অমৃতবাণী (রম্যরচনা)


 অমৃতবাণী

অথবা মধ্যবয়স্ক ছেড়ে দিলাম, অনেক ইয়াং ছেলে মেয়েদেরও দেখেছি, কোন না কোন গুরুদেবের ভক্ত। টিভিতে ধর্ম সংক্রান্ত নানা চ্যানেল। সাধারনদের মধ্যে বেশীরভাগই বাবা রামদেবের ভক্ত। 



টিভিতে দেখি সামিয়ানা খাটানো বিশাল মাঠে হাজার হাজার নারী পুরুষ, শতরঞ্চির মধ্যে বসে, নানা রকম এক্সারসাইজ করছে। যোগগুরু, একটা লাল রংএর লেংটি পরে, দাড়ি-গোঁফ সশ্রুত মুখ থেকে যোগের উপকারিতা সম্বন্ধে বুঝিয়ে চলেছেন সংগে সংগে নানা রকম ব্যায়াম। শুনেছি এরকম অনুষ্ঠানের প্রথমদিকের সারিতে বসতে গেলে ভাল পরিমান গ্যাঁটের কড়ি ফেলতে হয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত দেখতাম,  আমাদের সোসাইটির বেশীভাগ রিটায়ার্ড লোক সামনের পার্কে বসে নাকে একটা আঙ্গুল লাগিয়ে, খুব জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে, তালে তালে পেটটা নামছে উঠছে। এটার নাম ‘অনুলোম’, ‘বিলোম’ নাকি কপালভাতি। আগে বোধহয় এটাকেই প্রানায়াম বলত। কিছুদিন পরে দেখলাম পাড়াতে বেশ বড়সড় পতঞ্জলি স্টোর। লোকে লাইন দিয়ে বিশুদ্ধ জিনিষ কিনতে লাগল, আটা,বেসন থেকে শুরু করে আ্যলোভেরা, জামুন জুস সর্ষের তেল, ঘি, কিছুই বাদ নেই। সবার কাছে শুনলাম, না এতদিন পরে বাজারে খাঁটি জিনিষ পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমদিকে বাবাজীর ক্যারিসমাতে রমরমিয়ে বিক্রি বেড়ে গেল। বড় বড় মাল্টিন্যাশানাল গুলোর মাথায় হাত। তবে অবস্থাটা বেশীদিন চলল না। বিক্রি বেশ কমে গেল, তখন বিজ্ঞাপণ আসতে লাগল শুদ্ধ খাইয়ে, খুদ বাঁচিয়ে, দেশকে বাঁচাইয়ে। এবারে গিয়ে দেখলাম সেই দোকান উঠে গিয়েছে।

রামদেব যদি সাধারণ লোকেদের যোগগুরু হয়ে থাকেন, তবে কিঞ্চিত আপার ক্লাসের গুরু হলেন সদগুরু। উনি ইংরেজীতে বোঝান। জগতের সব ব্যাপারে তার সম্যক জ্ঞান। বেশ কিছুদিন আগে দৌড়দৌড়ি করছিলেন ওয়াফত বোর্ড রামমন্দির কমিটির মধ্যে, জমিবিবাদ, কোর্টের বাইরে মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। নিজের ইমেজটা রাখছিলেন, যেন উনি সর্বধর্মের উর্ধ্বে এক মহাপুরুষ। তবে জমিবিবাদটা এত জটিল ছিল যে হালে পানি না পেয়ে, রণে ভঙ্গ দেন। এরকম আরেক গুরু আছেন, শ্রী শ্রী রবিশংকর, তার ফলোয়ারও কম নয়। তিনি আর্ট অফ লিভিং করে থাকেন। সংসারের এত ঘোরপ্যাচের মধ্যে কি আর্ট খুঁজে পেলেন কে জানে। এই দুই বাবাজীর ভক্ত দেশের থেকে বিদেশেই বেশী। 

আরো একজন নামকরা গুরু হচ্ছেন সিরিডি সাঁইবাবা। কিছুটা লালন ফকিরের মত তার ধর্ম পরিচয়। হিন্দু না মুসলিম জানা যায় না। তার ফলোয়ারের মধ্যে হিন্দু মুসলিম দুইই আছেন। তিনি আত্মার শুদ্ধি এবং জাগতিক জিনিষে আসক্ত হতে শক্ত হাতে মানা করে গিয়েছেন। সব শহরেই তার আশ্রম সিরডিতে তার যে আশ্রম আছে, অনেকই সেখানে বেড়াতে যান, সেই আশ্রমের বৈভব চোখ ধাঁধানো। বোঝাই যাচ্ছে তার ভক্তরা তার প্রচারিত বাণী এককান দিয়ে শুনে আর এককান দিয়ে বের করে দিয়েছেন। তার পরবর্তীকালে তারই রিইনকারনেশন বলে উঠে আসেন সত্য সাইবাবা। তার কুঞ্চিত  কেশরাশির জন্যই তিনি বেশী বিখ্যাত। তিনি নাকি অনেকটা-‘হাত ঘুরালে নাড়ু পাবে’র মত করে খালি হাত থেকে বিভূতি বার করে দিতেন। ম্যাজিসিয়ান পি সি সরকার, সিনিয়ার তাকে একবার চ্যালেঞ্জ জানিয়ছিলেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য সেটা সত্যসাঁই একসেপ্ট করেন নি। তখন নাকি পি সি সরকার নাম ভাঁড়িয়ে দেখা করতে যান। সাঁইবাবা শূন্যহাত থেকে সন্দেশ বার করলে প্রত্যুত্তরে উনি রসগোল্লা বার করে দেখান। তারপর কি হয়েছিল, সেটা অবশ্য জানি না।

মহিলা গুরুর কম নেই। এদের মধ্যে একজন ব্রহ্মকুমারী।আমাদের সোসাইটিতে তার এক ভক্ত মাঝে মাঝে আলোচনা সভা করেন। সুমিতার এক বান্ধবী আজকাল নিয়ম করে সেখানেই যাচ্ছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ঝাড়া হাত পা। পাড়ার দুর্গাপূজাতে দেখতে পাই না। যদিও বর ভাল কম্পানিতে চাকরী করে, তবে পূজার চারহাজার টাকা চাঁদা দেওয়ার ভয়ে, ওপথ মাড়ান না। তবে জানা গেল, এখানে নাকি মনে খুব শান্তি পাচ্ছেন। পরে খবর পেলাম ব্রহ্মকুমারীতে টাকা পয়সা দিতে হয় না। আমাদের সোসাইটিতে একটা হল আছে। সেখানে মাসান্তে রামকৃষ্ণের বাণী শোনাতে আসেন, দিল্লীর রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ। ইংরাজীতে এটাকে “রিলিজিয়াস ডিসকোর্স” বলে।  আশেপাশের বাঙালিদের মধ্যে খুব পপুলার।  সবাই, অধিকাংশই স্বামী স্ত্রী,  বেশ সেজেগুজে আসেন। বেশ একটা গেট টুগেদারের মত। বছরে একবার বড় করে হয়। আমি একবার গিয়েছিলাম। মঞ্চে বেশ ধূপ ধুনো জ্বলছে ঠাকুরের ফটোর সামনে। পাশে স্বামীজি বসে। প্রথমে রামকৃষ্ণগীত হল। দর্শকদের দিকে পিছন ফিরে মহিলারা গাইছেন, কারন গান শোনান হচ্ছে স্বামীজিকে। যাক তারপর শুরু হল বক্তৃতা। খুব ভাল করে বোঝার চেষ্টা করলাম। বেশীরভাগটাই হচ্ছে সংসারের মধ্যে থেকে কি ভাবে ভগবানকে স্মরণ করা যায়। মানে গৃহী সন্নাসী আর কি। কারণটা দর্শককুল তো সবই গৃহী। কিছুটা মার্কেটিং স্ট্রাটেজী বলা যায়।মনে পড়ছে, তখন বাচ্চারা ছোট, একবার গিয়ছিলাম দিল্লীর রামকৃষ্ণ মিশন দেখতে, মহারাজের সংগে আলাপ হল, কিছু কথার জিজ্ঞাসা করলেন- দীক্ষা নিয়েছি কিনা। ফোন নম্বর নিয়ছিলেন। কিছুদিন পরে ফোনও এসেছিল। তখন বাচ্চাদের নিয়ে ল্যাজে গোবরে। তাই ওপথে যাই নি। সত্যি কথা বলতে এখনও এই ব্যাপারে কোন উৎসাহ নেই। একজায়গায় বসে থাকার কথা ভাবলে গায়ে জ্বর আসে। সেই অনুষ্ঠানের কথায় আসি। লাঞ্চ হল।একটা করে মিষ্টি সবার শেষে। এক মহিলা, যিনি দুচোখ অর্ধ নিমলীত করে বাণী শুনছিলেন, চুপি চুপি দুটো রসগোল্লা দিয়ে গেলেন তার ছেলেকে। এক অতি উৎসাহী মেম্বার, তারা আবার প্রতি সপ্তাহে একসংগে মিলে বাণী পাঠ করেন, দুর্গাপুজার সময় চুপিচুপি ডাব্বা ভর্তি করে বাড়ীতে ভোগ নিয়ে যান। সবাই যে এরকম, তা নয়। 

আবার আরো কালারফুল ধর্মসংস্থান আছে। যেমন ধরুন ওসো। পুণের কাছে তার আশ্রম। বেশীরভাগই বিদেশী ভক্ত। আমার এক বন্ধু, সে বিদেশে থাকে অসো তে এসেছিল একটা মডিউল করতে। যা জানলাম, তাতে দেখলাম, বেশ রঙীন ব্যাপার, যারা আসে, সবাই বিদেশী এবং ডিভোর্সী। যোগের সংগে যোগাযোগও ঘটে। দিনে রাতে যোগ বিয়োগের খেলা। রসকষহীন ধ্যান নয়। এরকম রসিক গুরু আমাদের দেশেও ছিলেন। এখন অবশ্য জেলে আছেন। বাবা রাম রহিম।

দেবদত্ত

১৫/০২/২০


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments