল আসল ঘটনাটা। পুলক আশ্রমের মোড় থেকে বদরপুরে আসার ডিটিসি বাস ধরেছিল। বাসে মোটামুটি ভীড়। পুলক হঠাৎ দেখে একটা পকেটমার একজনের পকেটে হাত ঢোকাবার চেষ্টা করছে অনেকক্ষন ধরে। এরকম কন্ডিশনের কি করা যেতে পারে, পুলক ভেবে পায় না। ঘাম দিতে শুরু করেছে, এরকম একটা ঘটনা চোখের সামনে চলছে। পকেটমারের হাত থেকে লোকটাকে বাঁচানোর প্রবল ইচ্ছে, আবার মনে ভয়, কিছু যদি হয়। ভাবতে ভাবতে পুলক আস্তে করে একবার বলেছে- সাবধান, জেবকাটরা। পকেটমার মহা খলিফা গোছের, সে অনেকক্ষন ধরেই পুলকের দিকে নজর রেখেছিল, বুঝেছে, ব্যাটা ডরপোক আছে। একে তো পোটেনশিয়াল শিকার হাতছাড়া, পকেটমার এক হেড়ে গলায় চিৎকার করেছে- কেয়া বোলারে তু, গালি দে রহা হ্যায় কিস লিয়ে। পুলক তো ওর অগ্নিমূর্তি দেখে ভয়ের চোটে নেক্সট বাসস্টপে নেমেছে। পকেটমারও ওর পিছু পিছু নেমেছে। এবারে ক্ল্যইম্যাক্স। পুলক দৌড়চ্ছে, পিছনে পকেটমার চোর চোর বলে তাড়া করেছে। পুলক দৌড়চ্ছিল প্রাণের ভয়ে, তাই সে যাত্রায় পুলক পার পেয়ে গেল।

ক্রমশঃ


কান্ডকারখানা পার্ট

এর পরের ঘটনাটা বেশী পুরানো নয়। আমার তখন সদ্য পোস্টিং এর অর্ডার এসেছে। ২০১৭ জানুয়ারীর ঘটনা। আমাকে যেতে হবে উত্তরাখন্ডের যোশীমঠে। প্রথম যাচ্ছি। সঙ্গে মালপত্র অনেক। নয়ডা থেকে পাঁচশ কিমি। যেতে হবে হরিদ্বার হয়ে, ৩০০ কিমি পাহাড়ী রাস্তা। সঙ্গে সুমিতাকে নিয়ে যাব। লাজপতনগরে তখন সেলের মরশুম। বেশ করে উইন্টার গার্মেন্টস কেনা হল। মেয়েদের লং কোট নাকি সরোজিনী নগর মার্কেটে সস্তা। তাই সেখানেও গেলাম। কিচেনার জন্য ইন্ডাকশন হিটার। এই বস্তু আগে কোনদিন ইউজ করি নি। এতে রান্না করার জন্য নাকি বাসনপত্রও আলাদা। সে সবও বিগ বাজার থেকে কেনা হল। রওয়ানা হওয়ার আর দুদিন বাকি। আমাদের বাড়ীর কাছেই জে পির ইন্জিনিয়ারিং কলেজ। তার পাশেই এক্সপো সেন্টার। শীতকালে প্রায়ই মেলা লাগে। তখন একটা মেলা চলছিল। যোশীমঠ যাওয়ার আগে ভাবলাম হলে একটা সিনেমা দেখে যাই। ওখানে গেলে তো আর বড় স্ক্রিনে সিনেমা দেখা যাবে না। ঠিক হল এক্সিবিশন হয়ে শিপ্রা মলে যাব সিনেমা দেখতে। দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছি, গাড়ী রাস্তায় পার্ক করে ঢুকেছি এক্সিবিশন হলে। বেশ কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে রাস্তায় এসে চক্ষু চড়কগাছ। গাড়ী তো নেই। রাস্তার একটু আগে পিছে দেখলাম চোখ বুলিয়ে। না নেই। দুদিন পরে বেরোনো। গাড়ী না থাকলে যাবই বা কি করে, জয়েনিংই বা কি করে হবে। মাথায় হাত। শেষকালে এটা ঘটল আমার কপালে। কাগজে পড়ে থাকি গাড়ী চুরির ঘটনা, দু একজন বন্ধুর ভাগ্যে এরকম দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। একটু দূরে দু একটা অটোওয়ালা দাড়িয়ে ছিল। তাদের জিজ্ঞাসা করেও কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। সবাই বল্ল পুলিসকে খবর দিন। মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী, চিরকাল পুলিসকে সযত্নে এড়িয়ে এসেছি। তাদেরই পাল্লায় পড়তে হবে। কয়েকদিন আগে টিভিতে স্টিং অপারেশন দেখেছিলাম ইউ পির পুলিশের উপর। রিপোর্টার  এক মফস্বলের থানায় গিয়ে, সাবইনসপেক্টরকে বলছে যে তার কোন এক দুশমনকে ধরাধাম থেকে সরিয়ে দিতে হবে। মানে কন্ট্রাক্ট কিলিং আর কি। পুলিশ মশাই থানার সামনে চেয়ারে বসে দুই পা খাটিয়াতে তুলে, নস্যি নিতে নিতে বলছে- কোই বাত নেহী, সমঝো হো জায়গা। মনটা বেশ উৎকন্ঠিত, না জানি এবার কি হয়। কাছাকাছি একটা পুলিশ চৌকি আছে। হাইওয়েতে ওঠার মুখটাতে। গাড়ী নিয়ে দিল্লি গেলে ওটার পাশ দিয়েই যেতে হয়। তবে সেটা পায়ে হেটে যাওয়া যাবে না। ওখান থেকেই একটা অটো নিলাম। এবারে আসল টেনশন। গাড়ীর নম্বর তো ভুলে মেরে দিয়েছি। এব্যাপারে সুমিতা আমার যোগ্যসহধর্মিনী। কিন্তু রিপোর্ট লেখাতে গেলে যে নম্বর লাগবে। স্মৃতির অলিগলিতে হাতড়ে অতি কষ্টে ডিজিট গুলো বিদ্যুতচমকের মত মনে পড়ল-৭৯৯৩। কিন্তু তাতে যে হবে না। আগেরটাওতো চাই। সুমিতা বুদ্ধি দিল- সূর্য মানে ছেলেকে ফোন কর। সে তখন বাইরে। ওকেই ফোন লাগালাম হোয়াটস্ আ্যপে। সেও বাপ কা ব্যাটা প্রমান হল। বল্ল- আমার খালি মনে আছে ইউ পি ১৬ এ। ডিজিটগুলো মনে নেই। ব্যাস কেল্লাফতে। জোড়াতালি দিয়ে হলেও পুরো নম্বর যোগাড় করা গেছে। ততক্ষনে অটো পৌঁছেছে পুলিশ চৌকিতে। বল্লাম- সাব, গাড়ী চোরি হো গিয়া, অভি পনদরা মিনিটই হুয়া। জলদি কমপ্লেন লিখানা হ্যায়। সে সব শুনে টুনে বল্ল- আপ না ১০০ নম্বর ডায়াল করিয়ে, আজকাল ইউ পি মে সব ১০০ ডায়াল লক্ষৌমে যাতা হ্যায়, ওলোগ মোবাইল পিসিআর কো ফোন কর দেঙ্গে। আপকো জলদি রেসপন্স মিলেগা। আপকা পাস তো কোই গাড়ী ভি না হ্যায় কি আপ অভি সেক্টর ৫৮ পোলিস স্টিশন যাও গে। ঠিক কথা। ১০০ ডায়াল করে বল্লাম, সব ডিটেল নিল, মোবাইল নং সহ। দু মিনিটের মধ্যে পিসিআর ভ্যানের কল এল আমার লোকেশন জানতে চেয়ে এবং একটু পরেই সাইরেন বাজাতে বাজতেইউপি পুলিশ- সদা আপকি সেবামেলেখা ইনোভা পিসিআর ভ্যান হাজির। পুলিশের গাড়িতেই আমরা দুজন উঠে বসলাম, স্পটে যেতে হব। গাড়ীতে যেতে যেতে বল্লাম, সাব, হাম তো পরশু গাড়ী লেকে নয়ডা কা বাহার যানা হ্যায়, বহুত মুস্কিল হো যায়গা, আদর গাড়ী না মিলেতো। এদিকে আবার সুমিতাকে বল্লাম- সিনেমার টিকিটটার কি হবে? বুক মাই শো দিয়ে কাটা। শো শুরু হতে তো আর দশমিনিট বাকি। বেশ মনের আনন্দে বাড়ী থেকে বেরিয়েছিলাম। কি ফ্যাসাদেই না পড়া গেল। ঘটনাস্থলের কাছে এসে পিসিআর ভ্যান থামল। গাড়ী থেকে নেমে পুলিশদের প্রশ্ন- কাহা থা আপকা গাড়ী। ভুল দেখছি নাতো। চোখটাকে দুবার কচলে নিলান। গাড়ী তো যথাস্থানে দাড়িয়ে আছে। মুখ কাঁচুমাচু করে জানলাম- সাব ইয়েই হ্যায় হামারা গাড়ী। পুলিশসাহেব একটু কটমট করে তাকিয়ে বল্ল- মতলব, আপ তো বোল রহে থে গাড়ী চোরি হো গিয়া। কি করি বল্লাম- হুয়া তো থা, লেকিন লাগতা হ্যায় কি চোর কো অনুশোচনা হুয়া হ্যায়, আপনা গলতি শুধারনেকে লিয়ে ওয়াপস রাখ দিয়া। কি আর বলে পুলিশ- চলিয়ে আচ্ছা হুয়া আপকো গাড়ী মিল গিয়া  চেক করকে দেখিয়েসব ঠিক হ্যায় কেয়া নেহি। যাক বাবা তাড়াতাড়ি করে করজোড়ে নমস্কার করে- শুক্রিয়া আপকি মদত কে লিয়ে, বলে গাড়ীতে চড়ে বসলাম। পুলিশ বল্ল ১০০ মে ডায়াল করকে বাতা দিজিয়ে, আপকা কমপ্লেন অলরেডী রেজিস্টার হ্যায়। মনে ডবল খুশী গাড়ীও পাওয়া গেল, অবশ্য আদৌ চুরি হয়েছিল কিনা জানা নেই, সিনেমাটাও মিস হবে না, আর যোশীমঠের সিডিউলও ইনট্যাক্ট রইল। সেই গাড়ী, টাটা মানজা ডিজেল,এখনো বহাল তবিয়তে চালাচ্ছি। এখনও মাঝে মাঝে ভাবি, সেদিন সত্যি কি ঘটেছিল?


এই ঘটনাটা ৯২ সালের শেষের দিকের। ছেলের তখন বছর খানেক বয়স হবে। আমরা তখন থাকি সাউথ দিল্লির অলকানন্দা এরিয়াতে, গঙ্গোত্রী এনক্লেভের ডিডিএ ফ্ল্যাটে। ছেলের ডাক নাম সূর্য। নামের সঙ্গে স্বভাবের এরকম মিল কমই দেখা যায়, মধ্যাহ্ন গগনের সূর্য বলা যায়। প্রচন্ড ছটফটে, কথা কম কাজ বেশী। তখন বাচ্চাদের খেলনা জিআইজো খুব চলত। নানারকম সৈনিকের বেশধারী অস্ত্রহাতে পুতুল। সেগুলো কেনার কিছুদিনের মধ্যেই হাত, পা, মুন্ডু আলাদা। তখন অবশ্য অনেকটা বড়। টু, থ্রি হবে। আমরা বলতাম সবগুলো কার্গিল ফেরত সৈন্য। গঙ্গোত্রী কমপ্লেক্সের গেট দিয়ে বেরোলেই বড় রাস্তা, তার পরেই অলকানন্দা শপিং কমপ্লেক্স।  তখন সবে হাটতে শিখেছে। কোলে নিয়ে আমি একটা দোকানে ঢুকেছি কিছু কিনতে। তার একটু আগে এক ফেরীওয়ালার কাছ থেকে একটা ছোট্ট হুইসিল কিনে দিয়েছি। সে ওটা নিয়ে মশগুল। কোল থেকে নামিয়ে দোকানদারের সঙ্গে কথা হচ্ছে। চোখের নিমিষে সে হাওয়া। দোকানের বাইরে থেকে ধরেবেধে কোলে তুলেছি। চীলচিৎকার আর সঙ্গে হেচকি। কথা বলতে তখনো শেখে নি। বুঝতে পারছি না হলটা কি। কান্না আর থামে না। হঠাৎ চোখ গেল হুইসলটাতো নেই। গেল কোথায়? দোকানের ভিতর বাইরে সব খুঁজে ফেললাম। না, কোথাও তো পড়ে নেই। মুখ দেখে লাগছে, বেশ কষ্ট হচ্ছে। কান্নাও থামে না। মনে হল নিশ্চয়ই হুইসিলটা গিলে ফেলেছে, অথবা গলায় আটকে আছে। দ্বিতীয়টার প্রববলিটি বেশী। প্রথমে সূর্যর, মাথা নীচে দুই পা উপরে করে ঝাকালাম যদি পাজী হুইসিল বেরোয়। লাভ বিশেষ হল না।  আশে পাশে যারা ছিল, তারা বুদ্ধি দিল- কেলা খিলা দিজিয়ে, হুইসিল বার করার বদলে ঢুকিয়ে দাও। রিভার্স প্রসেস। গেলাম কলাওয়ালার কাছে। একটা কলা কিনে ঠেসে দিলাম মুখে। সূর্য এমনিতেই খাওয়ার ব্যাপারে নটোরিয়াস ছিল। খাবারশুদ্ধু চামচ মুখের কাছে নিয়ে গেলে, যদি এটেনশন অন্যদিকে থাকে, তবে খাবার যথাস্থানে পৌছয়, যদি বোঝে খাওয়ান হচ্ছে, তবে শেষ মুহুর্ত মুখটা কায়দা করে ঘুরিয়ে নেয়, ফলস্বরূপ খাবার জামায়। কোনসময় আবার মুখ থেকেই থু থু করে ফেলে দেয়। আমাদে তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন রিটায়ার্ড কর্নেল সহায়। তার তিন ছেলে মেয়ে তখন কলেজে পড়ে। তার ওয়াইফ, একদিন দেখেশুনে বল্লেন- সুমিতা, আজ হাম উসকো খিলায়েঙ্গে। ম্যায়নে তিন তিন বাচ্চে পালে হ্যায়, হামারে হাত সে জরুর খায়গা। সেইমত সূর্যকে খাবার বাটিসুদ্ধ একদিন দিয়ে আসা হল। উনিও বেশ গাছকোমর বেধে যুদ্ধে নামলেন বেশকিছুক্ষন পরে গিয়ে দেখা গেল, ভাবীজি রণেভঙ্গ দিয়েছেন। টেবিলের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাবার, মায় জামাতেও, সূর্য আপনমনে খেলছে। ভাবিজী হার স্বীকার করে বল্লেন, ‘বাপ রে বাপ, মেরা বস কা বাহার তো স্বাভাবিক ভাবেই, কলা থু থু করে ফেলে দিল। কান্নাও থামছে না। কি করি। হেড অফিসের পরামর্শ দরকার। বাড়ী ফিরে গেলাম। সুমিতা বল্ল- ‘আগে ডাক্তারকে ফোন কর সি আর পার্কের ডাক্তার ধর তখন আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক। তখন আমাদের চেনাশোনা বন্ধুমহল, কলিগ সবাই ওরকাছেই যেতাম। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলোর মতন নিজে প্রেসক্রাইব করার বদলে, আমরা যে উষুধ বলতাম সেটাই লেখাই বেশী পছন্দ করতেন। ফরসা ছোট্ট মুখ, ততোধিক ছোট চশমা, ফুঁক ফুঁক করে সিগারেট খেতেন, বেশ মিশুকে আর হিউমারাসও ছিলেন।  একবারের কথা বলি। তখন বাজারে সবে ইসিজি চালু হয়েছে। আমার এক কলিগ, ইসিজি রিপোর্ট নিয়ে ইনার কাছে গিয়েছে। ডাক্তার ধর কিছুক্ষন রিপোর্টাটা দেখে সরিয়ে রেখে ধীরেসুস্থে প্রশ্ন- আপনি ইন্জিনিয়ার তো। বন্ধুর সম্মতি শুনে পরের বাক্যবাণ - কম্পিউটার বোঝেন? বন্ধু কি আর বলে- দেখুন ডাক্তারবাবু, আমি যখন পাশ করেছি তখনও কোর্সে কম্পিউটার ঢোকে নি, কি করে জানব বলুন। এবারে ধরবাবুর মৃদু হেসে উত্তর- আমারও একই ব্যাপার। আমার সময় কোর্সে ইসিজি ছিল না। এরকম অকাট্য যুক্তির পর আর কোন কথা কি চলে? যাই হোক পাশের বাড়ী থেকে ডাক্তার ধরকে ফোন করলাম। সব শুনে বল্লেন- সর্বনাশ, এক বছরের বাচ্চা, এখুনি এক্সরে করে রিপোর্ট নিয়ে আসুন। কাছাকাছি একটা পলিক্লিনিকে এক্সরে হয়। ভাগ্যভাল, তখনো সেটা খোলা ছিল। সেখানে এক পেডিট্রিশিয়ানও আছেন। তখন প্রায় বন্ধ হওয়ার সময়। বল্লাম- এক্ষুনি আসছি, একটু ওয়েট করুন। তাড়াহুড়ো করে দুজনেই বেরোলাম। গাড়ী ছিল, তাই চট করে পৌছে গেলাম। টেকনিশিয়ান আমাদের জন্যই ওয়েট করছিল। বল্ল- সোয়াটার আর শার্ট খুলুন। সবে উপরের সোয়েটারটা খুলেছি, টুক করে একটা আওয়াজ, হুইসিলটা সেয়েটারের ভিতর থেকে খসে মাটিতে পড়েছে। সূর্য দেখি তড়াক করে একলাফে মাটিতে নেমে, হারানিধি খুঁজে পেয়ে, মুখে দিয়ে বাজাচ্ছে। বোঝা গেল ওর এত কান্না ছিল হুইসিলটা হারিয়ে যাওয়াতে। আমরা দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূড়। প্রভূত সরি টরি বলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বাঁচালাম। 

দেবদত্ত ২৮/০৫/২০২০

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments