জুতো পর্ব (রম্যরচনা)
জুতো পার্ট ১
মানুষের জীবনযাত্রায় জুতোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। রামায়নে ভরত রাজ্য শাসন করেছিলেন রামচন্দ্রর পাদুকাকে সিংহাসনে রেখে। সিন্ডারেলার রূপকথাতেও সেই জুতো হারানোর কাহিনী । সেই জুতো নিয়েই আজকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার দু চার কথা। জুতাকে বোধহয় আগেকার দিনে পাদুকা বলা হত। নামের উৎপত্তির ব্যাপারে সুনীতিবাবু বেঁচে থাকলে কিছু বলতে পারতেন। আমার মনে হয় দুইপায়ে পরতে হয়, তাই পাদুকা। আগেকার কালে মুনি ঋষিরা খড়ম পরতেন। সেটা তৈরী হত কাঠ দিয়ে। ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছি খড়ম পরতে। খড়মের সামনের দিকে কাঠের ছোট্ট ডান্ডা, অনেকটা দাবার বোড়ের মতন, উঠে থাকত। বুড়ো আঙুল আর তার পাশের আঙুলটা গলিয়ে পরতে হত। খড়ম পরে চলাটা বেশ ব্যালান্সিং এ্যক্ট বলে মনে হত। খড়ম পরে হাঁটা আর আজকাল আধুনিকা মহিলার শাড়ী পরে, পেন্সিল হিল পায়ে হাঁটা, ব্যালান্সিংএর ব্যাপারে সমগোত্রীয়। খড়ম পরে বাবা যখন ঘরের মধ্যে হাঁটত, খটাখট আওয়াজে মনে হত মিলিটারী মার্চিং চলছে। পরের দিকে খড়মে লম্বা ডান্ডাটার পরিবর্তে এল, টায়ারের কাটা অংশে লাগানো সামনের দিকে, যার মধ্যে পাঁচটা আঙ্গুল ঢুকে যেত।
এবারে নিজের কথায় আসি। খুব ছোটবেলার ঘটনা, আমার মনে নেই, মায়ের মুখে শোনা। ছোটবেলায় একটা ছড়ার বই ছিল/ সেটাতে একটা ছড়া ছিল -‘ খোকাবাবু যায়, লালজুতো পায়, সবাই ইতিউতি চায়, খোকা ফিরে না তাকায়’। সেটাতে বড় করে ছবি ছিল খোকাবাবুর এক পা ওঠানো ছবি, সেই পায়ে লাল জুতো, পিছনে এক খুকী বড় বড় চোখে দেখছে। আমার নাকি সেই ছড়ার সঙ্গের ছবিটা খুব পছন্দের ছিল।
জন্মদিনে মা আমাকে লাল টুকটুকে একটা জুতো কিনে দিয়েছিল। সেই নূতন জুতো সকাল থেকে পরে সারা বাড়ী ঘুরে বেরিয়েছি। রাতে খাওয়ার সময় থেকেই, মা আমার জুতো খোলানোর চেষ্টা করছিল। আমি নাকি কান্নাকাটি করে সেটা খুলতে দিই নি। ঘুমের আগেও শতচেষ্টাতেও মা জুতো খোলাতে পারে নি। এহেন জুতোপ্রীতি একটু চিড় খেল নার্সারীতে পড়ার সময়। স্কুলে যাওয়ার সময় মা অথবা বাবা জুতোর লেসটা বেধে দিত। সঠিক বাংলাটা জানি না, তবে আমরে একটাকে বলতাম ফস্কা গেরো, অন্যটা ফুলবাধা। নার্শারীতে আবার বাধ্যতামূলক ছিল, দুপুরে ঘুম, সেজন্য আলাদা তোষক,বালিশ, চাদরও থাকত স্কুলে। জুতোটা খুলেই শুতে যেতে হত। মুস্কিলটা ছিল, আমি লেসটা খুলে জুতো খুলতে পারতাম, কিন্তু জুতো পরে আর ফিতে বাঁধতে পারতাম না। মানে সেই অনেকটা অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেদ করা জানার মত, বেরিয়ে আসার গূড় তথ্যটা অভিমন্যু জানত না। ফলে লেস না বেঁধেই ফিরতাম। মা আমাকে কয়েকবার শিখিয়েও দিল, কিন্তু প্রত্যেকবারই উল্টোপাল্টা করে ফেলতাম। সমস্যাটা নিজেই সমাধান করলাম, আরেকটা বাচ্চাকে দিয়ে, সে আমার সঙ্গেই পড়ত। সে জানত লেস বাঁধাটা, তবে এরজন্য তাকে টিফিনের ভাগ দেওয়াটা জরুরী ছিল। এটাকে ঘুষ দেওয়ার প্রথম পাঠ বলা যেতে পারে। জুতো পরে ইস্কুল যাওয়ার ইতি, প্রাথমিকের গন্ডী পেরোনোর পর। হাইস্কুল, অর্থাৎ ক্লাস ফাইভে ওঠার পর থেকে নিজেকে বেশ বড় বড় ভাবতে লাগলাম, চটি পরে যাতায়তে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। কখনও সখনও হাওয়াই চপ্পল ও চলত। টাইমও সেভ হত কমসে কম পাঁচ মিনিট।
ছোটবেলায় দুর্গাপুজার আগে নূতন জামা কাপড়ের সঙ্গে একজোড়া বাটার জুতো আর ছোটদের দেব সাহিত্য কুটীরের শারদীয়া পূজাসংখ্যা অবশ্যপ্রাপ্তির তালিকায় থাকত। ‘নিহারীকা’,‘মনিদীপা’, ‘বেণুবীণা’ এরকম সব নাম ছিল বইগুলোর। প্রথমেই একনিশ্বাসে ‘নন্টেফন্টে’ আর ময়ূখ চৌধুরীর ছবিতে রোমাঞ্চ সিরিজ পড়ে ফেলতাম। এবার বাটার কথায় আসি। জুতো বল্লে বোঝাত ‘বাটা’, আর হাওয়াই চপ্পল মানে ‘অজন্তা’।
পূজার মাসখানেক আগে থাকতেই খবরের কাগজে পুরো পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন থাকত বাটা কোন্পানীর।
পুজোতে নূতন জুতো পড়ার আনন্দের সাথে সাথে, গোলাপের কাঁটার মত একটা বেদনাদায়ক ব্যাপারও থাকত। না, সেটা হৃদয় বেদনা নয়, যাকে তৎকালে জুতোর সুকতলার সঙ্গে তুলনা করে ‘প্রেমের হাফসোল’ বলা হত। এটা ছিল শারীরিক বেদনা। তখনকার দিনে সন্ধ্যের পর পায়ে হেটে নূতন জামা-জুতো সহযোগে পাড়ায় পাড়ায় ঠাকুর দেখার রেওয়াজ ছিল। ষষ্ঠী ও সপ্তমীর দিন কাটিয়ে, অষ্টমী, নবমীতে ল্যাঙচাতে হত, কারন তখন পায়ের গোড়ালিতে ফোস্কা পড়ে যেত।
তখন ঝাড়গ্রাম ছিল একটা মফস্বল শহর, লোকসংখ্যা বেশ কম, রাজার বদান্যতায় পাওয়া জমিতে স্কুল, কলেজ ইত্যাদির বেশ প্রাচুর্য। একটা সরকারী কলেজ, সরকারী পলিটেকনিক, বি টি কলেজ, আই টি আই এবং অসংখ্য স্কুল। কেউ বাজারে গেলেই, দোকানীরা বলত-‘মাস্টারমশাই আসুন, আসুন’, তা তিনি মাস্টার হোন কি না হোন। বাজারের মেন রাস্তার পাশে দুদিকেই দোকান, জামা কাপড়, সাইকেল, মনিহারী, মিষ্টি ইত্যাদিই বেশী। তারমধ্যে সবচেয়ে আলোকিত, সুন্দর কাচের শোকেস দিয়ে সাজান হচ্ছে বাটার শোরুম। সবচেয়ে মজার ছিল ভিতরে সব টাই-পরা সেলসম্যান। ছোটবেলায় ছবি দেখে জানতাম, টাই পরে সাহেবেরা, অথবা দেশী অফিসের বড়কর্তারা। বাবারও একটা সুট ছিল, দুই একবারই পরতে দেখেছি, যখন অফিসিয়েটিং প্রিন্সিপাল ছিল পলিটেকনিকের, তারপর একবার কলকাতায় ‘ব্যান্ডবক্স’ বলে একটা দোকান থেকে ড্রাই ক্লিনিং করিয়ে আনার পর সেই যে আলমারীতে উঠল, আর কোনদিন বার হয় নি।
জুতো পার্ট ২
যাক, যে কথায় ছিলাম, বাটার দোকানের আশেপাশের দোকানদার বেশীরভাগ ধুতি, পান্জাবী পরা, নেহাত সাদামাটা বাঙালী। বাঙালীর দ্বারা বিজনেস হয় না, এটা অধিকাংশ জায়গায় প্রযোজ্য, ব্যাতিক্রম অবশ্যই আছে। শাড়ী কিনতে গেলে প্রথমেই শোনা যেত-‘কি রকম দেখাব-সুতী না তাত, ছাপার না সাদা জমি, হাল্কা রং না ডিপ রং, সবশেষে কি রকম দামের মধ্যে। এতসব জেনে নিয়ে তবে শাড়ী বের হত আলমারি থেকে। তখনও ‘কাস্টমার ইজ দি কিং’, কনসেপ্টটা বাজারে আসে নি। অথচ এ ব্যাপারে মাড়োয়ারী দোকানদারেরা বরাবরই তুখোড়। মেন রাস্তা থেকে দূরে, গলির মধ্যে দুটো মাড়োয়ারীদের শাড়ীর দোকান ছিল। নামগুলো ছিল মজার, -‘বিজয় রতন-বিনোদ কুমার’ আর অন্যটা ‘রামজীবন রামচন্দ্র’ । যদিও বাঙালী শাড়ীর দোকানের থেকে ঢের দেরীতে খুলেছিল, কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি পপুলার হয়ে গেল। দোকানে গেলেই, প্রথমেই মধুর স্বরে আহ্বান-‘ আইয়ে দিদি, আসুন বসুন’ দিয়ে শুরু হত, পরের দিকে জল-চা, সবই আসত। আর শাড়ী দেখাতে কোন কার্পণ্য ছিল না। দেখতে দেখতে সামনে শাড়ীর পাহাড় হয়ে যেত। শাড়ী যারা দেখাত তারাও ছিল এক্সপার্ট, কাঁধের উপর দিয়ে আঁচলের মত করে ধরে থাকত। বঙ্গললনাদের শাড়ীর প্রতি দুর্বলতার কথা কে-না জানে, তাই একবার দোকানে ঢুকলে শাড়ীর পাহাড় থেকে চয়েস করে কিনতে ঘন্টা কাবার। যেটা বলার জন্য এত গৌরচন্দ্রিকা, সেটা হল, বাটার সেলসম্যানেরাও ছিল প্রশিক্ষিত ও দক্ষ। প্রথমেই একটা ইনক্লাইন্ড টুলের মত জিনিষে পা রেখে মাপ দিতে হত, কারণ প্রত্যেক বছর পা বড় হত। এবার জুতো এনে গোড়ালিতে শ্যু হর্ন লাগিয়ে, জুতো গলিয়ে, একটু হেঁটে ট্রায়াল দিতে হত। বাবা আবার রক্ষণশীল লোক। সঙ্গে করে তুলো নিয়ে আসত। সেটাকে জুতোর ভিতর লাগিয়ে, আমি জুতো পরে দেখতাম। কারণটা আর কিছুই নয়, এক সাইজ বড় নিতে হবে, যাতে বেশীদিন চালানো যায়। তবে যে ব্যাপারটা কষ্টদায়ক ছিল, সেটা হচ্ছে, খুব উৎসাহের সঙ্গে নূতন জুতো জামা পরে ঠাকুর দেখতে বের হতাম আর নবমীর রাত থেকে ল্যাংচাতে হত, কারণ, অবশ্যম্ভাবী ভাবে পায়ে ফোস্কা পড়ত। যেটা হাই লাইট করার জন্য এত কথা, সেটা হচ্ছে, বাটার দোকানে টাই, প্যান্ট পরা লোক আমার পায়ে হাত দিচ্ছে। ব্যাপারটাতে মনে বেশ বিস্ময় জাগত।
এর পরে যে ঘটনা লিখছি তাতে জুতো থুড়ি চটির বেশ যোগাযোগ। তখন স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। দুটো ক্লাসের মাঝে খানিক বিরতি। আমার বন্ধু সুরজিৎ আমার চুল টেনে পালাচ্ছে, আর আমিও পিছনে দৌড়চ্ছি ওকে পেটাব বলে। ক্লাসের দুদিকেই ছিল দরজা। বাদিকের দরজার বাইরে দিয়ে করিডোর, ডানদিকের দরজা থেকে নামলে, কিছুটা ফাঁকা জায়গা, তারপর বেশ কিছু শালগাছের জঙ্গল। অনেকগুলো ক্লাসরুম পরপর। করিডোর দিয়ে দৌড়ে, সব ক্লাসরুম পাক দিয়ে এসে, দেখি, সুরজিৎ ডানদিকের দরজা দিয়ে আবার পালাচ্ছে। আমি দেখছি ধরা মুস্কিল, কি আর করি, শেষ প্রতিশোধের উপায় হিসাবে, পা থেকে চটি খুলে মেরেছি। ব্যাপারটা দাঁড়াল কিছুটা কয়েকদিন আগে ঘটা ইরানের মিসাইল এট্যাকের মত। ভুল করে একটা যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হয়ে গেল। এখানেও ব্যাপারটা কিছুটা ঐ রকম গোছের হল। সুধাংশুবাবু ঢুকছিলেন ক্লাস নিতে। দুদে মাস্টারমশাই। সবাই খুব ভয় পেতাম। জুতো লক্ষভ্রষ্ট হয়ে সোজা স্যারের কপালে। আমার তো ধরণী দ্বিধা হও, গোছের অবস্থা। কালপ্রিট ধরতে কোন অসুবিধা হল না, কারণ অন্য পায়ের অন্য চটির সঙ্গে মিলিয়ে আমি অপরাধী শনাক্ত হলাম। সবচেয়ে হিউমিলিয়েটিং শাস্তিটাই পাওয়া গেল, কানধরে দরজার বাইরে নিলডাউন। অন্য ক্লাসের ছেলেরাও বেশ ঘুরে ঘুরে দেখছে আর হাসছে। গা জ্বলে গেল। কিন্তু কি আর করা যাবে! বাড়ীতে যে কমপ্লেন যায় নি, সেটাই যথেষ্ট।
আমার পিসেমশাই থাকতেন পুরুলিয়াতে, বাবার বয়সী। বেহালাতে, দাদুর বাড়ীতে এলে দেখা হত। প্রচন্ড জুতো প্রেমী লোক। সব সময় তিন চার জোড়া জুতো থাকত বেড়াতে গেলে। জামা কাপড়ের থেকে জুতো বেশী। সঙ্গে দুরকম ব্রাশ, চেরীব্লসম আর ক্রীম। দিনে আধা ঘন্টা ব্যায় করতেন জুতো ব্রাশ করতে। বেশ অবাক লাগত, কারণ আমি বেশীরভাগ সময়ে হাওয়াই চপ্পলে টো টো। চপ্পল চলত, যতক্ষন না গোড়ালির কাছটা ক্ষয়ে যেত। অনেক সময় স্ট্রাপটা, জুতোর যে ফুটোতে গলান থাকত, সেখান থেকে বেরিয়ে আসত। তখন কিছুক্ষন সেফটিপিন দিয়ে ইমার্জেন্সী ম্যানেজমেন্ট, পরে নূতন স্ট্রাপ কিনতে হত। এ হেন আমি, পিসেমশাইয়ের জুতোর যত্নে হতবাক হয়ে থাকতাম। বেশ গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তাই জিজ্ঞাসা করার সাহস হয় নি এই জুতো প্রেমের উৎস কি।
তখন স্কুলে আমার ক্লাস টেন। বাবা কলকাতায়, দাদু খুব অসুস্থ। কয়েকদিন পর দাদুর মৃত্যুসংবাদ এল। নিকট আত্মীয়ের মধ্যে এই প্রথম এক মৃত্যু সংবাদ। সকাল সকাল টেলিগ্রাম এল। পারলৌকিক আচার বিচার সম্বন্ধে বিশেষ কোন ধারণা ছিল না। মা ভেবে চিন্তে বল্ল - নিরামিষ খেতে হবে শ্রাদ্ধ পর্যন্ত, আর খালি পায়ে থাকতে হবে। কয়েকজনকে দেখেছি, বাবা মারা গেলে, আনকোরা ধুতি আর উপরে একটা উড়নি মত জড়াতে। গলাতে বোধহয় একটা চাবি গোছের কিছু ঝোলান থাকত। খালি পায়ে থাকতে হত, আর আলুনি হবিষ্যি খেতে হত। অবশ্য সেটা তো বাবার করার কথা। সেদিন উইক ডে। মা আর আমি দুজনেই বেরোব। মা পড়াত ননীবালা বালিকা বিদ্যালয়ে। দেড় কিলোমিটার মত হাঁটা পথ। আমার তো সাইকেলে যাওয়া। বেশ সাহস সঞ্চয় করে করে দুজনেই খালি পায়ে বেরোলাম। মায়েরই বেশী কষ্ট। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস নেই। যাক এ ভাবে দুই তিন দিন গেল। বাবা হঠাৎ কোন খবর না দিয়ে, রাতে তিনদিন পরে স্টীল এক্সপ্রেসে ফিরল। আমি আর মা তো বাবাকে দেখে অবাক, জুতো, প্যন্ট, শার্ট সবই পরে আছে। কে বলবে বাবার অশৌচ চলছে। অতএব পরের দিন থেকে আমি আর মা আবার জুতো গলিয়ে গেলাম। বাবা চিরকালই একটু নাস্তিক গোছের ছিল। বারান্দায় উবু হয়ে বসে পেপার পড়ত। হাওয়াতে যদি পেপারের একটা কোনা উঠে যাবার চান্স থাকত, তবে বাবা হাওয়াই চপ্পলটাকে পেপার এয়েটের মত করে কাগজের উপর রাখত।
তখন কলেজে পড়ি। ক্লাস নাইনে আমার হাইট ছিল সাড়ে পাঁচ ফিট। সবাই বলত, বেশ লম্বা তো। কিন্তু তারপর থেকে শনির দশা। মেরে কেটে পাঁচ সাতে গিয়ে লম্বার দৌড় শেষ। তাই কলেজে উঠে ভাবলাম, হিল দেওয়া শু পরব।আমার মাসতুতো দাদা, মেজদা বলতাম, ফ্যাশনের ব্যাপারে আমার মেন্টর ছিল। মেজ-দাদা র হাইট পাঁচ ফিট, লম্বা বাবরি কান ঢাকা চুল, হিল তোলা জুতো আর বাটিক প্রিন্টের জামায়, ঠোঁটের কোলে জ্বলন্ত ওয়াইল্ড উডবাইন সব মিলিয়ে আমার চোখে দুর্দান্তে হিরো। মেজদাই খবর দিল কলকাতার চীনে বাজারে নাকি সারি দিয়ে জুতোর দোকান। হিল দুইইঞ্চির উপর হবে দামেও নাকি সস্তা।চীনে দোকানের কথা শুনে মনে পড়ে গেল, কোন একজনের লেখায় পড়েছিলাম, চীনে দোকানদারের অপূর্ব ইংরেজী, বাংলার মিশ্রণে খদ্দেরের জন্য ডাকাডাকি-‘কাম, কাম, টেক তো টেক, নো টেক তো নো টেক, একবার তো সি’। একদিন গেলাম বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের এক চীনে দোকানে। দরাদরি করে, একটা আড়াই ইঞ্চি হিলের জুতো কিনলাম। দামটাও মনে হল বাটার জুতোর থেকে কম। জুতোর ওয়েট নিয়ে সম্যক ধারণা ছিল না। প্রথম কয়েকদিন মহা আনন্দে সেই জুতো পরে ঘোরাঘুরি করলাম। পরে সেই ভারী জুতোর কারণে পায়ে ব্যাথা শুরু হয়ে গেল। ডাক্তার বল্ল, বর্ষাইটিস হয়েছে, হাল্কা জুতো পরতে হবে। তারপর থেকে চাইনিজ জুতো বাক্সবন্দী হয়ে, ঝাড়গ্রামের বাড়ীর চিলেকোঠায় স্থান পেল।
তখন সি আর পার্কে থাকি, অফিস নেহেরু প্লেসের হেমকুন্ট টাওয়ারের নয় তলায়। ব্যাচেলর লাইফ। রাত অব্দি খুব আড্ডা হয়। সকালে ঘুম ঘুম চোখে বেরোতাম সাইকেল নিয়ে। একদিন গিয়েছি অফিসে চপ্পল পরে। আমরা সব ইন্জিনিয়াররা একটা রুমে। রুমের মধ্যে একটা কেবিন তাতে বস মানে কাপুর সাহেব বসেন। ঢুকেছি সাহেবের রুমে কোন একটা কাজের ব্যাপারে। সাহেব দেখি ভুরু কুচকে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে। নিজের নজর গেল পায়ের উপর। ও হরি, হাওয়াই চপ্পল দুই পায়ে দুই কালারের। মানে একটা আমার আর অন্যটা রুমমেটের চপ্পলের। ছেড়ে দে মা, কেদে বাঁচি গোছের ব্যাপার। কাপুরসাহেব নিজেও খুব একটা ড্রেস কনশাস নন, বেশীরভাগ সময় একটা সাদা শার্ট, কলারের কাছে ফাটা, আর ব্লু কালারের স্ট্রাপ কাঁধের কাছে, অনেকটা নেভী অফিসারদের মত, সেটার বোতাম ছেড়া।তবে জুতো পরে আসতেন অফিসে । বসের এই ড্রেস, আর আমাদের টাইপিস্ট কক্কর শীতকালে স্যুট, টাই পরে আসত। বসের কাছ থেকে সেদিন উপদেশ পাওয়া গেল- রায়, শুনো, তুম কোম্পানিকা ইন্জিনিয়ার হো, বাহার সে কিতনে ভেন্ডার মিলনে আতে হ্যায়, সু পহনা করো, এয়সা চপ্পল নেহি চলেগা, উহ ভি দো কালার কি। কি আর করি, ঘাড় নেড়ে ফেরত এলাম।
জুতো পার্ট ৩
৯৬ কি সাতানব্বই সালের ঘটনা। বাচ্চারা ছোট। গিয়েছি বেনারস বেড়াতে। শীতকাল,বড়দিনের ছুটি। দিল্লী থেকে এসেছি। বেনারস ঘুরে যাব কলকাতায়। বিশ্বনাথের মন্দির দেখতে গিয়েছি, তখন বেশ সকাল। মন্দিরের গলি তো বিখ্যাত। পূজা সামগ্রী বিক্রির দোকান থেকে হাঁকাহাকি করছে প্রসাদ কেনার জন্য। যেখান থেকে কিনব, সেখানে নাকি জুতো রাখা যাবে। আমার বদঅভ্যাস হচ্ছে লোক সাধারনত যা করে থাকে, তার থেকে কিছু হটকে করার। জুতো খুললাম একেবারে মন্দিরের সামনে। ভাবলাম এত সকালে কি আর জুতো চোরেরা বিজনেস শুরু করেছে। কিন্তু বিধি বাম। বেরিয়ে দেখি জুতো হাওয়া। কি আর করি, খালি পায়ে এলাম ঘাটে। বাচ্চারা বায়না ধরেছে নৌকায় ঘুরবে।সারাদিন প্রায় খালি পায়ে কাটল। ট্রেনে শুনেছি খুব জুতো চুরি হয়। তাই এখনো ট্রেনে উঠলে, প্রথমেই জুতাজোড়াকে সীটের সবচেয়ে ভিতরের জায়গায় সিকিওরড রাখি।
ঝাড়গ্রাম থেকে টাটানগর ট্রেনে দুঘন্টার রাস্তা। স্কুলে পড়তে, জামশেদজী টাটার নাম খুব শুনতাম। কেমন একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল, বাটা নিশ্চয়ই টাটার ভাই হবে। অনেকদিন পর্যন্ত ধারণাটা বহাল ছিল। পরে জানলাম বাটা অরিজিনালি চেক রিপাবলিকের, পরে ১৯৬৪ তে হেড কোয়ার্টার চলে যায় কানাডাতে। ৭০রের দশক অব্দি আমাদের দেশে বাটার একছত্র আধিপত্য ছিল, পরে সেটা বেশ কমে যায়, রিল্যাক্সো, লিবার্টি ইত্যাদি দেশীয় কোন্পানিগুলো আসার পর। এখন বাটা আবার স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত।
জুতো নিয়ে এই ঘটনাটা আমার এক ক্লাসমেট, শুকদেবের মুখে শোনা। সে চাকরীসূত্রে অনেক বছর ধরে কুয়েতে আছে। পৃথিবীর যে কোন শহরে গেলে, বাঙালিদের এক বড় কমিউনিটি তৈরী হয়, তৎসঙ্গে দুর্গাপুজা, পচিশে বৈশাখ প্রভৃতি নিয়ে মিনি বেঙ্গল হাজির। নূতন কেউ এলে সেও খুজে পেতে কয়েকদিনের মধ্যে ক্লাবের মেম্বার হয়ে যায়।কুয়েতেও তার অন্যথা নেই। তা সেরকমই কোন পূজাতে ৩০-৩৫ জনের জমায়েত। বীরেনদা সেই বাঙালীসমাজের প্রাণপুরুষ। সত্তরসাল থেকে কুয়েতনিবাসী,সব বাঙ্গালি একডাকে চেনে, সব কাজেই এরকম উৎসাহী লোক কমই পাওয়া যায়। যাক পূজো হল,তারপর ভোগপ্রসাদ খেয়ে বীরেনদা আর নিজের জুতো খুঁজে পান না। সদ্য কলকাতা থেকে, বাটাব টপ ব্র্যানড হাস পাপিস কিনে এনেছেন। দামটাতো একটা ফ্যাক্টার বটে, তার থেকেও বড় সদ্য এসেছেন দেশ থেকে, ফট করে যে নূতন একটা কিনে ফেলবেন সে উপায়ও নেই। দামীজুতো, আতিপাতি করে খুঁজলেন, না নেই। বীরেনদা বরাবরই নাছোড়বান্দা। বৌদি তাড়া দিচ্ছেন চল-চল। মহিলমহলের গল্প শেষ। অন্য সময় হলে বীরেনদা তাড়া লাগান। আজ উল্টো। প্রায় সবাই চলে যাওয়ার পর দেখা গেল, ঐ রকম দেখতে, একটা বেশ পুরানো জুতো পরে আছে। বীরেনদা কি আর করেন। খালি পায়ে যাওয়ার থেকে যা পাওয়া যায় তাই সই ভেবে সেটাই পরে ফিরলেন। সাইজটা একটু বড় এই যা। পরের দিন থেকে অদম্য উৎসাহে লেগে পরলেন হারানিধি খুঁজে বার করতে। লিস্ট বানিয়ে ফেল্লেন,যারা যারা উপস্থিত ছিল সবার। এবার জনান্তিকে ধরে ধরে ফোন। আশা ছিল, এই আ্যকশানে কাজ হবে। কিন্তু শেষব্যাক্তি অব্দি ফোন করেও জুতো রহস্যের কিনারা হল না। প্রাপ্ত জুতোটা একসাইজ বড়। কী আর করেন, সামনে তুলোর প্যাকিং দিয়ে পুরোন জুতোতেই চালাতে লাগলেন। বীরেনদার জুতো হারিয়ে গেছে, এটা তখন বাঙালি মহলে জোর খবর। বেশ হাসাহাসিও চলছে। বেশ দশ বারোদিন পরে, আরেক বঙ্গসন্তান শ্যামলদা ফিরলেন ট্যুর থেকে। শ্যামলদা মাঝে মাঝেই ট্যুরে যান। ফিরতেই বৌদির প্রশ্ন- তুমি পূজোর ফাংশানে গিয়েছিলে না? শ্যামলদা মাথা নাড়লেন। ‘নিশ্চয়ই তুমি বীরেনদার জুতো পরে গিয়েছ- নিজের জুতোটা পর্যন্ত চেন না’। শ্যামলদা জিভ কেটে বল্লেন- এ মা তাই তো, তাই ভাবি, জুতোটা টাইট লাগে কেন, ফোস্কাও তো পড়েছে’। যাক এবার শ্যামলদার পালা, জনে জনে সবাইকে ফোন করে জানালেন তিনিই কালপ্রিট। লোকজন কি আর ছাড়ে, জুতো ফেরতের অনন্দে শ্যামলদা বীরেনদা যৌথ পার্টি থ্রো করলেন।
অবশ্য সব পরিনতিই যে এরকম মধুর হয় তা নয়। এই ঘটনাটাও আমার কলেজের এক ক্লাসমেটের কাছে শোনা।
কোন এক বছর, তখন আমার বন্ধু, নাম অপূর্ব, তার কাকীমা ও তার বোনকে নিয়ে পূজার বাজারের পর গেছে জুতো কিনতে সেই বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের চৈনিক জুতোর দোকানে।অপূর্ব সবে কলেজে উঠেছে। কলকাতার অনেক জায়গায়ই চেনা। পূজার বাজার সোদপুরেই করে থাকে বাড়ীর সবাই। অপূর্ব বেশ বড়মুখ করে ওদের নিয়ে এসেছে, খোদ কলকাতার নামকরা জুতোর পাড়া থেকে জুতোর বাজার করে দেবে।কেনাকাটার পর মূষলধারে দুঘন্টা বৃষ্টি, রাস্তা ঘাটে জল থৈ থৈ। হাতে টানারিক্সায় কোনোরকমে শিয়ালদা এসে মনে হলো যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তখনই মাসি বলল জুতোর ব্যাগ কই? সেটা যে কখন সবার অজান্তে রাস্তার জলে পড়ে গেছে কেউ টের পায় নি। তিনজনের পূজোর জুতোই জলাঞ্জলি।
অপূর্বর আর এক গল্প। তখন সে হরিদ্বার বি এইচ ই এল এ পোস্টেড।বছরে দুবার দুন এক্সপ্রেসে দু'রাতের জার্নি করে হরিদ্বার থেকে কলকাতা আসে। দ্বিতীয় রাত কাটার পর থেকেই মনে খুব আনন্দ। সেদিনও মনের আনন্দে ভোরবেলা ব্যান্ডেল নেমে নৈহাটি হয়ে সোদপুরের লোকাল ট্রেনে বসে আছে। ভোরের ট্রেন বেশ ফাঁকাই ছিল। কিন্তু আশেপাশের লোকজনকে দেখে একটু সন্দেহ হলো। সবাই, বিশেষ করে মুখোমুখি বসা মর্নিং কলেজ যাত্রী দুই বান্ধবী, একবার তার পায়ের দিকে আর একবার মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তখন নিজের পায়ে তাকিয়ে দেখে জুতোর একপাটি কালো আর একপাটি লাল! ডিজাইনও একেবারে আলাদা। বেচারা, শেষরাতে তার পাশের ভদ্রলোক বর্ধমান নামার আগে যখন তড়িঘড়ি জুতো খুঁজছিলেন, উনি অপূর্বর কালো আর ওনার লাল পায়ে গলিয়ে নেমে গেছেন। উনিও হয়তো একইরকম বিড়ম্বনায় পড়েছেন। কি আর করা। অপূর্ব নাচার। জানালা দিয়ে বিনা কারনে আকাশ দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
দেবদত্ত ফেব্রুয়ারি ২০২০





Comments
Post a Comment