ইন্ডিয়া গেট ও পান্ডারা রোড
জমজমাট ইন্ডিয়া গেট
দিল্লির রাস্তায় পার্ট ১
গতমাসে একবার কনট প্লেস গিয়েছিলাম। কনট প্লেসের মেট্রো স্টেশনের নাম রাজীব চক।শীতকাল, তাই ফেরার সময় ভাবলাম, বড়াখাম্বা রোড দিয়ে হেটে, দুটো স্টেশন এগিয়ে, মান্ডিহাইস থেকে, মেট্রো ধরব। স্টেটসম্যান হাউস থেকে শুরু করে, নেপাল এমব্যাসীর পাশে গিয়ে, মান্ডি হাউসের পাচমাথার বড় গোল সার্কেলটা।১কিমি হাঁটা রাস্তা। মাঝামাঝি, রাস্তার উল্টোফুটে মর্ডান স্কুলের লাল বিল্ডিং।শাহরুখ খান এই স্কুলের ছাত্র ছিল। যাক হাটতে হাটতে এসে মেট্রো ধরলাম। পরের দিন, চা হাতে হিন্দুস্তান টাইমসের পাতা উল্টাতেই দেখি, একটা ছোট্ট ট্রাভেলগ, মায়াঙ্ক অস্টিন সুফী বলে এক রাইটার, ঐ বড়াখাম্বা রোড ধরে এসে, সুন্দর বর্ণনা দিয়ে লিখেছে। সেটাও আবার ওয়ান অফ দি বেস্ট সেলিং পেপারে। দেখলাম, পুশকিনের একটা স্টাচ্যু ছাড়া প্রায় সবই দেখতে দেখতে এসেছি। লেখকের নামটা আগে শুনি নি। বেশ স্ট্রাইকিং নাম দেখে, গুগল করে দেখলাম, সে দিল্লীর উপরেই লেখালেখি করে। অরিজিনাল নাম মায়াংক, জেন অস্টিন (ব্রিটিশ লেখিকা) এর ‘অস্টিন’ আর সুফীদের আকর্ষনের জন্য, সবশেষে ‘সুফী’। ভেবে দেখলাম-‘তাই তো- দেখার আর ফীল করার চোখটাই আসল, সেটা থাকলে, সামান্য জিনিষকেও লেখনীতে আকর্ষণীয় করে তোলা দুস্কর নয়।সেই ভরসাতেই গতকালের ঘন্টা তিনেকের সফর কাহিনী লিখতে বসেছি। অবশ্য, তারমধ্যে প্রায় ঘন্টা দেড়েক মেট্রোতে কেটেছে। বছরখানেক হল দ্বারকা-নয়ডা মেট্রো এক্সটেন্ড হয়ে, আমাদের সেক্টর ৬২তে আসছে। দুপুরবেলা ধরলাম মেট্রো, মান্ডীহাউস থেকে, ব্লু লাইন বদলে, ভায়োলেট লাইন, গন্তব্য খান মার্কেট স্টেশন। একটা এক্সিট দিয়ে বেরোলে খান মার্কেট, দিল্লীর পুরোন রইস জেন্ট্রীদের আনাগোনা বেশী, রাজীব গান্ধী বিয়ের পরপর সোনিয়াকে নিয়ে এখানেই আসতেন হ্যাং আউট করতে। একবার তো খুশবন্ত সিংকে দেখেছিলাম বইয়ের দোকানে। মেট্রো স্টেশনের অন্য এক্সিট টা দিয়ে বেরোলে পড়বে পান্ডারা রোড।এই রাস্তাটা, ইন্ডিয়া গেটের হেক্সাগন থেকে যে রাস্তাগুলো বেরিয়েছে, তার মধ্যে একটা, সোজা চলে গিয়েছে গল্ফ লিংকসে, সব মিলিয়ে এক কিমির উপর রাস্তা। হাটতে শুরু করলাম ইন্ডিয়া গেটের দিকে। দুদিকে সারি সারি গভর্নমেন্ট কোয়ার্টার। এক একটা ব্লকে চারটে করে কোয়ার্টার। রাস্তা আর বাড়ীর মাঝে সুন্দর ফুটপাথ আর দুদিকে গাছের সারি। একটু পরে বেশ কিছু সিংগল বাড়ী। এগুলোতে থাকেন বেশ সরকারী হোমরা চোমরা ব্যাক্তিরা। একটিতে দেখলাম সুব্রমনিয়াম স্বামীর নাম লেখা। রাস্তা থেকে একটু ভেতরে ঢুকলে পান্ডারা মার্কেট। পুরোটা জুড়েই ইটারি জয়েন্ট।সবই অনেক পুরানো, স্বাধীনতার সময়কার। তবে সময়ের সাথে সাথে সেগুলোর এখন চোখধাধানো চাকচিক্য। দেশের টপ বুরোক্র্যাটদের জায়গা পার্টি হোস্ট করার। গুলাটি, পিন্ডি, চিকেন ইন, সবই অনেক পুরাণো।
আরেকটু গেলেই বিকানীর হাউস, আর তার সামনেই ইন্ডিয়া গেটকে পাক দিয়ে হেক্সাগোনাল রাস্তা।
বিকানীর হাউসের একটু আগে রাস্তার উল্টোদিকের কোয়ার্টারগুলোতে চোখ গেল। মনে পড়ে গেল পচিশ বছরেরও বেশী পুরাণো ঘটনা। ঘটনা না বলে অঘটন বল্লেই ভাল হয়। তখন আমি বদরপুর পাওয়ার স্টেশনে পোস্টেড। গৌড় সাহেব আমাদের ইলেকট্রিকাল বিভাগের হেড। এমনিতে খুব ভালমানুষ। তবে কোন প্যাচালো কাজ এলে চিন্তিত হয় যান বেশী। সরকারী অফিসের আবহমান কাল ধরে চলে আসা কায়দায় তিনতলায় চলে যান, ঝা সাহেব, মানে উনার বসের কাছে। খুব মাথা টাথা চুলকে প্রবলেম পেশ করেন। ঝা সাহেব কুল লোক, নাকের কাছে থাকা চশমার উপর দিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে, ধীরে সুস্থে পানের পিকটা ফেলে, বলেন- আরে গৌড় সাব, কাহে ইতনা চিন্তিত হোতে হায় ইতনা ছোটা প্রবলেম লেকে, খোলিয়ে না মোটর, করিয়ে না আপনা কাম, বাকী হাম দেখ লেঙ্গে। একদিন আমার ডাক পড়ল ঝা সাহেবের কামরায়। দেখি দুই সাহেবই চিন্তিত মুখে বসে। জানলাম আমায় পান্ডারা রোডে এক ভি ভি আই পির বাড়ীতে যেতে হবে। সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ সরকারী আমলা হলেন টি এন সেশন, তখনকার মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক, তার ভয়ে নাকি বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায়। তার বদমেজাজে অধীনস্থদের ত্রাহি ত্রাহি রব। তখন খবরের কাগজে তার নিত্যনতুন গল্প। একবার তার ভি আই কি গাড়ীর কনভয়ে অবজ্ঞা করে এক আম আদমীর গাড়ী এগিয়ে গিয়েছিল। শেসন সাহেবের তৎক্ষনাত আদেশ, পাশের বডিগার্ডকে-‘গোলি মার দো’। সেই বেচারা এহেন হুকুম অবজ্ঞা করায়, পরের দিনই সে ট্রান্সফারড।
শেসন সাহেবের বাংলোতে আমাদের একটা ছোট ডি জি সেট লাগানো আছে। পান্ডারা রোডের মত ভি আই পি এরিয়াতে চব্বিশ ঘন্টা কারেন্ট থাকার কথা। সেখানে আবার কিসের ব্যাকআপ দরকার, মাথায় এল না। যাক, দুর্গানাম জপতে জপতে দুজন টেকনিশিয়ান নিয়ে হাজির হলাম। বাংলোর পিছনদিকে ডি জি লাগানো। চেক করে বোঝা গেল, এটা এখানে কিছু করা সম্ভব নয়। টেকনিশিয়ান বুদ্ধি দিল, স্যার, এটাকে খুলে নিয়ে যাই, প্ল্যান্টে ঠিক করে আবার লাগিয়ে দিয়ে যাব। শেসন সাহেবের অনুমতি ছাড়া তো ওটা বার করা যাবে না। গেলাম আমি সিকিউরিটি কাছে, যে সাহেবের সঙ্গে দেখা করব। সাহেব তখন বাংলোর ভিতরে, অনুমতি মিলল।সামনের দরজা খুলতেই দেখি, ড্রইং রুম, সেখানে কোন ক্ল্যাসিকাল মিউজিক বাজছে, শেসন সাহেব আর তার স্ত্রী, চোখ অর্ধ নিমলিত করে গানের তালে তালে মাথা হেলাচ্ছেন। গলাখাকারী দিয়ে সবিনয় নিবেদন করলাম-‘স্যার, ডি জি টা এখানে রিপেয়ার করা যাবে না, ওটা আমি খুলে নিয়ে যাব, কালকে ঠিক করে লাগিয়ে দেব’ ইঙ্গিতে সাহেব স্ত্রীকে বল্লেন মিউজিক বন্ধ করতে। তার পরের বাক্যের জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। বাজখাই গলায় ইংরেজীতে যা বল্লেন, তা বাংলা করলে এটাই দাঁড়ায়- রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া কোন সাহসে তুমি ডিজি সেট নিয়ে যাবে। তুমি কি চাও যে, আমি এ কথাটা চেয়ারম্যান সাহেবকে বলি আর তোমার চাকরী নিয়ে টানাটানি হবে।’ ক্যাবলাকান্তের মত কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম। মাথা টাথা চুলকে জানালাম-‘ঠিক আছে, একটু সময় চাই, কালকের মধ্যে হয়ে যাবে’ কোনমতে পালিয়ে বাঁচালাম । পুরো ঘটনাটা জানানোর পর, সরকারী অফিসের নিয়ম অনুযায়ী বসের বস, তার বস হয়ে প্ল্যান্টের জি এম এর কাছে খবর পৌছাল এবং যথারীতি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুরু হল। সব শেষে ঠিক হল হন্ডা কোম্পানির (যাদের কোম্পানির ডিজি সেট) তাদেরকে ডেকে সারাই করান হোক। সেইমত ব্যবস্থা নেওয়া হল এবং আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচালাম ।
ফিরে আসি পান্ডারা রোডের কথায়। রাস্তার নামকরণটা খুব ইনটারেস্টিং। অনেকদিন ধরেই কৌতূহল ছিল নামটার মানে এবং উৎপত্তি নিয়ে। ইন্ডিয়াগেটের হেক্সাগোন থেকে যে রাস্তাগুলো বেরিয়েছে, সেগুলি সবই প্রায় ঐতিহাসিক বিখ্যাত লোকেদের নাম, যেমন- শাহাজাহান রোড, আকবর রোড, অশোকা রোড, শের শা সুরী মার্গ, জাকির হুসেন মার্গ, কস্তুরবা গান্ধী মার্গ, ইত্যাদি। পান্ডারা নামটাতো কোনভাবেই এদের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না। গুগল ঘেটে জানলাম, ইংরেজ আমলে, রাস্তাটার নাম ঠিক হয়েছিল আমাদের পুরাণের পান্ডবদের নাম অনুসারে পান্ডব রোড। কিন্তু জনৈক করণিকের তৈরী এপ্রুভাল নোটে , ‘ভি’ টা হয়ে যায় ‘আর’ । সরকারী সিলমোহর পড়ে যাওয়াতে, সেই পান্ডারা নাম এখনো স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ইদানীং এই সরকারের আমলে ঢালাও রেটে পুরোন সব নাম চেন্জ হচ্ছে। মুঘল সরাই স্টেশনের নূতন নাম পন্ডিত দীনজয়াল উপাধ্যায় মার্গ।লক্ষৌর হজরতগন্জ হয়ে গিয়েছে অটলচক। পান্ডারা নামের ঐতিহাসিক ভুলটা জানতে পারলে, নূতন নাম করণ‘পান্ডব’ খালি সময়ের অপেক্ষা।
ক্রমশঃ
বিকানীর হাউসের লনে স্ট্যাচুইন্ডিয়া গেটের রাস্তায়
ইন্ডিয়া গেট হেক্সাগনের পাশে বিকানীর হাউস
পান্ডারা মার্কেট
পার্ট ২
পান্ডারা রোড যেখানে ইন্ডিয়া গেটের আউটার সার্কেলে মিশেছে, সেখানটায় হচ্ছে বিকানীর হাউস। লুটিয়েনস দিল্লীর, এই ইন্ডিয়া গেটের চারকোনে চারটে বাড়ী আছে। বাড়ী না বলে ছোটখাট প্রাসাদ বলা যায়। বিকানীর হাউস ছাড়া আর তিনটে হচ্ছে হাদ্রাবাদ হাউস, পাটিয়লা হাউস আর জয়পুর হাউস। স্বাধীনতার আগে বানানো। যখন লুটিয়েন দিল্লী তৈরী হচ্ছিল ১৯২০ -৩০ শে তখন দিল্লিতে বড় বড় রাজাদের জমি দেওয়া হয়েছিল, ইন্ডিয়া গেটের আশেপাশে, জায়গাটার নাম ছিল প্রিন্সলি এস্টেট। মজার কাহিনী হচ্ছে রাজাদের স্ট্যাটাসের ফারাক করার জন্য, ব্রিটিশ গভরনেন্ট তাদের গান স্যালুটের নম্বর ঠিক করত তাদের সম্পত্তির পরিমাণ এবং ভৌগলিক সীমারেখার ভিত্তিতে।তখনকার দিনে ২১ গান স্যালুট পেতেন খালি হায়দ্রাবাদের নিজাম আর মাইসোর, সিন্ধিয়া, বরোদার রাজা। বাকি বড় মহারাজারা ছিলেন ১৯ গান স্যালুটের অধিকারী। বিকানীর হাউসের সঙ্গে অনেক আগে থেকে পরিচিত আছি, কারন আগে এখান থেকে রাজস্থান রোডওয়েজের বাস ছাড়ত। রাজস্থান টুরিজ্যিমের অফিস ছিল।বারদুয়েক এসেছি জয়পুর যাওয়ার জন্য। ২০১৬ সালে রাজস্থান গভর্নমেন্ট উদ্যোগ নিয়ে বিকানীর হাউস রেস্টোরেশন করেছে, এখন নানারকম আর্ট এক্সিবিশন হয়। আগেই কাগজে দেখেছিলাম, এক্সিবিশন চলছে। ঢুকলাম দেখতে। গেট দিয়ে ঢুকে তিনদিকে বিশাল লন। তারপর পোর্টিকোর পাশে বিশাল দরজা পেরিয়ে অনেকগুলো ঘর। উপরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা ঘরে চলছিল প্রদর্শনী। উউকডেজ বলে বেশ খালি খালি। বেশ কয়েকটা রুমে চলছে এক্সিবিশন। ঢুকলাম একটা ঘরে, সারা দেওয়াল জুড়ে বড় সাইজের পেন্টিং, যুদ্ধের উপর, একদিকে বেশ কিছু সাদাকালো ছবি জওয়ানদের। ঠিক বুঝলাম না থিমটা কি, বেরিয়ে আসছি, এক সুদর্শনা অল্পবয়সী মেয়ে ঢুকছিল, মনে হল প্রদর্শনীর সঙ্গে রিলেটেড। সেও আমার জিজ্ঞাসু মুখ দেখে শুধাল-উয়েস স্যার? বল্লাম- কিসের উপর প্রদর্শনী, একটু বোঝাও। সে বল্ল- এটা হচ্ছে যে সব ভারতীয় সিপাহি, ইংরেজদের হয়ে জাপানীদের সঙ্গে ফাইট করেছিল, তাদের খুঁজে বার করে কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, তাদের স্মরণ হচ্ছে এই এক্সিবিশন। এবার আমার পালা, স্বল্প জ্ঞানের ভান্ডার থেকে বেঝাতে লাগলাম - তুমি কি জান, জাপানীররা যে সব ভারতীয় সেনা বন্দী করেছিল, তাদের মধ্যে বেশ কিছু আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেয় নি। তাদের বক্তব্য ছিল, ব্রিটিশ সরকার তাদের মাইনে দেয় তাই তারা নেমকহারাম হতে পারবে না। তাদেরকে পিওডাব্লু করে নিয়ে জাপানীরা একটা দ্বীপে আটকে রেখে অনেক টর্চার করে, তোমরা ঐসব জোয়ানদের খোঁজ নিচ্ছ না কেন। বেচারী এতসব জানে না, আমার লেকচারটাও একটু বেশী হয়ে গিয়েছিল। মুখ দেখে বুঝলাম তার তখন, ছেড়ে দে মা কেদে বাঁচি গোছের অবস্থা। যাক এরপর আরো দু একটা হল ঘুরে বেরিয়ে এলাম লনে। বসলাম একটু। মখমলের মত ঘাসের গালিচা। বেরিয়ে এসেছি। এবার বড় রাস্তাটা ক্রস করে ঢুকতে হবে শিশু উদ্যানে, সেটা পার করলেই ইন্ডিয়া গেট। অনেককাল আগে যখন গাড়ী ঘোড়ার আধিক্য ছিল না, তখন এই সার্কুলার রাস্তাটা দিয়ে ক্লকওয়াইজ আর এন্টি কল্কওয়াইজ, দুদিক দিয়েই গাড়ী চলত। বেশ কয়েকটা জায়গায় রেড লাইট ছিল, হেটে রাস্তা করা সহজ ছিল, এখন গাড়ী চলে খালি এক ডাইরেকশনে, তাই রাস্তা ক্রশ করা সোজা কাজ নয়, একটু দাড়িয়ে থাকলাম। মিনিট কয়েকের মধ্যে ছয়-সাতজনের গ্রুপ হল। এতজনকে একসঙ্গে দেখা গাড়ীগুলোর গতি মন্থর হল। লোকবল হলে কাজ সহজে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
শিশু উদ্যানটা ক্রস করে নাক বরাবর এসে পরলাম ক্যানোপির সামনে। এটা একটা স্যান্ডস্টোন স্টারকচার, চারটে পিলারের উপর একটা ডোম, অনেকটা রাজস্থানের ছত্রীর মত। বাদিকে তাকালে ইন্ডিয়া গেট, একদম পাশেই। ক্যানোপির তলাটা ফাঁকা, এখানে আগে কিং জর্জ ফাইভের স্ট্যাচু ছিল। স্বাধীনতা লাভের পরে সেই স্ট্যাচু সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় করোনেশন পার্কে। ভারত সরকার এখনো ঠিক করে উঠতে পারে নি, এখানে কি বসানো যায়। অথবা এমনও হতে পারে, আমরা কতযুগ আগে মনার্কিকে টা টা বাই বাই করে দিয়েছি, জনগন নির্বাচিত সরকার দেশের রাজা, তাই কোন ব্যাক্তি বিশেষের মূর্তি না বসিয়ে জায়গাটা শূন্য রাখা ডেমোক্র্যাসির একরূপ ধরে নেওয়া যায়। চারদিকে বেশ ট্যুরিস্টদের ভীড়, দেশী, বিদেশী দুইই। সময়টা শীতের শেষেরদিক, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, তাই বাইরের স্টেটের লোক অনেক, দিল্লির ইন্ডিয়া গেট দেখাটা অনেক সাধারন মানুষের একটা স্বপ্নপূরণের ইচ্ছে, দেশের কোনা কোনা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে। মনে পড়ল আমার কলিগ সুরেশ শান্ডিল্যর কথা। ওর জন্মকম্ম খাস চাদনীচকে। ওর বাবার দোকান ছিল চাদনীচকে। সুরেশ একবার গল্প করতে করতে বলেছিল, ওর বাবার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল হাওড়ার ব্রীজ দেখবে আর গঙ্গাসাগর মেলাত যাওয়ার। সুরেশ বাবা-মাকে নিয়ে গিয়েছিল কলকাতায়। বাবা নাকি হাওড়া ব্রীজের উপর দিয়ে হেটে, চোখে জল নিয়ে বলেছিল, আজ মেরা বচপন কা স্বপ্ন পূরণ হুয়া। সত্যি মানুষের কতরকম স্বপ্ন থাকে। ছোটবেলায় রবিনসন ক্রুশোর গল্প পড়ে কল্পনা করতাম, ইশ, আমি যদি এরকম এক নির্জন দ্বীপে সারাজীবন কাটাতে পারতাম।
সেলফি তুলছি বেশ কায়দা করে, পাশেই কয়েকটা অল্পবয়সী ছেলে, আমার পোস দেখে একজনের কমেন্ট- আঙ্কেল বড়া স্মার্ট হ্যায়। একটু খেজুরে আলাপ হল। তারা থাকে গাজিয়াবাদে। এই প্রথম ইন্ডিয়া গেট দেখছে। একটু অবাকই হলাম। এত কাছে থাকে, কলেজে পড়ে, এতদিনেও ইন্ডিয়া গেট দ্যাখে নি। যাক, বা দিকে একটু গিয়ে ইন্ডিয়া গেট। এটা লুটিয়েন সাহেব বানিয়াছিলেন প্যারিসে আর্ক দ্য ট্রাইয়ম্খের অনুকরনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে ভারতীয় সৈনিকরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করে মৃত্যুবরণ করেছিল তাদের স্মরনে তৈরী। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ লিবারেশনের পর ওটার তলায়, অমর জওয়ান জ্যোতি স্থাপন করা হয়। জায়গাটা গোল করে লোহার শেকল দিয়ে ঘেরা। যত টুরিস্ট, প্রায় তার কাছাকাছি বিক্রেতার দল ঘুরছে। দেখি প্রতি মিনিটে কেউ না কেউ এসে জিজ্ঞাসা করছে, কান সাফ করাব কিনা। বেশ আশ্চর্য লাগল। কমসে কম জনাদশেক কান পরিষ্কার করার লোক। আর কোথাও এরকমটা দেখি নি। বুঝলাম, দেহাতী গাঁয়ের লোক বেশ ভালমত সংখ্যায় আসে ইন্ডিয়া গেট দেখতে। অনেক অল্পবয়সী মেয়ে সুন্দর ঘাঘরা পরে, হাতে, ডান্ডা থেকে ঝোলান রকমারী জাঙ্ক জুয়েলারী বিক্রি করছে। তাদের টার্গেট কাস্টমার হচ্ছে বিদেশী টুরিস্ট। মনে হল রাজস্থানী ড্রেসে, ইন্ডিয়া গেটের ব্যাকগ্রাউন্ডে মেয়ে গুলোর ফটো দারূন হবে। অনেকক্ষন ধরে টার্গেট করে কয়েকটা শট নিলাম। লক্ষ করলাম, কাস্টমার ধরার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের মধ্যে বেশ গল্পগুজবও করছে। ফটো নেওয়া বেশ দুরূহ কাজ, কারণ তারা টুরিস্ট দেখলেই হরিণ পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্যান্ডিফস থেকে শুরু করে, আইসক্রীম, ভেলপুরী, ছোলে, চাট ইত্যাদির দোকান লনের চারপাশ ঘিরে। পশ্চিমদিকে চলে গিয়েছে রাজপথ, অনেকদূরে, রাইসিনা হিলসের উপর রাষ্ট্রপতি ভবন। স্বাধীনতার আগে এই রাজপথের নাম ছিল কিংসওয়ে। আমার গন্তব্য মান্ডীহাউস মেট্রো স্টেশন। সেখান থেকে আমি ধরব ব্লু লাইন, যেটা সোজা নয়ডাতে আমার বাড়ীর কাছে, সেক্টর ৬২ স্টেশনে নামিয়ে দেবে। ইন্ডিয়া গেট থেকে উত্তরের রাস্তা ধরে আবার সেই রেডিয়াল রোড ক্রস করতে হল। এরপরের রাস্তাটার নাম কোপারনিকাস মার্গ। ইন্ডিয়া গেট থেকে এক কিমি হবে মান্ডী হাউসের গোল চক্করটা। এর উপরেই পরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিখ্যাত সব হল, এল টি জি অডিটোরিয়ম, কামানী অডিটোরিয়ম, শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্র সবশেষে ললিত কলা একাডেমী ও রবীন্দ্র ভবন। রবীন্দ্র ভবনের লনে প্রত্যেক বছর পঁচিশে বৈশাখ পালন হয় ভোর ছয়টা থেকে। বিশাল সামিয়ানা খাটানো, দর্শকদের বসার জায়গা। পরপর তিনটে মঞ্চ। সিডিউল অনুযায়ী আর্টিস্টরা আগে থেকে রেডী হয়ে বসে থাকেন। একটা শেষ হলে পরেরটা শুরু। দিল্লির বিদগ্ধ বাঙালীকুলের মিলনক্ষেত্র বলা যায়। সুন্দর ফুটপাথ, দুদিকেই গাছ। দেখি ব্যাটারী অপারেটেড সাইকেল নিয়ে দুজন যাচ্ছে। আজকাল এই সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়, মান্ডী হাউস মেট্রো স্টেশন থেকে। সীটগুলো বেশ নীচু।
পায়ে হেটে সব মিলিয়ে ঘন্টা দুয়েকের সফর। আজকাল যোশীমঠে থাকি। শীতের দিল্লির জমজমাট মেলা, লাজপত নগরে শীত শেষের সেল, রকমারী শীত বস্ত্রে সজ্জিত মানুষজন, খুব মিস করি। অনেকদিন পর এই পায়ে হাঁটা এডভেঞ্চার করতে পেরে দারুন লাগল।
দেবদত্ত
১০/০২/২০২০
পড়ন্ত আলোয় ইন্ডিয়া গেট
মান্ডি হাউস মেট্রোর পাশে এই সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়
কিং জর্জের শূন্য জায়গায় নেতাজীর মূর্তি বসবে
কিনে দে রেশমী চুড়ি









Comments
Post a Comment