ধূসর অতীত (তাপসের কথা)
২০১৪ সালে আমি আঠারবাড়ী রেল স্টেশনে
👇🏼দেশভাগের পর আমাদের রায়পরিবার ময়মনসিং জেলার আঠারবাড়ী থেকে চলে আসেন ওয়েস্টবেঙ্গলে। সেই আঠারবাড়ী আমি চাক্ষুষ করি ২০১৪ সালে প্রথমবার। এই গল্পের পটভূমি বিংশশতকের শুরুর দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা লাভের সময় অব্দি। কিছু সত্য, কিছু কল্পনা মিশিয়ে আমার এ লেখার শুরু। সেই সময়ের ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণের জন্য আমি আমার জ্ঞাতি কাকা রমেন্দ্র চন্দ্র দত্তের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপণ করছি।
ধূসর অতীত
তাপসের কথা (পর্ব ১)
সময়টা উনিনশ বিয়াল্লিশের অক্টোবর। তাপসের হাতে একটা ছোট সুটকেস। পূজোর ছুটি শুরু হয়েছে।তাপসের মুখে সদ্য গোঁফের রেখা, পরনে ধুতি আর হাফশার্ট। কলেজের পিছনদিকে ঝিলের পাশে টানা বারান্দা, তার পাশে সারিসারি ঘর, ছাত্রদের হোস্টেল। কলেজের গেট পেরিয়ে পিছনদিকে তাকালে দেখা যায় বড় বড় করে লেখা আনন্দ মোহন কলেজ, মায়মনসিং।
আনন্দ মোহন কলেজ ময়মনসিংহ
প্রথমবার কলেজটা দেখেই তাপসের খুব পছন্দ হয়েছিল। কি সুন্দর লাল রংএর বিল্ডিং। মোটা মোটা থাম। কলেজের পিছন দিকে একটা বড় ঝিল। সামনের রাস্তাটা পেরোলেই বিশাল এক মাঠ। সেখানে ছাত্ররা বিকালে ফুটবল খেলে, একপাশে ভলিবলও খেলা হয়। তাপসের অবশ্য এদুটো খেলার কোনটাই পছন্দ নয়। নিজের রোগাপাতলা গড়ন। দু একবার খেলার চেষ্টা করে দেখেছে। বলে পা ছোয়ানোর আগেই জবরদস্ত ট্যাকলিংএ আছাড় খেয়ে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। তার উপর বর্ষাতে জামাপ্যান্টে কাদা লেগে যায়। তাপসের পছন্দের খেলা হচ্ছে ব্যাডমিন্টন। কিন্তু সেটা সব সিজনে খেলা হয় না। শীতকালে নেট টানিয়ে খেলা হয়।
আনন্দ মোহন কলেজ নাকি প্রথম শুরু হয় ১৮৮৫ সালে। তখন এটার নাম ছিল ময়মনসিং সিটি কলেজিয়েট স্কুল। কলিকাতার প্রখ্যাত ব্যারিস্টার আনন্দ মোহন বসু তার পৈতৃক বাসভূমি ময়মনসিং শহরে এর সূচনা করেন। তিনি একাধারে ভারতের প্রথম Rangler স্কলার, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। কলকাতার সিটি কলেজের প্রতিষ্ঠাও তিনি করেছিলেন। ১৮৯৯ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় এর নাম ছিল ময়মনসিং সিটি কলেজ ও এটি যুক্ত ছিল কলকাতার সিটি কলেজের সঙ্গে। পরে, আনন্দ মোহন বসু ১৯০৬ সালে মারা গেলে ময়মনসিং কলেজ, সিটি কলেজ থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যেতে বসে। তদানীন্তন কলেজের প্রিন্সিপাল বৈকুন্ঠনাথ চক্রবর্তী, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে আর ব্ল্যকউডের শরনাপন্ন হন। সরকারী গ্রান্ট পাওয়া যায় ৫৫,০০০/-। এছাড়া মুক্তাগাছার জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী দিয়েছিলেন ৪৫,০০০/- এবং রামগোপালপুরের রাজা যোগীন্দ্র কিশোর চৌধুরী ৩০,০০০/-। এসবই কলেজের এক মার্বল ফলকে লেখা আছে। তাপস দেখেছে। খুব আশা করেছিল আঠারবাড়ীর জমিদারের নামও দাতার খাতায় থাকবে। পরে এব্যাপারে বাবা যতীন্দ্র মোহন রায়কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল তদানীন্তন জমিদার শম্ভু রায়চৌধুরী তখনও সেরকম প্রতিপত্তি করে উঠতে পারেন নি। তার ছেলে মহিম রায় চৌধুরীর আমলেই জমিদারির সীমানা ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। উত্তর গৌরীপুরের রাজবাড়ী, পশ্চিমে রামগোপাল পুর, ঢৌহাখলা, দক্ষিনে কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেন পুর ও নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা ধীরে ধীরে জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। তাছাড়া বৃহৎত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার কয়েকটি মৌজা, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বেশ কিছু মৌজা ছিল এ জমিদারের দখলে। এই সমস্ত জায়গাতে আলাদা করে কাছারীবাড়ী ছিল খাজনা আদায়ের জন্য। তাপসের বাবা এই বিশাল জমিদারির খাজনা আদায়ের হর্তাকর্তা ছিলেন। ওই অঞ্চলে যতীনবাবু ছিলেন খুবই সন্মানিত ব্যাক্তি। সবাই বেশ সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলত।
তাপসের বাসা আঠারবাড়ীতে। ট্রেনে ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে বাড়ী পৌছাতে। সড়ক যোগাযোগ ভাল না। ময়মনসিং রেল স্টেশনটা শহরের মধ্যে। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বিশাল ব্রহ্মপুত্র।
ব্রহ্মপুত্র নদ বয়ে গিয়েছে ময়মনসিং শহরের পাশ দিয়ে
এই রেললাইন তৈরীর সময়কাল হচ্ছে ১৯১২-১৮। ইংরেজরা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ তাড়াতাড়ি ভারতবর্ষে রেল লাইন পাতার কাজ শুরু করে। তাপস ছোটবেলায় ভাবত, সাহেবদের জন্য, ভারতবর্ষের কত তাড়াতাড়ি উন্নতি ঘটছে। বাবার কাছে শুনেছে রেল লাইন হওয়ার আগে দূরে কোথায় যাওয়া মানে গরুড়গাড়ী ছিল প্রধান ভরসা। তখনকার দিনে মানে উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে লোকে নাকি হেঁটেই আঠারবাড়ী থেকে দশ মাইল দূরে কিশোরগন্জ অথবা ঈশ্বরগঞ্জ চলে যেত। তাপস নিজেও খুব হাটতে ভালবাসে। বিকালের দিকে সে আর তার ক্লাসের বন্ধু সুধেন্দু, ইউসুফ হাটতে হাটতে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে চলে যায়। ঘাটের কাছে সারাক্ষন যাত্রীদের ভীড়। নৌকাতেই সাধারন লোক এপাড় ওপাড় করে। এক একটা নৌকায় বিশ পঁচিশ জন লোক। বর্ষাকালে মাঝে মাঝে ফেরীঘাটে লোক উপচে পরে। কারন নদী পারাপার বন্ধ থাকে যখন বর্ষাতে খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্রের রূপ হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। বৃষ্টির সঙ্গে বড় বড় ঢেউ আর ঝড়ে অশান্ত নদীর সে রূপ ভয়াল ভয়ঙ্কর। তাপসের দেশের বাড়ী, আঠারবাড়ীর পাশ দিয়ে ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী কাচামাটিয়া বয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে অনেক ছোট। তার এত খরতর রূপ দেখা যায় না।
তাপস জন্মইস্তক দেখে আসছে, জেলাশহর ময়মনসিং যেতে গেলে ট্রেনেই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সড়কপথ মানে প্রথম নৌকায় বিশাল ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে বাসে শম্ভুগঞ্জ, সেখান থেকে আবার বাস ধরে ঈশ্বরগঞ্জ, ওখান থেকে আঠারবাড়ী দুইক্রোশ। এটুকু রাস্তা হেটে যাওয়া তাপসের কাছে জলভাত। গেলবার রথের মেলার সময় কলেজ দুদিন ছুটি ছিল। সেইবছর অর্থাৎ ৪২ সালে মার্চমাসে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর হঠাৎ করে টানা ছুটি পাওয়া গিয়েছিল, শনি-রবিবারটাকে ধরে। হস্টেল থেকে ও আর প্রভাত দুজনে বেরিয়েছিল বাড়ী যাওয়ার উদ্দেশে। প্রভাত এক ক্লাস উপরে, বিএ ক্লাসে পড়ে। ওর বাড়ী ঈশ্বর গন্জে। স্টেশনে এসে দেখে ট্রেনের যাত্রীতে পুরো চত্বর ছয়লাপ। সেবারে আর ভরসা করে ট্রেনে না উঠে, সড়ক পথে এসেছিল। দুজনে ছিল, তাই বন্ধুর ভরসাতে নৌকা ও বাসযাত্রা।
তাপস ভর্তি হয়েছে আই এস সি তে। একবছর এখন হোস্টেলে থাকতে হবে। অংক করতে তাপসের বেশ ভালই লাগে। তাপস এমনিতে বেশ লাজুক। ক্লাসে মাস্টারমশাইদের সঙ্গে আলাপচারিতা কম। ঠিকমত ফিজিক্স বা কেমেম্স্ট্রী না বুঝতে পারলেও উঠে দাড়িয়ে বাকী সব বন্ধুদের সামনে জিজ্ঞাসা করতে বাধবাধ ঠেকে। তবে জানি কেমন করে অঙ্কের মাস্টারমশাই মধুসূদন দাশ তাপসকে ভাল ছাত্র হিসাবে চিনে ফেলেছেন। ক্লাসে একদিন মধুসূদন স্যার একটা অঙ্ক দিয়েছিলেন, কেউ করতে পারছিল না। তাপস না জানি কেমন করে অঙ্কটা করে ফেলেছিল। তবে স্বভাবসিদ্ধভাবে চুপচাপ নিজের বেঞ্চে বসেছিল। মধুসূদন বাবু কি মনে করে তাপসকেই জিজ্ঞাসা করলেন - কী ব্যাপার, চুপ করে বসে আছ যে! তাপস বেশ ভয়ে ভয়ে জানাল -স্যার আমি করে ফেলেছি। মধুসূদন বাবু বেশ অবাক হয়ে ডাকলেন-খাতা নিয়ে এস আমার কাছে। অঙ্কটা সেদিন তাপস ঠিকই নামিয়েছিল মধুসূদন বাবু খুশী হয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে তাপসের অংকে আরো উৎসাহ বেড়ে গেল।
ধূসর অতীত পর্ব ২
যে ঘটনা দিয়ে কাহিনীর শুরু সেটা হল তাপস কলেজ হোস্টেল থেকে বেরিয়েছে আঠারবাড়ী যাবে। তবে তার কাঁধে এক গুরুদায়িত্ব রয়েছে। তার পরের দুই বোন আরতি আর মিনতি মায়মনসিং এ বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে।
বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুলে রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালে
বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুল ময়মনসিংহ
পূজার ছুটিতে তারাও আঠারবাড়ী যাবে। কিছুদিন আগে গান্ধিজী ডাক দিয়েছিলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের। অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। বড় শহরেই দেখা গিয়েছে মিছিল, অগ্নিসংযোগ। ইংরেজ সরকার শুরু থেকেই গায়ের জোরে এই আন্দোলন প্রতিহত করছে। ময়মনসিংহতেও ঐ সময় ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল। মাস খানেক আগে মুক্তাগাছার পুলিশ পোস্ট ও পোস্ট অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। তাই এখনও পরিস্থিতি বেশ কিছুটা থমথমে। ঢাকাতে সদরঘাট এলাকাতে কয়েকদিন আগে পুলিশের সঙ্গে প্রতিবাদ মিছিলের সংঘর্ষে একজন মারা গিয়েছে। পুরাতন পল্টন, আর্মানীটোলাতেও অনেক অশান্তি হয়েছে। তাপসের মা কিরণময়ী দেবী চিঠিতে লিখেছেন তারা যেন সবধানে আসে। কোথাও কোন ঝামেলা হচ্ছে দেখলে যেন তার ধারে কাছে না যায়। তাপস এমনিতে শান্তশিষ্ঠ। তবে কলেজে তার কয়েকজন বন্ধু আছে, যারা স্বদেশী করে। একজন তো বিপ্লবীদের যুগান্তর দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিদ্যাময়ী স্কুলের লেডিস হোস্টেলের নিয়মকানুন খুব কড়া। হোস্টেলের মেট্রন হেমাঙ্গিনী মিত্র। গতবার আরতি মিনতিকে হোস্টেলে পৌছে দিয়েছিলেন বাঁশীকাকা। উনি সম্পর্কে আত্মীয়, তাপসের বাবা যতীনবাবুকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করেন, যতীনবাবু নিজে সেরেস্তার কাজে এবার ব্যস্ত। জমিদারীর প্রতিটি সেরাস্তাতে যে কাছারীবাড়ীর কর্মচারী আছেন, সবাইকে ডাকা হয়েছে। বৃস্টি এবারে ভালই হয়েছে। সুতরাং ফসল ভালই হবে। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নাকি সরকারবাহাদুরের ফরমান এসেছে, জমিদারির খাজনার পরিমাণ বাড়াতে হবে। তবে কতটা বাড়বে সেটা এখনো জানা যায় নি। জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায়চৌধুরীর খুবই বিশ্বাসভাজন এই এস্টেট ম্যানেজার যতীনবাবু। যতীনবাবুর সততা প্রশ্নাতীত। জমিদারের প্রতি তার প্রশ্নহীন আনুগত্য। তার এককথায়, ইনশিওরেন্স কোম্পানির লোভনীয় চাকরী উপেক্ষা করে জমিদারের কাজে যোগদান করেন।
যতীনবাবু চিঠি লিখে দিয়েছেন যে বোনেদেরকে এবার তাপস নিয়ে যাবে। সেই চিঠি গতকালই হেমাঙ্গিনী ম্যাডামকে দিয়ে এসেছে। তাপসের সঙ্গে একটা ছোট তোরঙ্গ। পা চালিয়ে চলেছে তাপস। বর্ষার পরে আশ্বিনের তপ্ত রোদ। ১০টা বেজে গিয়েছে। বিদ্যাময়ী গার্লস স্কুল মিনিট পনেরর হাঁটা রাস্তা। টাউনহলের পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখে পড়ল আলেকজান্দার হাউস। তাপস আগে একবার এর ভিতরে ঢুকেছে, গেটের দারোয়ানকে বলে কয়ে। আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র শুনে অনুমতি দিয়েছিল। ময়মনসিংহ শহরের এক উল্লেখযোগ্য স্থাপনা আলেকজান্ডার ক্যাসেল বা আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল। আলেকজান্ডার ক্যাসেল।
আলেকজান্দার ক্যাসেলময়মনসিংহ শহরের পুরোনো একটি স্থাপনা। মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য ১৮৭৯ সালে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় করে ততকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারের সম্পত্তি রক্ষার্থে এ প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রাসাদটিতে লোহার ব্যবহার বেশি করা হয়েছিল বলে এলাকাবাসী এটিকে ‘লোহার কুঠি’ নাম দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভবনটিতে অনেক বরেণ্য ব্যক্তির পদধূলি পড়েছে। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরের সময়ে আলেকজান্ডার ক্যাসেলে কিছুদিন ছিলেন। এ ছাড়া এখানে আরো এসেছিলেন লর্ড কার্জন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা প্রমুখ।
একটু পরে তাপস পৌছে গেল বিদ্যাময়ী স্কুলে। লোহার বড় গেটটাকে পেরোলেই এক বিশাল চত্বর তারপাশে একটা বড় রাধাচূড়া গাছ। এর স্কুল বিল্ডিংটাও লাল রং এর, আর্চ করা খিলান, গথিক স্টাইলের ছাপ সুস্পস্ট। সমগ্র ময়মনসিংহে এই স্কুলের খুব নামডাক। প্রথমদিকে এর নাম ছিল আলেকজান্দার বিদ্যালয়। ১৮৭৩ সালেমধ্যে মুক্তাগাছার জমিদার রাজা জগত কিশোর রায়চৌধুরীর বিপুল অর্থদানে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টির সম্পূর্ণ নতুন ভাবে নির্মিত হয়। তাঁর পূণ্যময়ী জননী বিদ্যাময়ী দেবীর নামে আলেকজান্ডার বিদ্যালয়টি বিদ্যাময়ী নাম ধারণ করে এখন সেই থেকে স্বমহিমায় বিরাজমান। তৎকালীন যুগে ময়মনসিংহ যথেষ্ট প্রগতিশীল হিসাবে পরিচিত ছিল। পাট ও ধান দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন হত। ফলে পুরো জেলাটাই ছিল বর্ধিষ্ণু। এটাও একটা বলার মত ব্যাপার ছিল যে, ব্রিটিশ শাসনের আমলে ময়মনসিংহ ছিল ভারতবর্ষের সবচাইতে বৃহত্তর জেলা।
দুই বোন অপেক্ষা করছিল হোস্টেলে। গেটপাশ বানিয়ে বোনেদের কে একটা রিক্সাতে তুলে দিল তাপস। কারন দুই বোনের হাতের সুটকেস নিয়ে হাঁটা সম্ভব নয়। বিদ্যাময়ী স্কুল থেকে স্টেশন পাঁচ মিনিট। পা চালিয়ে যখন স্টেশনে পৌঁছাল, তখন ট্রেনের প্রথম ঘন্টি পড়েছে।
তার মানে ট্রেন আসতে এখনও আধাঘন্টা। তিনটে ইন্টার ক্লাসের টিকিট কেটে তাপস বোনেদের নিয়ে প্লাটফর্মে এসে একটা বেঞ্চে জায়গা পেয়ে বসেছে। আরতি, মিনতি দুই বোনই খুব ফরসা। তবে প্লাটফর্মের গরম আর ভীড়ে দুজনেই ঘামছে। মিনতি বেশ গোছান, তার ব্যাগ থেকে বেরোল জাপানি পাখা। তাপস গিয়ে খবর নিয়ে এল লেডিস কম্পার্টমেন্টটা কোথায় পড়বে। কিছুক্ষন পরে পাগড়ী আর খাকি হাফপ্যান্ট হাফশার্ট পরা রেলের কর্মচারী ঘন্টা বাজাতে বাজাতে, তারই মধ্যে, কয়লার ইন্জিন টানা ট্রেন ঢুকে পড়ল ময়মনসিংহ স্টেশনে। জংশন স্টেশন। মায়মনসিংহ স্টেশন থেকে আর একটা লাইন গিয়েছে ঢাকা হয়ে নারায়নগন্জ । এই লাইন তৈরী হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। ময়মনসিংহ আর ঢাকা অঞ্চল তখনকার দিনে পাটচাষের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। অথচ পাটকল গুলি ছিল কলিকাতা শহরের পার্শবর্তী হুগলি নদীর তীর বরাবর নৈহাটি, ব্যারাকপুর, হাওড়া ইত্যাদি অঞ্চলে। হুগলী নদীর পাশে কলকাতার কাছাকাছি পাটকল
তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল উত্তরপূর্ব পূর্ববঙ্গের কাঁচা পাট নারায়নগন্জ থেকে বড়নৌকা বা জাহাজে আনতে গেলে, রেলপথ সবচেয়ে সুবিধাজনক এবং অপেক্ষাকৃত পরিবহন মাশুল কম সড়কপথের তুলনায়। তাছাড়া বাংলাদেশ অসংখ্য নদী নালা বেষ্টিত দেশ। সেখানে রাস্তা তৈরী মানে অনেক সেতু বানাতে হবে। বর্ষাকালে রাস্তায় যাতে পানি না জমে তারজন্য রাস্তার জমি উঁচু করতে হবে। এছাড়াও রেলপরিবহনে একসঙ্গে অনেক মালামাল পরিবহন করা যায়।
লেডিস কম্পার্টমেন্টে বেশ ভীড়। দুই বোন উঠে জায়গা পায় নি বসার। ব্যাগ গুলো হাত নিয় দাড়িয়ে আছে। অবশ্য ব্যাগে জিনিষপত্র কম। খালি কিছু বিস্কুটের কৌটো। মা গতবার আসার সময় দুইবোনকে ক্ষীরের তক্তি বানিয়ে দিয়েছিল। আরতি মিনতি সেগুলো দিন পনেরর মধ্যে শেষ করে দিয়েছিল। কয়েকটা আবার বান্ধবীদেরও দিতে হয়েছে। তবে মা পইপই করে বলে দিয়েছে, কৌটো গুলো ফেরত আনতে। ওগুলো হচ্ছে বিদেশী বিস্কুটের কৌটো। খুব এয়ারটাইট। যতীনবাবু বছর দুয়েক আগে জমিদারির এক জমি সংক্রান্ত মামলায় কলকাতায় গিয়েছিলেন, উকিলের সাথে কথা বলতে। তখনই ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছিলেন হগ মার্কেটে। মাটির তলায় এক বিশাল বাজার।
হগ মার্কেট বা নিউ মার্কেটযতীনবাবু অনেকের কাছে এই মার্কেটের কথা শুনেছিলেন। ঠিক বিশ্বাস হয় নি।এবার নিজ চোখে দেখে চক্ষুকর্ণের বিবাদভন্জন। সত্যিই তো মানুষ কি না পারে। মার্কেটে বেশ কিছু সাহেব, মেমসাহেব ক্রেতা ঘোরাঘুরি করছে। মাসটা ছিল এপ্রিল। বাইরে রোদের হাত থেকে বাঁচতে মেমসাহেবদের মাথায় টুপি। মার্কেটের ভিতরে টুপিটা খুলে একহাতে আর অন্যহাতে ব্যাগ, কনুই থেকে ঝুলছে আর খালি হাতে ছোট হাতপাখা নিয়ে মাঝে মাঝে হাওয়া করছেন নিজেদেরকে। মেয়েদের এরকম ব্যাগকে নাকি ভ্যানিটি ব্যাগ বলে। যতীনবাবু কাগজের বিজ্ঞাপনে দেখেছেন। ঘুরতে ঘুরতে দেখলেন একটা ব্যাগের দোকানের সামনে কাচের মধ্যে মেয়েদের খুব সুন্দর সুন্দর ব্যাগ। মনে খুব ইচ্ছে করছিল একটা কিনে নিজের স্ত্রী কিরনবালাকে দেবেন। বেচারী মুখ ফুটে কখনও কিছু আব্দার করে নি। সেই কতদিন আগে ফুলশয্যায় নববধূর হাতে একটা হীরের আংটি উপহার দিয়েছিলেন। কিরণের সেই সলজ্জ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তারপর কত বছর কেটে গিয়েছে। তখনও ছোট কন্যা তপতী আর কনিষ্ঠ সন্তান আশিসের জন্ম হয় নি। পূজার নূতন শাড়ী বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া কিছু আলাদা ভাবে উপহার দেওয়া হয় নি। দামও লেখা আছে দুই টাকা চার আনা। সেটুকু টাকা তো তার কাছে আছে। যতীন্দ্র মোহন দোনামোনা করতে লাগলেন। বাসায় বড় মা আছেন অর্থাৎ পিতা রজনী মোহনের তৃতীয় পত্নী। যতীন্দ্র মোহনের নীচে আরো চার ভাই। দুজন জমিদারি সেরস্তার কাজকর্মে জড়িত। কনিষ্ঠজনের উপরের ভাই সদ্য কুচবিহার কলেজ থেকে পাশ করে, আসামের চা বাগানে চাকরী পেয়েছে। বাসাতে দুই বোন আছে। খালি কিরণের জন্য কিছু উপহার নিতে চক্ষুলজ্জা হল। তাকে সবাই চেনে সৎচরিত্র দাপুটে এস্টেট ম্যানেজার হিসাবে। রায় পরিবারের মাথার মধ্যমনি তিনি। পত্নীপ্রেম তার গভীর, কিন্তু পরিবার পরিজনের সামনে তার প্রকাশ, তখনকার দিনের হিন্দুসমাজে, বাঁকা চোখেই দেখা হয়ে থাকে। অগত্যা ব্যাগের চিন্তা মাথা থেকে পরিত্যাগ করে, কেক বিস্কুটের দোকানে ঢুকলেন। তিন বাক্স ভাল বিস্কুট আর দুপাউন্ড ওজনের কেক কিনলেন। যতীনবাবু জানেন, হগ মার্কেটের কেক বিখ্যাত।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ৩
খালি বিস্কুটের কৌটোর কারনে আরতি মিনতির ব্যাগ হাল্কা, জামা কাপড় তো নামমাত্র, এছাড়া পড়ার বই দু তিনটে। আগামীকাল মহালয়া। তারপর থেকে কালীপূজা পর্যন্ত টানা ছুটি স্কুলে। দুই বোনে মিলে যুক্তি করেছে, জগদ্ধাত্রী পূজা শেষ না করে তারা বিদ্যাময়ীতে ফিরবে না। দুজনেরই আর তর সইছে না, কতক্ষনে তারা আঠারবাড়ী পৌঁছাবে। পূজার নূতন জামা কি হল, যতক্ষন না জানা যাচ্ছে ততক্ষন শান্তি নাই। আরতি পরে ক্লাস এইটে। আসার আগে মায়ের কাছে আব্দার করে এসেছে পূজাতে এবার শাড়ী চাই। মিনতি, আরতির থেকে বেশ কিছুটা ছোট। সে এমনিতে খুবই লাজুক। চাওয়া টাওয়ার ব্যাপারে সে বেশ পিছিয়ে।
তাপস আছে পাশের কামরাতে। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র ব্রীজের উপর। বর্ষার পরে ভরা নদী। স্রোতস্বিনী। তবে জলের রংটা হাল্কা লালচে। তাপস স্কুলে থাকতে ভূগোলে পড়ছে, এই নদীর উৎপত্তিস্থল হচ্ছে তিব্বত। সেটা হিমালয় পাহাড়ে এক মালভূমি। স্কুলের বইতে পোতালা নামে তিব্বতের রাজার প্রাসাদের ছবি ছিল। নদীর উৎসের অববাহিকা তে কোন গাছপালার চিহ্ন নেই। তাই বৃষ্টির জলের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র বয়ে নিয়ে আসে তিব্বতের হলুদ লাল মাটি। তিব্বতে এই নদীটির নাম সাংপো। এই কারনে বর্ষার পরে জলের রং কিছুটা লালচে দেখায়। তবে শীতে কি গ্রীষ্মে নদীর জল থাকে স্বচ্ছ। নদীর দুই পাশে যতদূর চোখ যায় কাশফুল ফুটে রয়েছে। কাশফুল আর শরতের নীল আকাশে ছেড়া মেঘের খেলা দেখলে তাপসের মনে পড়ে যায় পূজো আসছে।
ট্রেন এসে পৌঁছাল গৌরীপুর জংশনে। পঁচিশ মিনিট মত সময় লাগল। গৌরীপুর জংশন স্টেশন। ময়মনসিংহ থেকে ভৈরব বাজার ১৬০ কিমি। আর ময়মনসিংহ থেকে আঠার বাড়ী ৪০ কিলোমিটার । আঠারবাড়ীতে ট্রেন থামবে পাঁচ মিনিট। তাপস পাশের লোকটাকে সুটকেস খেয়াল রাখতে বলে প্লাটফর্মে নামল। বেশ কিছু লোক মোহনগঞ্জ যাবার ট্রেন ধরবে বলে নেমেছে। আরতি মিনতি দুজনেই বসেছে জানলার পাশে। তাপস এক হকার কে ডেকে দু পয়সায় চারটে ছানার সন্দেশ কিনল। একটা নিয়ে কলপাতার ঠোঙাটা এগিয়ে দিল বোনেদের দিকে। মিস্টির সঙ্গে খাবার জল ফ্রি। বাতাসে ছাইয়ের গন্ধ, কয়লার গুড়ো মাঝে মাঝে চোখে এসে পড়ছে। ট্রেনের ভেপুটা বেশ জোরে বেজে উঠল। এ্যংলো ইন্ডিয়ান গার্ড সাহেব, পিছন থেকে সবুজ ঝান্ডা নাড়তেই গাড়ী আবার চলতে শুরু করল।স্টেশন ছাড়ার একটু পরে রেল লাইনটা দুভাগ হয়ে গেল। উত্তরের লাইনে, গৌরীপুরের পর আসে শ্যামগঞ্জ জংশন স্টেশন। সেখান থেকে একটা লাইন নেত্রকোনা হয়ে মোহনগঞ্জ আর আরেকটা লাইন যাচ্ছে, জালশুকা স্টেশন হয়ে ঝরিয়া ঝান্জাইল।
আর গৌরীপুর থেকে অন্য লাইনটা, যেটা তাপসদের ট্রেন ধরেছে, সেটা যাচ্ছে নান্দাইল, কিশোরগন্জ, সরারচর, বাজিতপুর হয়ে ভৈরব বাজার। তাপসের স্টেশন, আঠারবাড়ী আর মাত্র দুটো স্টেশন পরে। সে দুটো স্টেশন হল ঈশ্বরগঞ্জ আর সোহাগী। তাপস গৌরীপুরের পর থেকে জায়গা পেয়েছে জানালার পাশে। সে খুব সাবধানী মানুষ। যাতে চোখে কয়লার গুড়ো না ঢোকে, তাই হাত দিয়ে চোখের সামনেটা ঢেকে রেখেছে। যে দিকে চোখ যায় সবুজ ধানের ক্ষেত। রেল লাইনটা আশেপাশের সমতলভূমি থেকে কিছু উপরে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ব্রীজ। বর্ষার পরে, ব্রীজের তলা দিয়ে ছোট জলধারা বয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা গ্রাম পড়ল রাস্তায়। খড়ের ছাউনিই বেশী। নিকানো উঠোন। বেড়া দেওয়া ঘরের একপাশে ধান রাখার গোলাঘর। একটা বাড়ীর বারান্দায় তাপস দেখতে পেল দুই মহিলা মিলে, ঢেকিতে পাড় দিচ্ছে। তার হঠাৎ মনে হল স্কুলে সুধন্য মাস্টার মশাই মাঝে মাঝে ছাত্রদের বকতেন -‘অকর্মণ্যের ঢেকি। কিন্তু তাপস স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ঢেকি জিনিষটা কত কাজের। ধান কোটা, মশলা কোটা কত কাজেই যে ঢেকি লাগে। গ্রামজীবনের গৃহস্থ বাড়ীর অপরিহার্য অঙ্গ। তার উপর যে পাড় দিচ্ছে, অর্থাৎ কিনা এক পা দিয়ে ঢেকিটাকে ওঠাচ্ছে নামাচ্ছে, আর নীচে একজন হাত দিয়ে তালে তালে ধান দিচ্ছে, ঢেকিটা উপরে উঠলে তুলে নিচ্ছে, এই তালমিলে বহুদিনের তালিম দরকার। ‘অকর্মণ্য’ কথাটা যে কি করে এরকম একটা সূক্ষ কাজের মধ্যে যুক্ত হল, তাপস অনেক ভেবেও তার থই পেলো না।
তাপসের পাশে এক মধ্যবয়সী মুসলিম বসে। পরনে লুঙ্গি, খালি গা। সে উঠেছে গৌরীপুর থেকে। সঙ্গে একটা ছাগল। সেটাকে সে দরজার কাছে বেধে রেখেছে। তাপসকে জিজ্ঞাসা করল- ‘ছোটকর্তা যান কতদূর?’ তাপস বল্ল- আঠারবাড়ী। আলাপচারিতায় জানা গেল সেও নামবে আঠারবাড়ীতে। রায়ের বাজারে আজ হাট আছে। সারা মায়মনসিংহ জেলায় সবচেয়ে বড় হাট। আঠারবাড়ীর লোকেদের এই হাট নিয়ে বেশ গর্ব আছে। লোকটার নাম আসলাম। গৌরীপুরের জমিদারের প্রজা। আসলাম, একটু আলাপের পর, কোচড় থেকে দুটো পেয়ারা বার করে তাপসকে একটা দিয়ে বল্ল-‘আপনে খান ছোটকর্তা’। তাপস ইতস্তত করছিল। বাড়ীতে দেখেছে, মুসলমান প্রজারা কোন কাজে এলে বৈঠকখানার ঘরে ঢোকা তাদের বারন। তারা বাইরের অঙ্গনে বসে। তাদের জল খাওয়ার গ্লাস আলাদা। হুকোও আলাদা। তাপস একটু ইতস্তত করছিল। তাপসের অবশ্য হিন্দু মুসলিম বিভেদ ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হয় না। হস্টেলে ওর পাশের ঘরে থাকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম। নজরুলের বাসা হল কিশোরগন্জে। সে পড়ে আই এ। নজরুল পড়াশুনাতেও যেমন ভাল, তেমনই সে বন্ধুবৎসল, কলেজের অনেক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আগ বাড়িয়ে নজরুলই তাপসের সঙ্গে আলাপ করে। নজরুল তাকে একটা বই পড়তে দিয়েছিল। প্রচ্ছদের দাড়িওয়ালা লোকটাকে তাপস চিনত না। নজরুল বল্ল-‘এর নাম হইল গিয়া কার্ল মার্কস। কমিনিউজিম চিন্তাধারার প্রবর্তক’ । তাপস কিছুটা পড়ার পর বিশেষ কিছু বুঝতে না পেরে বইটা ফেরত দেয় নজরুলকে। নজরুল ওকে বোঝায়, একটা সময় আসবে, যখন পৃথিবীতে ধনী, দরিদ্র, জাতি, বর্ণের বিভাজন থাকবে না। সাধারন লোক তৈরী করবে সরকার, রাজ্যশাসনের জন্য, যারা নিজেদের শ্রম ঝরিয়ে ফসল ফলায়, তাঁরাই হবে কৃষিজমির প্রকৃত মালিক। তাপসের কাছে ব্যাপারটা কিরকম ধোয়াটে লাগে। আসলাম হাতটা বাড়িয়ে আছে দেখে, তাপস পেয়ারাটা নিল। লোকটা মুসলমান তো কি হয়েছে, আদর করে দিয়েছে, তায় আবার তাপস আড়চোখে দেখে নিয়েছে বেশ ডাসা পেয়ারা। তাপস এস্টেট ম্যানেজারের সন্তান শুনে, আসলাম বেশ সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকিয়ে একটু সংকুচিত হয়ে বসল। আঠারবাড়ীর জমিদার বাড়ীর চত্বরেই দাতব্য চিকিৎসালয় আছে। রীতিমত এলএমএফ পাশ করা ডাক্তার। এস্টেটের তরফ থেকে তাকে মাইনে দেওয়া হয়। গরীবদের ঔষধ দেওয়া হয় বিনামূল্য। আসলাম অনেকদিন ধরে শুনেছে, ডাক্তার নাকি খুব ভাল ঔষধ দেন। সেই ভরসায় সে আজ ডাক্তারও পারলে দেখাবে। তাপস আসলামকে চিকিৎসালয়ে যাওয়ার রাস্তা বলে দিল। দেখতে দেখতে ট্রেন ঢুকে গেল আঠারবাড়ী স্টেশনে।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ৪
আঠারবাড়ী স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াবে পাঁচমিনিট। তাপস দরজা দিয়ে নেমে দেখতে পেল, দুই বোন দরজার কাছে ব্যাগ নিয়ে দাড়িয়ে। হরকুমার এসেছে স্টেশনে। রায় পরিবারের বিশ্বস্ত কাজের লোক। তাপস তাকে জন্মইস্তক দেখে আসছে। বাড়ীর কোথায় কি থাকে, বড়কর্তার কখন কি দরকার, গিন্নীমায়ের রান্নার যোগাড়ের কাজ, বলতে গেলে রায় পরিবারের জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ, সবেতেই হরকুমার উপস্থিত। হরকুমারকে দেখে তাপস নিশ্চিন্ত। হরকুমার সব ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নিয়ে এগিয়ে চল্ল। স্টেশনের বাইরে এক্কাগাড়ী দাড়িয়ে।কালো রংএর একটা ঘোড়া, কপালের কাছটা সাদা, সে নিশ্চিন্তে মনে সামনে বাঁধা বস্তাটার ভিতর থেকে বিচালি খাচ্ছে। ঘোড়ার লেজটা মাঝে মাঝে নড়ে মাছি তাড়াচ্ছে। আরতির খুব ঘোড়া পছন্দ। সে একবার সাহস করে ঘোড়ার মাথায় হাত বুলিয়ে এল। এই প্রথম সে ঘোড়ার গাড়ী চড়বে। যতীনবাবু ঘোড়ার গাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছেন, ছেলে, মেয়েদের ঘরে ফেরার জন্য। জমিদার বাড়ীর গাড়ি, তবে যতীনবাবুকে, জমিদার প্রমোদ রায়চৌধুরী অনুমতি দিয়েই রেখেছেন, যখনই দরকার পড়বে, তখনই যতীনবাবু গাড়ী নিতে পারেন। তবে তাপসের বাবার আত্মসম্মান জ্ঞান প্রবল, অন্যের জিনিষ পারতপক্ষে নেন না। কিন্তু আজকের কথা আলাদা। সবাই মিলে উঠে বসল গাড়ীতে। এক্কাগাড়ী চলতেই, হরকুমার জানাল, দুর্গাপ্রতিমা তৈরী প্রায় শেষ পর্যায়ে, আজকে গনেশ ঠাকুরকে দিয়ে চক্ষুদান শুরু হবে।প্রতিমা হচ্ছে আটচালাতে। এবার নূতন কারিগর। এর নাম মুকুল, আগের যে মৃৎশিল্পী ছিলেন তার নাম ছিল হরিপদ কর্মকার, উনি প্রত্যেকবার নান্দাইল থেকে আসতেন পূজার মাসখানেক আগে, প্রতিমা তৈরী করতে। তাপস হরিকাকাকে, জমিদারবাড়ীর মৃন্ময়ী মূর্তি তৈরী করতে জন্মইস্তক দেখে আসছে। হরকুমার বল্ল, হরিকাকার বয়েস হয়েছে, তার উপর আবার ব্যামো, তাই ছেলেকে পাঠিয়েছেন এবারে মূর্তি বানাতে। তাপসের খুব ভাল লাগে এই প্রতিমা বানানোর প্রতিটি পর্বের কাজ দেখতে। মিনিট দশেকের মধ্যে ওদের গাড়ী এসে গেল বাড়ীর দোরগোড়ায়। সদর রাস্তা থেকে মোরাম বিছানো রাস্তাটা জমিদার বাড়ীর দু নম্বর গেটের কছে এসে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ডানদিকে গেলে কয়েক ফার্লং গেলেই তাপসদের বাসা, প্রথমে একটা ফাঁকা চত্বর, সোজাসুজি তাকালে, জমিদার বাড়ীর পাঁচিলের গা ঘেসে খড়ের চাল ওয়ালা গোয়ালঘর, ডানদিকে টানা বারান্দা, দরজা দিয়ে ঢুকলে, বৈঠকখানা ঘর, ছাদটা টিনের চাল, বর্ষাকালের সময় টিনের চালের উপর বৃষ্টির আওয়াজ, আর চারিদিকে ব্যাঙের কলতানে তাপসের মনে হয় যেন ব্যান্ড পার্টি বাজনা বাজাচ্ছে। বৈঠকখানা ঘরে, দরজার উপরে একটা হরিণের মাথা লাগানো। আর এক পাশে, বড়পিসির এমব্রয়ডারী করা বাঁধানো ফ্রেম, তাতে লেখা আছে-‘পিতঃ ধর্ম, পিতঃ স্বর্গ, পিতহী পরমং তপ, প্রীতরি প্রীতিমা পন্নে, প্রীয়ন্তী সর্বদেবতা’। বৈঠকখানা ঘরের পরে উঠান। তার পাশে পাকা ঘর, টানা বারান্দার পাশে পরপর চারটে ঘর, উল্টোদিকটাতে রান্নাঘর, পাশে ভাড়ার ঘর। দক্ষিণদিকে কলতলা। বাঁধানো কুয়ো। পাশে বাঁশের দরমা দেওয়া বাথরুম। বছর পাঁচেক আগে যতীনবাবু উদ্যোগ নিয়ে কুয়োটা বানিয়েছিলেন। তাপসের বেশ মনে আছে। কিশোরগন্জ থেকে মিস্ত্রি এসেছিল আর গরুরগাড়ীতে করে রিং। সেগুলো একটার পর একটা মাটি খুড়ে বসান হল। ভাই বোনের রোজ স্কুল থেকে ফিরে কুয়ো খোড়া দেখত, মনে অবাধ বিষ্ময়, মাটির তলা থেকে জল বেরোবে। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে তাপস কয়েকবার দক্ষিণপাড়ায় রামায়ণ পাঠ শুনতে গিয়েছে, কেদার চক্রবর্তীর বাড়ীতে। সেখানে শুনেছিল মাটির তলা দিয়ে ফল্গু নদী বয়ে গিয়েছে। কুয়ো খোড়ার সময় তাপসের ধারণা ছিল নিশ্চয়ই তলা দিয়ে সেই ফল্গু নদীর ধারা। পনের বিশ হাত খোড়ার পর যখন জল পাওয়া গেল কুয়োর ভিতরে, তখন সব ছোটদের কি আনন্দ।বাঁশ কেটে দুদিকে লাগিয়ে, তাতে আড়াআড়ি আরেকটা বাঁশের টুকরো লাগিয়ে কপিকল লাগান হল। তারপর দড়িতে বালতি বেধে জল তোলার বন্দোবস্ত।
তাপস আর তার ছোটপিসি লতিকার মধ্যে খুব ভাব। লতিকা, তাপসের থেকে বছরদুয়েকের বড়। ছোটবেলায় দুজনে একসঙ্গে সাঁতার কাটা শিখেছে, ধনকাকার কাছে।নিজের দুই বোন, আরতি ওর থেকে বছর তিনেকের আর মিনতি বছর সাতেকের ছোট। বড়দাকে, আরতি, মিনতি বেশ সমীহ করে। দাদার থেকে যেন গুরুজনই বেশী। ধনকাকা তাপসের বাবার ভাইদের মধ্যে কিছুটা ডানপিটে। একবার ধনকাকা তাপসকে নিয়ে গিয়েছিল কাঁচামাটিয়া নদীর পাড়ে। ধনকাকা অক্লেশে নদীর এপার ওপার করে ফেলল। তাপস মোটামুটি সাঁতার জানে। তবে সাঁতরে নদী পারাপার তার কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। স্থানীয় বিল থেকে নদীটি উৎপন্ন হয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এ নদী দিয়ে ঈশ্বরগঞ্জ,আঠারবাড়ী ও উচাখিলা এলাকার ব্যবসায়ীরা নৌকায় পণ্য আনা নেওয়া করে। এ অঞ্চলটি অধিক পরিমাণে পাট উৎপন্ন হয়। আর এসব পাট দেশের বিভিন্ন স্থানে এই নদী দিয়ে নৌকায় করে পাঠানো হয়।
বাসায় ঢোকার আগে সবার প্রথমে দেখা গোরা কাকার সঙ্গে। বৈঠকখানা ঘরের লাগোয়া তার একটা মুদীখানা সহ স্টেশনারী দোকান। ছোটখাট রোজকার জিনিষও পাওয়া যায়। গোরা কাকা যতীনবাবুর ঠিক পরের ভাই । গোরাকাকা সাধাসিধে লোক। কাউর সাতেপাচে থাকেন না। যতীনবাবুই দোকানটা করে দিয়েছেন। যতীন বাবুর সেজ-ভাই হচ্ছেন নরেন্দ্র মোহন, তাকে তাপস ডাকে সুন্দর কাকা বলে। সৌম্যকান্তি, ফরসা লম্বা চেহারা। উনি পাশেই জ্ঞনদা সুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ের হেড মাস্টার।বড়কাকা তখন ব্যস্ত খদ্দের সামলাতে। পলায় করে সর্ষের তেল ঢালছেন একটা ছোট বোতলে। গরীব লোকেরা দুই তিনদিন অন্তর এক আনা-দু আনার তেল নিয়ে যায়। একসঙ্গে সারা মাসের তেল কেনার ক্ষমতা তাদের নাই।
বাড়ীতে ঢুকেই প্রথমে প্রণাম পর্ব। বড় মা, মা, কাকামনি দের প্রণাম করে । বাবা দুপুরে খেতে আসেন দেড়টা নাগাদ। ছোট ভাই আশিস সবে একবছরের। রায়বাড়ীর বাকি সন্তানদের মত সেও খুব ফরসা। কোমরে ঘুনসিতে একটা তামার পয়সা বাধা।তাপস তারজন্য একটা ঝুমঝুমি কিনে এনেছে। তাকে একজায়গায় কিছু একটা নিয়ে বসিয়ে দিলে আপনমনে খেলতে থাকে। ঝুমঝুমি পেয়ে সে খেলায় মশগুল হয়ে পড়ল। তাপস আজ পুকুরে স্নান করবে ঠিক করেছে। হোস্টেলের পাশে বড় ঝিল আছে। বছরদুয়েক আগে সেখানে জলে ডুবে একটি ছাত্র মারা যায়, তারপর থেকে ঝিলে সাতারকাটা বন্ধ। জমিদারবাড়ীর আশেপাশে বেশ কয়েকটা বড় পুকুর। পুকুর না বলে দিঘী বল্লেই মানায় বেশী। জমিদার বাড়ীর অন্দরমহলের পিছনেও এক বিশাল দিঘী। চার কোনে চারটে ঘাট। জমিদার বাড়ীর মহিলা, রায়পরিবারের নহিলারা, সবারই স্নানের জায়গা পূর্বদিকের ঘাট। উত্তরের ঘাট টা ব্যবহার হয় এই দুই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জন্য। এই পুকুরে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ। যাওয়ার অবশ্য কোন উপায়ও নেই। কারণ পুকুরের তিন দিকেই পাঁচিল । জমিদার বাড়ীর দিকটা খোলা। শুধু রায়পরিবারের লোকজনেদের যাওয়ার জন্য পাচিলের গায়ে একটা দরজা। যতীনবাবুর ভিটেবাড়ী ওই পাঁচিল লাগোয়া। তাপস অবশ্য আজ ভিতরের পুকুরে গেল না। কয়েকজন পরিচিত ছোটবেলার বন্ধু আশেপাশে থাকে। তারাও স্নান করতে আসে কালী মন্দির, জগদ্ধাত্রী মন্দিরের পাশের পুকুরটাতে। মায়ের মন্দিরের পাশে বলে, এর নামকরণ হয়েছে ‘মায়ের বাড়ীর পুকুর’। ওই পুকুরে ঘাটের পাশে একটা বড় কাঁঠাল গাছ আছে। সেটার দুটো ডাল ঝুকে আছে পুকুরের উপরে। সেখান থেকে পুকুরে ঝাপ মারতে খুব মজা। সুবিমল আর মানিক, দুই বন্ধুর সঙ্গে পুকুরঘাটে দেখা। সুবিমল, ব্রাহ্মণ পাড়ার বিপিন মোহন চক্রবর্তীর বড়ছেলে। মানিকের বাবা কাছারীবাড়ীর বেতনভুক কর্মচারী। তিনজনে মিলে বেশ কিছুক্ষন পুকুরে দাপাদাপি করে বাসায় ফিরল।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ৫
দুপুরের খাওয়া দাওয়া হয় বাড়ীর দাওয়াতে। প্রথমে ছোটরা, তারপর কাকু, বাবা স্থানীয়রা, সবচেয়ে শেষে বাড়ীর মহিলারা। মাটিতে পিড়ি বা চাটাইতে বসেই আহার পর্ব চলে। সবার খাওয়ার কাঁসার তৈরী থালা, গ্লাস আলাদা। প্রত্যেকটাতে আলাদা আলাদা করে সবার নাম লেখা। তাপসের মায়ের কাজের বিরাম নাই। কয়েক মাস হল রান্নার উড়িয়া বামুন পাচু ঠাকুর সেই যে দেশের বাড়ী থেকে ঘুরে আসবে বলে গিয়েছে, তারপর আর তার পাত্তা নেই। অগত্যা পূজার সময়টা ঠিকে কাজের মেয়ে, মালতীকে সারাদিনের জন্য রেখে নিয়েছেন। নিরামিষ হেঁসেলটা বড়মা মানে মনোরমা দেবী সামলে নেন। রজনী মোহন, অর্থাৎ যতীনবাবুর বাবা বছর দশ বার আগে দেহত্যাগ করেছেন। এখনকার আঠারবাড়ীর জমিদার প্রমোদ রন্জন রায় তারই মামাতো ভাই। বিগত জমিদার স্বর্গীয় মহিম চন্দ্র রায়, পুত্র সন্তান না থাকার কারণে প্রমোদ রন্জনকে দত্তক নেন। রজনী মোহনের প্রথম পত্নীর একই সন্তান, তিনিই যতীন্দ্র মোহন, তাপসের বাবা। প্রথম পত্নী বিয়োগের পর রজনী মোহন দ্বিতীয় বার দারপরিগ্রহ করেন। সেই পক্ষে তার তিনটি সন্তান, বড়জন বীরেন্দ্র মোহন, তার পরেরটি মেয়ে, নাম প্রতিভা, তার পরের জন নরেন্দ্র মোহন, ডাক নাম ‘সুন্দর’। দ্বিতীয় স্ত্রী বিয়োগের পর তৃতীয় স্ত্রী মনোরমা, যাকে সবাই বড় মা বলে। তিনি তাপসকে ডেকে বল্লেন-‘আয় ছ্যামরা, তোর জন্য থানকুনি পাতা দিয়া শুক্তো বানাইছি’। বড়মা জানেন তাপস জন্মইস্তক পেটরোগা। তায় আবার ছোটবেলায় মাঝে মাঝে ম্যালেরিয়া ধরত। তখন তাপসের কাপুনি দিয়ে জ্বর আসত। স্কুল যাওয়া বন্ধ। বেশী জ্বর হলে লেপ কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে হত। তখন নিদান ছিল কুইনিনের বড়ি। তাপস কোনমতে নাকটিপে খেত, কারণ ঔষধটা ছিল খুব তেতো। পরের দিকে আরেকটা ঔষধ বাজারে আসে, সেটার নাম ছিল ক্লোরকুইন। বর্ষাকাল হলেই তাপসের পেটের ব্যামো। ওর জন্যই বাসাতে খাওয়ার জলে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট মেশাতে হয়, বর্ষাকালে জল ফুটিয়ে খাওয়া হয়। এইসব কারণে তাপস পেটরোগা তো বটেই, গায়েগতরেও রোগা পাতলা। ছোটবেলায় সিথি কেটে চুল আচড়াত, আজকাল কলেজে গিয়ে সে ব্যাকব্রাশ করে চুল আচড়াতে শিখেছে।
আজ বিকালে প্রতিভা মানে রজনী মোহনের বড়কন্যা, তার শ্বশুরালয়, নেত্রকোনা উপজেলার বারহাট্টা গ্রাম থেকে, ছেলেপুলে সহ আসার কথা। তার স্বামী, দিগিন্দ্র চন্দ্র ঐ অঞ্চলের বড় ডাক্তার। তার ওখানে খুব পসার, আশেপাশে গ্রামের কাছে তিনি সাক্ষাত ধ্বনন্তরি। তাছাড়া তার বাসাতেও পূজা হয়। তাই তিনি স্ত্রী সন্তানদের ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছেন। গৌরীপুর থেকে ট্রেন বদলে প্রতিভা বাপের বাড়ী পৌছে যাবেন আজই বিকালে।
দুপুরে বাসাতে পৌছানর পর বোন দুটোর কোন পাত্তা নেই। ছোটবোন তপতী মাত্র তিন বছরের। সে মায়ের কাছেই বেশী ঘুরঘুর করে। রায়বাড়ীর সব পোলাপানই শান্ত স্বভাবের। তার মধ্যে ছোট দুটো তো আরও শান্ত। সবাই প্রায় মায়ের স্বভাব পেয়েছে মনে হয়। যতীনবাবু বেশ খোলা মনের মানুষ। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মারার সময় তার উচ্চকনঠের অট্টহাসি বাসার অনেক দূর থেকেও শোনা যায়।
বিকাল হতে তাপস বেরোল ঘরের বাইরে। রাস্তার পাশে ধানখেতগুলি ঘন সবুজ। ধানগাছের শীষ বেরিয়েছে। হাল্কা হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি দুলে দুলে একে অপরের গায়ে হেলে পড়ছে। ধানের ক্ষেতের মাঝে একটা কাকতাড়ুয়া নজরে আসছে। মায়ের বাড়ীর পুকুরের পাশ দিয়ে তাপস ঢুকল দুর্গামূর্তি যে আটচালাতে তৈরী হচ্ছে সেখানে। মুকুল তার এক সহকারীকে নিয়ে ঠাকুরের রং করছে। এবারে ডাকের সাজ হবে। প্রতিমার কাপড়, গয়না সব ময়মনসিংহের দশকর্মা ভান্ডার থেকে আনা হয়েছে। তাপস মূর্তির কাজ দেখছে, এমন সময় বড়দা বলে পিছন থেকে কেউ ডাকল। তাপস ঘুরে দেখল তার বড়পিসির ছেলে রমেন্দ্র চন্দ্র সঙ্গে আরতি মিনতিকে নিয়ে এসেছে। রমেন্দ্রকে অবশ্য সবাই ডাকে হরিদাস বলে। তাপসের মনে হল, বিকালেই তো প্রতিভা পিসির ছেলেপুলে নিয় বাপের বাড়ী আসার কথা। তাহালে ওরা সবাই এসে পড়েছে। পূজাতে সব ভাইবোন মিলে খুব আনন্দ করবে। একটু পরে লতিকা পিসিও হাজির তার দুই বোনঝি কে নিয়ে। তাপস সবাইকে নিয়ে চল্ল, কাছারীবাড়ীর পূর্ব প্রান্তে জমিদারের গেস্ট হাউস। মান্যগণ্য অতিথিরা এলে ওখানেই ওঠেন। গেস্টহাউস পেরিয়ে বিশাল এক টলটলে দিঘী। দিঘীর পাড়ে কয়েকটা নারকেল আর খেজুর গাছ। স্বচ্ছ দিঘীর জলে পদ্মফুলের পাতা ভাসছে। কয়েকটা পদ্মও ফুটে আছে। এই দিঘীর নাম বাগিচা দিঘী। পদ্ম ফুল, শাপলা ফুল ফুটে পুকুরটি সবার দৃষ্টিনন্দন হয়ে থাকে, তাই এই দিঘীর নাম হয়েছে বাগিচা দিঘী। পুকুরের দক্ষিণ পাড় জমিদার বাড়ীর চিড়িয়াখানা। ছোটদের খুব আকর্ষনের জায়গা। গ্রামের লোকেরা, প্রায়শই বাচ্চাদের নিয়ে এখানে বেড়াতে আসে। এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে আকর্ষণ উদ্রেককারী দ্রষ্টব্য প্রানী হল হিমালয়ান শ্লথ বিয়ার বা ভালুক। এছাড়া একটা সজারু, একটা বনবিড়াল আর প্রচুর রকম পাখী আছে। তারমধ্যে ধনেশ পাখী, ময়ূর, ফেজান্ট আর বনমুরগী উল্লেখ যোগ্য। এছাড়া বছর তিনেক আগে একটা হাতীও জমিদার বাড়ীতে এসেছে। হাতীটাকে আনা হয়েছিল শোনপুরের পশু মেলা থেকে। হাতীর মাহুতও হিন্দুস্থানী, তার নাম রামদয়াল সিং। সেও হাতীর সঙ্গে শোনপুরের মেলা থেকে এসেছে। তার থাকার জায়গা বেড়া দেওয়া একটা স্থানে। বেড়ার বাইরে বাঁশের সিঁড়ির উপর একটা প্ল্যটফর্ম। হাতীর পিঠে হাওদা বসিয়ে তার উপর বসার জন্য ঐ সিড়ি দিয়ে উঠতে হয়। ওরা দূর থেকে দেখল রামদয়াল হাতীর জন্য পাতাসুদ্ধ ডাল খেতে দিয়েছে। হরিদাসের বয়স দশ। সে একটু ডানপিটে। বড়দাকে সে ধরেছে-‘রামদয়ালকে একটু বল না, হাতীর শুড়টা একটু ধরব। হরিদাসের দিদি হেনা। সে চোখ পাকিয়ে বল্ল খবরদার, পাকামি করলে এক্ষুনি মাকে গিয়ে সব বলে দেব। হাতীর শুড় নড়ছে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। হাতীর পাগুলোও মাঝে মাঝে এদিক ওদিক হেলছে। চিড়িয়াখানা ঘুরতে ঘুরতে একটু পরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সবাই মিলে বাসায় ফিরছে। লতিকা বাদ, কারণ সে গেল লাইব্রেরীতে। সুন্দর দাদা বলে রেখেছেন, মহালয়া থেকে লক্ষীপুজা পর্যন্ত, লাইব্রেরী বন্ধ থাকবে। শরৎচন্দ্রের কয়েকটা বই এসেছে। তার মধ্যে থেকে সে একটা বেছে নেবে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে, কুল বা লেবুর আচারের সঙ্গে বই পড়া তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের।
মায়ের বাড়ীর পুকুরের পাশে ডায়নামো রুম। জমিদার বাড়ী ও তৎসংল্গ্ন রাস্তাতে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত দশটা অব্দি ইলেকট্রিক আলোর জন্য জেনারেটর চালানো হয়। ঘরের দরজা খুলে জেনারেটর স্টার্ট দেওয়া হল। রাস্তাতে আলো জ্বলল। তাপসদের বাড়ীর দাওয়াটা অব্দি আলোর হাল্কা আভা থাকে। হরিদাস আগে কোনদিন ইলেকট্রিকের আলো দেখে নি। তার চোখে অপার বিষ্ময়। সে চিরকাল হ্যারিকেন নয়ত কুপির আলো দেখে এসেছে। সে সব জ্বালতে কেরোসিন লাগে। কিন্তু এখানে কেমন তারের মধ্যে লাগান লাইট বিনা তেলে জ্বলছে। বড়দাকে তার প্রশ্ন- ‘ বিনা তেলে কি করে আলো জ্বলছে’? তাপসও অত জানে না। তাহালেও সে ছোট ভাইয়ের সামনে বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বল্ল-‘ঔ যে ডায়ানামোর পাশে তেলের ট্যাঙ্কি দেখতাসস না। হেইডা থিক্যা তেল, তার এর মধ্যে দিয়া লাইটে যাইতাসে’। বছর তিনেক পরে, তাপস যাদবপুর ইন্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তে গিয়ে আসল জিনিষটা জানতে পারে, কি করে বিজলী উৎপন্ন হয় জেনারেটর থেকে। তখন তার হরিদাসকে দেওয়া উত্তরের কথা মনে হলে হাসি পেত।
ক্রমশঃ











Comments
Post a Comment