ধূসর অতীত (কিরণবালা)
ধূসর অতীত
পর্ব ৬
কিরণবালার কথা
কিরণবালা (আমার ঠাকুমা)কিরণবালার বাপের বাড়ী নবীনগরে। সেই সতের বছর বয়েসে বিয়ে হয়ে আঠারবাড়ীতে তার প্রথম পদার্পণ। দেখতে দেখতে আঠারোটা বছর পেরিয়ে গেল এই আঠারোবাড়ীতে। এখন তিনি রীতিমতো গিন্নীবান্নী মানুষ। একান্নবর্তী পরিবারের সর্বময়ী কর্ত্রী। বড় মা আছেন। তবে সংসারের দৈনন্দিন খুটিনাটি তাকেই নজর রাখতে হয়। এর মধ্যে সর্বসাকুল্যে বার চার পাঁচ গিয়েছেন নবীনগরে। ছোটখাট চেহারা হলে কি হবে। তিনি পিপীলিকার মত পরিশ্রমী। সকালে উঠে প্রাতকৃত্য করার পর থেকে কাজের শুরু, সেটা শেষ হয় গিয়ে রাতে শোয়ার আগে।
বিয়ের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ী আসার কথা ভাবলে এখনও কিরণের রোমাঞ্চ জাগে। এত লম্বা সফর কোনদিন করেন নি। বুকে ভয়ও আছে। শুনেছেন তার স্বামীর উপর অনেক দায়িত্ব। ভাইয়েরা সবাই অনেক ছোট। শাশুড়ী মা তার থেকে বেশী বড় নন। কিরণবালার পরিবারের বাস, কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাবডিভশনের নবীনগর শহরের সাতমোড়া গ্রামে। পাল পরিবার বর্ধিষ্ণু এবং তাদের পরিবারের এলাকাতে বেশ প্রতিপত্তি সম্পন্ন। বাবা কাজ করেন নবীনগরের মুন্সেফ কোর্টে, তিনি সরকারী প্লিডার, তার ভাই ঐ অঞ্চলের বিশাল ডাক্তার। কলিকাতা মেডিক্যল কলেজ থেকে পাশ করা। যখন তিনি সরকারী হসপিটালের চাকরী থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় আসেন, সেদিনগুলিতে, সকাল থেকে বাড়ীর সামনে গরুরগাড়ীর লাইন।দূর দূর থেকে রোগী নিয়ে পরিবারের লোকজন হাজির হয়।
কিরণ ছোটবেলাতে গ্রামের পাঠশালাতে পড়েছেন। তার বাংলা হাতের লেখা যেন মুক্তো ঝরে। মা মাসীরা চিঠি লিখতে চাইলে, তারা সবাই কিরণকেই ধরেন। উপহারের বইতে প্রথম পাতায় সাধারনত আশীর্বাদ সহকারে নিমনত্রিতের নাম লিখে দেওয়াটাই রেওয়াজ। সেই লেখার জন্যও প্রায়শই কিরণের ডাক পড়ে। প্রাইমারী স্কুল পাশ দেওয়ার পরে, একদিন ঘরে বসেই একটা ইংরাজী বইয়ের পাতা উল্টে ছবি দেখছিলেন। সেদিন বড়দিনের ছুটি। কাকামনি আজকে বাড়ীর সবাইয়ের সঙ্গে গল্প করছেন। তার হঠাৎ চোখ পড়ল কিরণের দিকে। জিজ্ঞাসা করলেন কিরে বইটা পড়তে পারছিস? এটা শেক্সপীয়ারের ম্যাকবেথ। কিরণ গ্রামের ইস্কুলে অল্প ইংরাজী পড়েছে। কিন্তু এই বই পড়ার ক্ষমতা তার নাই। সে বইটা উল্টেপাল্টে ছবি দেখছিল। পাল পরিবারে সবাই উচ্চশিক্ষিত। কিরণের দাদাও শান্তিনিকেতনে থেকে পড়েন। বাবারও ইচ্ছে মেয়ে ঘরের কাজের সঙ্গে সঙ্গে যাতে উচ্চশিক্ষা পায়। এরপর বাবা আর কাকামনি যুক্তি করে ঠিক করলেন কিরণকে কাকামনি নিয়ে যাবেন নিজ কর্মস্থলে। কাকার সরকারী হসপিটালের পোস্টিং সিরাজগন্জে। সিরাজগন্জে সরকারী হাসপাতালের কাছেই মেয়েদের মিশনারি স্কুল আছে। ডাক্তার হওয়ার সুবাদে, সেখানের নানেরা কাকামনির পরিচিত। মিশনারী স্কুলে পড়লে মেয়ে পড়াশুনার সঙ্গে আদবকায়দাও শিখবে। সেই প্রথম কিরণের লম্বা সফর।ঢাকা হয়ে ট্রেনে টাঙ্গাইল। তারপরেই বিশাল যমুনা নদী। এটাই ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা। অন্য শাখাটি গিয়েছে পূর্বদিক দিয়ে মায়মনসিংহ শহরের কাছ দিয়ে। পূর্বপারের ঘাটটির নাম গোবিন্দাসী ঘাট। আর পশ্চিমপারে সিরাজগঞ্জ । অতবড় নদী কিরণ এর আগে দেখেন নি। দিনকয়েক পরে পূর্ব কথামত কাজ হল। কাকার সঙ্গে গিয়ে মিশনারি স্কুলে ভর্তি হলেন। ইংরাজী শিক্ষার সাথে সাথে সূচীশিল্পেও পারদর্শী হয়ে উঠলেন। আদবকায়দা বা ম্যানার্সও যেমন টেবিল সাজানো, কাটা চামচে খাওয়া, ঘরকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা ইত্যাদির প্রথম পাঠ ওখানেই।
কিরণ এমনিতেও ধীর স্থির। । বিয়ের আগে কিরণ, যতীনবাবুকে দেখেননি। খালি তার শ্বশুরমশাই আশীর্বাদের দিন এসেছিলেন।তবে তিনি লুকিয়ে একবার বাবা মায়ের কথোপকথনে শুনেছিলেন তার হবু স্বামী নাকি সুপুরুষ ও টকটকে গৌরবর্ণ। কিরণ নিজে বেশী লম্বা নন, তবে তার কোমরছাপা চুল, মুখখানিও ফুটফুটে। কনে সাজতে সাজতে সবে মুখবর্ণ চন্দনচর্চিত হচ্ছে, তেমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলেন উলুদ্ধনি ও শঙ্খের আওয়াজ। কোলাহল শোনা গেল ‘বর এসেছে, বর এসেছে’। একটু পরে সম্পর্কিত এক বোন এসে কানে কানে বলে গেল-‘জামাইবাবু তো রাজপুত্ররে, তোর কি ভাগ্যি’।
বিবাহবাসরের পরেরদিন, সকাল সকাল বরযাত্রী ও বিবাহে প্রাপ্ত তৈজসপত্র, এক ট্রাঙ্কভর্তি শাড়ী, গহনা সহ কিরণের যাত্রা শুরু হল, নবীনগর শহরে তিতাসনদীর গোকর্ণ ঘাট থেকে। বিবাহে পণপ্রথা চালু থাকলেও, যতীনবাবু এর ঘোরবিরোধী। রজনী মোহন বুঝিয়েছেন, স্ত্রীধনে না করতে নেই, কারণ সেটা মেয়ের বাবা মা দিচ্ছেন মেয়েকে। অতএব পাত্রপক্ষর তাতে না করা মানায় না। পালতোলা বড় নৌকা। নাও এর পুরোটা জুড়ে ছই।জৈষ্ঠমাসের সকাল। এসময় নদী শীর্ণকায়া। কোথাও কোথাও চক দেখা যাচ্ছে। ২০০ কিলোমিটার লম্বা নদী, ত্রিপুরার কাছে মেঘনা থেকে বেরিয়ে ব্রাহ্মণবেড়িয়াকে বেষ্টন করে আবার মিশেছে মেঘনাতে।
বর্ষায় এই নদী হয়ে ওঠে দুরন্ত ভরা যৌবনা। পাল খাটানো হয় নি। এখন হাওয়া উল্টোপথে । দুই মাল্লার একজন হাল বাইছে আর একজন গুন টেনে পাড়ের কাছ দিয়ে চলেছে।নৌকার গমনপথও পাড়ের কাছ দিয়ে। নদীর তীরে গ্রাম, বেশীরভাগ জেলেদের, কোনটা মালোপাড়া কোনটা কৈবর্তপাড়া, মুসলমান জেলেও অনেক আছে। দশটা বাজে। পুরুষেরা বেশীরভাগই বেরিয়েছে মাছ ধরতে। কার্তিক থেকে আষাঢ়ের শুরু অব্দি মাছ ধরার সিজন। বেশীরভাগ জেলেই গরীব। জাল, নৌকা সবই ভাড়া নিতে হয় মহাজনের কাছ থেকে। মাঝ নদীতে দেখা যায় জেলেদের অনেক ডিঙি নৌকা। জেলে বাড়ীর কয়েকজন বৌ ঝি কে দেখা যায় দাওয়ায় বসে জাল বুনছে।
ঘাটে বাঁধা নৌকা, মাটিতে ছড়ানো জাল, উঠানের কোণে গাবের মটকি, ঘরে ঘরে চরকি, টেকো, তক্লি- সুতা কাটার, জাল বোনার সরঞ্জাম। এই সব নিয়াই মালোদের সংসার।গ্রীষ্মকাল, তাই ঘরের দৈনন্দিন কর্ম সকাল সকাল শেষ। উঠানের আশেপাশে হাঁস মুরগী খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে।
কিরণের বাসার কাছে কুমোরপাড়া আছে। তিতাসের পাড়ের মাটি খুবই উপযুক্ত কুমোরের কাজে। ছোটবেলায় কালীপূজোর আগে বাবার হাত ধরে প্রদীপ কিনতে গিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন, দেখতেন কি ভাবে কুমোরের চাক ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে, নিপুন হাতের আঙুলের পেলব স্পর্শে কি ভাবে তৈরী হচ্ছে মাটির সরা, মালসা, খুরি ইত্যাদি।
এখানে বেশীর ভাগ কুমোরের উপাধি পাল, হিন্দু জেলেদেরও উপাধি হালদার। হাল ধরে নৌকা বায়, তাই থেকেই সম্ভবত এরকম উপাধি।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ৭
তিতাস নদীটা হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাণভোমরা। নদীকূলের মানুষগুলির জীবনযাত্রা তিতাসের বহমানতার সঙ্গে সতত সাযুজ্য রেখে চলে। মানুষগুলি সহজ সরল।দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে ফাঁক পেলে তাদের আড্ডা বসে গ্রামের চন্ডীমন্ডপের বাঁধানো চাতালে, মাঝে মাঝে বসে, কীর্তনীয়া নয়ত বাউল গানের আসর। শরৎকালে চাষের কাজও থাকে কম। নদীতে মাছ ধরার মরশুমও ফাল্গুন-চৈত্র থেকে শুরু হয়ে আষাঢ়ের আগে অব্দি চলে। বর্ষার শেষলগ্ন অথবা শরৎ কালে, একটা বড় উৎসব বাইচ প্রতিযোগিতা। বছর কয়েক আগে কিরণ, বাবা-মা আর দুই দাদার সঙ্গে গিয়েছিলেন নবীনগরে সেই অনুষ্ঠান দেখতে। কারণও একটা ছিল, তাদের গ্রামের দলও বাইচ প্রতিযোগিতাতে অংশ নেবে। বাইচের নৌকাটা সারা বছর তাদের বাসার ঠিক বাইরে বেড়ার পাশে সারা বছর উল্টো করে রাখা থাকে।
তাদের সাতমোড়া গ্রাম থেকে নবীনগর ১০ মাইল। মাসীর বাসা নবীনগরে। সেখানেই ওঠা হল। পূজার কাপড়জামাও কেনা হবে। সেদিনটা বিশ্বকর্মা পূজা। সকাল দশটা থেকে তিতাসের শাখা নদীর পাশে বগডহর নৌকা ঘাটে হবে বাইচ দৌড়। শামিয়ানা খাটিয়ে গন্যমান্যদের বসার ব্যবস্থা। উপজেলার কর্মকর্তা, ইউনিয়ান বোর্ডের প্রেসিডেন্ট সবাই উপস্থিত। কিরণের বাবা কোর্টের সরকারী অফিসার। তাই তিনি পরিবার সুদ্ধ শামিয়ানার ভিতর বেঞ্চে। পাশেই বাইচ উপলক্ষ্যে বসেছে মেলা। কিরণ গেল মায়ের হাত ধরে মেলা দেখতে। মা কিনলেন একটা লক্ষীর ঝাপি আর দুটো তালপাতার পাখা। মেলা ঘুরে আসতে আসতে শুরু বাইচ প্রতিযোগিতা। গোটা দশেক দল। সব দলই কুমিল্লা অঞ্চলের। পঞ্চাশ-ষাট হাত এই লম্বা নৌকাগুলির স্থানীয় নাম সোরেঙ্গী নৌকা। প্রায় পঞ্চাশ জন লোক দাড় টানতে পারে। একজন অভিজ্ঞ মাঝি ধরে থাকে হাল।
বাইচ প্রতিযোগিতা চলছে তিতাস নদীতেঅর্কেষ্ট্রাতে যেমন একজন লিডার হাত নেড়ে সবাইকে তাল দেন, তেমনি এখানে প্রতি নৌকায় একজন, দাঁড় টানার ছন্দ পরিচালনা করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে দৌড়ের নৌকা নানারকম গান দিয়ে শুরু হয়। বাইচ প্রতিযোগিতার সাথে গান ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। গানগুলি সাধারনত সারি গান নামে পরিচিত। যিনি নৌকায় বসে গান করেন তাকে সারাইদার বলে।সারিবদ্ধ ভাবে কাজের সঙ্গে সঙ্গে, কিছুটা একঘেয়েমি কাটাতে বাংলার এই লোকসঙ্গীত আবহমান কাল ধরে সাধারন শ্রমিক জীবনের এক প্রতীক। জেলেরা কয়েকজন মিলে জাল টানছে বা নৌকাচালকরা যখন ছন্দ মিলিয়ে দাঁড় বাইছে অথবা যে শ্রমিকরা ছাদ পেটানোর কাজ করছে, তারা কাজের মধ্যে এই গান গায়।এতে একঘেয়েমিও কাটে আর কাজে গতিও আসে। কিরণের সাতমোড়ার দল গাইছিল....
‘নিশিতে যাইও ফুল বনেরে ভ্রমরা।।
জ্বালাইয়া জ্ঞানের বাত্তি ফুল ফুটাইও নানান জাতি
আরে কত রঙ ধরে ফুলের কলিরে।…’
বাইচের নৌকার গান পুরোপুরি নদী কেন্দ্রিক সুরশাসিত। অঞ্চলভেদে সুর ভিন্নতা ঘটলেও এর মাঝেই ব্যপ্ত আছে ভাটিয়ালির সুর। এই অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের সকল ধারাতেই নদীর সুর প্রভাবিত।
গরমকাল হলেও, নদীপথে জলেভেজা হাল্কা হাওয়া বইছে, ফলে মাঠে ঘাটে যা গরম ততটা নৌকাতে নয়। ঘন্টাখানেক পরে নৌকা এসে পড়ল মেঘনা নদীতে। এখন নদী অনেক চওড়া, নদীর একূল থেকে ওকূল দেখা যায় না।নৌকা চলেছে নদীর উজানে। দক্ষিনের বাতাস বইছে। নাও এখন মাঝনদীতে। পাল খাটানো হয়েছে। তরতর করে এগিয়ে চলেছে নৌকা।
পাল তোলা নৌকা চলেছে তিতাস নদী বেয়েআশেপাশে পালতোলা বড় বড় মহাজনী নৌকাও চলেছে। সাদা পালতোলা নৌকাগুলি, বাতাসের টানে উল্টোদিকে ফুলে উঠেছে। যতীনবাবু সারি সারি নৌকার গমন দেখছিলেন। মেঘনার মত বড় নদী তার বিশেষ দেখা নাই। ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যেতে গেলে এরকম বড় নদী ব্রহ্মপুত্র দেখা যায়। সব মহাজনী নৌকারই গন্তব্য ভৈরব বন্দর। দলে দলে গাঙচিলেরা নৌকার কিনারায় বসে আছে, নদীতে খাবারের আশায়। হঠাৎ করে এক একটা আকাশে উড়ে যাচ্ছে, বসে যখন থাকে তাদের পিঠটা ধূসরবর্ণের, উড়লে পরে দেখা যায় সাদা পাখা, পাখার প্রান্তগুলি কালো। হাঁসের মত এরা জলে সাঁতারের কাটতে পারে। জোড়ের কাপড় বাঁধা, যতীনবাবু আর কিরণ পাশাপাশি। যতীনবাবু সদ্যপরিণীতা বধূর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, গরমের জন্য তার নাকের পাটায় দুটো স্বেদবিন্দু।পকেট থেকে রুমাল বার করে কিরণের মুখটা মুছিয়ে দিলেন। মাত্র একদিনও হয়নি, দুজনে একসঙ্গে আছেন, যতীনবাবুর মনে হল, কিরণ যেন তার জন্মজন্মান্তরের সাথী। দুটো পানকৌড়ি বসেছিল পাড়ের ধারে। যতীনবাবু কিরণকে দেখিয়ে বল্লেন ‘দেখ কেমন চুপটি করে বসে আছে মাছ ধরার আশায়’। একটু পরে দুজনের কথা শুরু হল। কিরণের মনে হল মানুষটাকে যতটা রাশভারী ভাবছিলেন, সেরকম তো লাগছে না। কথায় কথায় হেসে ওঠেন, একবার তো কিরণকে বল্লেন- তোমার নামটাতে একটু ভুল আছে, ব এর জায়গাতে ম হত। বিস্মিত কিরণ তাকলে যতীনবাবু হাসিমুখে বল্লেন-‘তোমারা দুই ভাই - একবোন, রূপকথায় পড় নি, অরুণ, বরুন, কিরনমালা তিন ভাই বোন। তাই তোমার নাম কিরণবালা না হয়ে কিরণমালা হওয়া উচিত ছিল। কিরণ এরকম সুরসিক কথা শুনে মনে মনে ভাবলেন, এই জীবনসঙ্গী নিশ্চয়ই সারাজীবন দায়িত্বের সঙ্গে মাধুরী মিশিয়ে তাকে সুখী রাখতে পারবেন। দুপুর নাগাদ ভৈরব বাজারের ঘাটে এসে নৌকা লাগল। আশেপাশে ঘাটের লোকজনের কৌতুহলী চোখ, নূতন বর বৌকে দেখছে। কিরণ ঘোমটাটাকে আরো নামিয়ে নিলেন। এরপর ভৈরব বাজার থেকে ট্রেন ধরে সন্ধ্যে নাগাদ আঠারবাড়ী পৌঁছল বরযাত্রী দল ও নবদম্পতি। জমিদার বাড়ীর ফিটন গাড়ী এসেছে স্টেশনে কিরণ ও যতীনবাবুকে নিয়ে যেতে।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ৮
আজকাল কিরণ ব্যস্তসমস্ত গৃহিনী। কাল মহালয়া। দেবীপক্ষের শুরু। দুপুরের খাওয়ার পাট চুকেছে। পানের খিলি একটা মুখে দিয়ে ঘরে ঢুকলেন। পূজোর জামাকাপড় বানাবার জন্য, থানকাপড় কিনে এনেছিলেন কর্তার মেজ-ভাই বীরেন্দ্র নারায়ণ মানে মনি, বাকী ছোটদের কাছে গোরাকাকা। গোরাকে মাঝেমধ্যেই যেতে হয় ময়মনসিংহ শহরে। তিনি লাইসেন্স্ড স্ট্যম্পপেপার ভেন্ডার। কাছারীর কাজকর্মে যত স্টাম্পপেপার লাগে সবই তার দোকান থেকে যায়।
স্কুলের খাতা বই, স্লেট পেনসিলও তিনি দোকানে রাখেন। রায়ের বাজারে রহমত দর্জিকে সব জামা প্যান্ট, ফ্রক বানাতে দেওয়া হয়েছে। বিকালের দিকে সে আসবে তৈরী পোষাক নিয়ে। আরতি, মিনতি ছোট থাকতে, তাদের জামা তিনিই বানাতেন। ক্রুশের কাজেও তিনি পারদর্শী। বৈঠকখানা ঘরে টেবিলে তারই বানানো টেবিলকভার। পুরানো কাপড় দিয়ে সূক্ষ ডিজাইন দিয়ে অনেক কাথা তিনি বানিয়েছেন। শীতকালে দাওয়ায় বসে তিনি একদিকে কাঁথা সেলাই করতেন, আর অন্যদিকে বড়মা বসে কুলের নয়ত লেবুর আচার বানাতেন। উঠোনে কাপড় বিছিয়ে ডালের বড়ি বানানোও শীতকালে একটা বড় কাজ। কাল মহালয়া। ভোরে যতীনবাবু বেরোবেন তর্পন করতে। পূজোর আসন, কোষাকুষি, ফলমূল, পুরোহিতের দক্ষিণা সব আজকেই গুছিয়ে রাখতে হবে। বাইরে সুপারী শুকাতে দেওয়া হয়েছিল। সুপারী সব রায়বাড়ীর গাছের। বাড়ীর চারিপাশের বেড়ার পাশে পাশে বেশ কয়েকটা সুপুরি গাছ আছে। ঘরের কাজের লোক শশীকে দিয়ে সুপুরি পাড়িয়েছিলেন বেশ কিছুদিন আগে। শশী আর কিরণ মিলে জাতিতে সুপুরি কাটতে বসলেন। বাইরের ফুট ফরমাস কাটে রাখাল বলে ২০-২১ বছরের একটি ছেলে। আজ সে গিয়েছে ফুলবেড়িয়া গ্রামে, সেজ ভাই নরেন্দ্র মোহনের সঙ্গে। ওই গ্রামটিতে রায়বাড়ীর অনেক চাষীজমি আছে। গ্রামের কয়েকঘর বসবাসকারী ভাগচাষীরাই, ওখানে চাষ করে। নরেন্দ্র গিয়েছেন তারই দেখভালে। রায়বাড়ীর একটা বড় পুকুরও আছে সেখানে। গেল শীতে বেশ কিছু মাছের চারা ছাড়া হয়েছিল। সেই মাছই কিছু নিয়ে আসার জন্য পাঠিয়েছেন রাখালকে। দক্ষিনবঙ্গের দিকে, খুলনা বরিশাল অঞ্চলে সংবৎসর মাছের যোগান থাকে।ওখানকার জেলেরা সমুদ্র থেকেও মাছ ধরে আনে। কিন্তু ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, নেত্রকোনা অঞ্চলে বর্ষাকালে মাছ তেমন পাওয়া যায় না। শীতকালে তেমনি অনেক মাছের যোগান থাকে। তখন বড় বড় বিল বা হাওড়ের জল শুকিয়ে আসে আর সেইসময় প্রচুর মাছ ধরা হয়।
কিছুদিন আগে কিরণের চরিত্রের আরেকটি দিকের পরিচয় পাওয়া গেল। জমিদারির কাজের তত্বাবধান, সরকারী অফিসে যোগাযোগ, চিঠিপত্র লেখালেখির জন্য একজন সাহেবকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। তার নাম ছিল মিস্টার লিডওয়ার্ড। সাদা চামড়া, তারা সাধারণ গ্রামবাসীদের কাছে রাজার রাজা। সবাই এই মিস্টার ও মিসেস লিডওয়ার্ডকে ভিন্ন গ্রহের প্রজাতি মনে কর। কথা বলা তে দূরে থাক, কাছাকাছি ঘেঁসতে সাহস করে না। মিস্টার লিডওয়ার্ড কার্যসূত্রে অল্পকিছু কাজ চালানো গোছের বাংলা শিখেছেন।
গত বর্ষাতে, কিরণ আশিসকে কোলে নিয়ে বাইরের বারান্দাতে দাড়িয়েছিলেন। সঙ্গে লতিকা জমিদার গিন্নীর ছোটমেয়ে সুজাতা। সুজাতা এসেছিল কিরণের কাছে এমব্রয়ডারী শিখতে। মিসেস লিডওয়ার্ড ছাতা মাথায় বেড়িয়েছেন। এর আগেও কিরণের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়েছে। দুজনেই স্মিত হাসি বিনিময় করেছেন। কিন্তু তার বেশী কিছু না। মিসেস লিডওয়ার্ড কিরণেরই বয়সী। তার দুই সন্তান দার্জিলিংএর বোর্ডিং স্কুলে পড়ে। সারাদিনে মিসেস লিডওয়ার্ডের বিশেষ কাজ থাকে না। কিন্তু আঠারবাড়ীর লোকজনের সঙ্গে তার তেমন সখ্যতা নেই, কারণ এক ভাষাগত সমস্যা আর তায় আবার তিনি বিদেশিনী। তদুপরি গ্রামের লোকজন স্কার্ট পরা মহিলা দেখতে অভ্যস্ত নয় । সেদিন কি মনে করে তিনি কিরণের বারান্দর দিকে এগিয়ে এলেন। তাকে আসতে দেখে, লতিকা আর সুজাতা দাওয়ার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। কিরণ মিশনারী স্কুলে পড়েছেন, ইংরাজী এক আধটু বলতে পারেন। তবে অনভ্যাসে চর্চা চলে যায়। তাও তিনি ইংরেজীতে বল্লেন ‘প্লিস, কাম টু আওয়ার হাউজ, মিসেস লিডওয়ার্ড’। কিরণের মুখে ইংরাজী কথা তিনি এক্সপেক্ট করেন নি। খুশী হয়ে তিনি কিরণের এগিয়ে দেওয়া চেয়ারে বসে বল্লেন ‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইজ ইট ইয়োর বেবী? ভেরী সুইট’। এই বলে তিনি ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বার করে আশিস কে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। কিন্তু আশিস তো অচনা লোক দেখে, মায়ের কোলে আরো আঁকড়ে বসে আছে। কিরণই চকলেটটা নিয়ে আশিস কে দিলেন। দুজনের মধ্যে কিছু কথা হল। কিরণের ভাঙ্গা ইংরাজী। তাও আলাপচারিতায় অসুবিধা হল না। মিসেস লিডওয়ার্ড চা ও বিস্কুট খেয়ে কিছুক্ষণ পরে বিদায় নিলেন। মেমসাহেবের আসার কথা কিছুক্ষণের মধ্যে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল। কিরণ মেমসাহেবের সঙ্গে কিরণ, সমানতালে ইংরেজীতে কথা বলেছেন এ খবর পাওয়ার সব মহিলারা বেশ সম্ভ্রমের চোখে তাকাতে লাগল। কিরণের বেশ মজা লাগল, যাক, তাহলে সেই সিরাজগন্জে গিয়ে ইংরাজী শেখাটা সার্থক হল।
বিকালের দিকে যতীনবাবু এসে সব ঘটনা শুনলেন। তিনি বর্ণহিন্দু তার উপর বংশকৌলণ্য আছে। তার পিতা রজনী মোহন গোড়া ধর্মীয় ভাবাপন্ন। তার প্রভাব যতীনবাবুর মধ্যে বিদ্যমান। আচার আচরণে সনাতন হিন্দু রীতিনীতিতে তিনি বিশ্বাসী। বিধর্মীয় ম্লেচ্ছ বাসায় এসে বসেছিল, তার মানে, এ তো প্রায় জাত যাওয়ার অবস্থা। কিরণ বারকয়েক বোঝাবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। যতীনবাবু সারা বাড়ীময় গঙ্গা জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করলেন। তবে যতীনবাবু মনে মনে তারিফ না করে পারলেন না, যে কিরণ, মেমসাহেবের সঙ্গে সমানে সমানে কথা চালিয়ে গিয়েছেন। আলাদা করে স্ত্রীকে বল্লেন সে কথা। এই ঘটনার পরে অবশ্য, বাড়ীর লোকজন মায় জমিদার গিন্নী ডেকে নিয়ে কিরণকে বাহবা দিয়েছেন।
ক্রমশঃ









Comments
Post a Comment