মহেশ যোগী (রম্যরচনা, ভ্রমণ)

                     চৌষট্টি গুহায় ধ্যানমুদ্রায় আমি! 🤨
 মহেশ যোগী,

পার্ট-  

দিন কয়েক আগে ইউ টিউবে একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম সইদ নাকভী বলে এক নামজাদা সাংবাদিক লেখকের। উনি ষাটের দশকে স্টেটসম্যানের দিল্লী শাখায় ছিলেন। কনট প্লেসের আউটার সার্কেলে, বড়াখাম্বা রোড দিয়ে ঢুকলে, লাল ইটের বিল্ডিংটা আমিও দেখেছি ৮০র দশকে। এখন সেই হেরিটেজ বিল্ডিং ভেঙ্গে বিশাল আর্ধচন্দ্রাকৃতি মাল্টিস্টোরি হয়েছে।

১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ড থেকে, তখনকার সবচেয়ে বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের সদস্যরা 

বিটলসদের এই ছবি আশ্রমের এটা ঘরে রাখা বিভিন্ন ছবির মধ্যে একটি
এসেছিলেন, মহেশ যোগীর ঋষিকেশের আশ্রমে। নকভীর উপর ভার পড়ল একটা সেন্সেশানাল কভার স্টোরি করার। কিন্তু ঋশিকেষের সেই আশ্রমে সংবাদিকদের প্রবেশ নৈব নৈব চ। তায় আবার নকভী সাহেব মুসলমান। তখনও কিছুদিন বাকী বিটলসদের আসার। নকভী সাহেব চিন্তিত, ঢুকতেই যদি না দেয়, তবে ইন্টারভিউ কি করে হবে।এই সময় হঠাৎ এক কলিগ খবর দিলেন, ‘আরে ইয়ার, যোগীজী ইধার মর্ডান ইস্কুল মে রহে হ্যায়, কাল যাকে মিল লে। একবার পরিচয় হো যায়গা তো তুমে আশ্রম কা ভী এনট্রী মিলেগি। মর্ডান স্কুলটা আবার বড়াখাম্বা রেডের উপরেই, মান্ডী হাউস থেকে দু কদম হাঁটলেই পড়বে। যাক হিসাবমত পরের দিনই নকভী মহেশ যোগীকে দর্শন করতে গেলেন।

                            মহেশ যোগী(১৯১৮-২০০৮)
নকভী নাম শুনে মহেশ যোগী কিছুটা অবাক, কারণ কোন মুসলীমই সাধারণত হিন্দু সাধুর শরনাপন্ন হয় না। যোগীজি আর কি করে জানবেন, আসার আসল উদ্দেশ্য টা কি।যোগীজি প্রশ্ন করলেন- ‘বেটা কেয়া তকলীফ হ্যায়’? নকভী আর কি বলেন, জানালেন ‘গুরুজী, বড়া বেচয়ন রহাতা হু হামেশা’। যাক, সব শুনে টুনে, উনি কানে কানে একটা গুরুমন্ত্র দিলেন। নকভীর আসল উদ্দেশ্য, পরিচয়পর্বটা ভালভাবে উতরে গেল। এর কয়েকদিন পরেই বিটলসরা এসে পড়লেন হৃষীকেশে। তখনও টিভির যুগ আসে নি। খবর বলতে রেডিও এবং খবরের কাগজ। দেরাদুন এয়ারপোর্টও তখন তৈরী হয় নি।সব কাগজের রিপোর্টাররা ভীড় করেছেন হৃষিকেশে। কিন্তু আশ্রমে মহেশ যোগীর শিষ্য ছাড়া ঢোকা যাচ্ছে না। নকভীকে দেখে যোগীজি চিনতে পারলেন, সুতরাং নকভী ঢুকতে বাধা রইল না, বাকী অপেক্ষমাণ জার্নালিস্টদের ঈর্ষার চোখ উপেক্ষা করে আশ্রমে ঢোকা তো গেল। ভিতরে আন্ডার গ্রাউন্ড হলে গিয়ে সব বিটলসদের দেখা পেলেন। কিন্তু ফটো ছাড়া ইন্টারভিউ একদম পানসে। সংগে ভারতখ্যাত ফটোগ্রাফার  রঘু রাই। কিন্তু তিনি তখন বাইরে। নকভী তাকেও বলে টলে ঢোকালেন। কিন্তু ছবি তুলতে দেখলে মহেশ যোগীর চ্যালারা তো বাইরে পাঠিয়ে দেবে।রঘু রাই কায়দা করে নকভীর পিছন থেকে, নকভীর কাঁধে জুম লেন্স লাগিয়ে ফটো তুললেন। বিটলসদের ইন্টারভিউ নেওয়া হল এবং পরের দিন দৈনিক স্টেটসম্যানের কভার স্টোরি হল। তারপর থেকে প্রায় রোজই যেতেন। বেশ ভাব হয়ে গেল বিটলসদের সংগে।

কালকেই আমি আর সুমিতা বেরিয়েছি যোশীমঠ থেকে, গন্তব্যস্থল নয়ডা। পাহাড়ী রাস্তা নাকি চওড়া হচ্ছে, যাতে পূন্যার্থীরা সহজেই বদ্রীনাথ দর্শন করতে পারেন। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতে। এখনতো রাস্তা, মানে প্রায় নৌকার মত দুলতে দুলতে আসা। অফিস থেকে লাঞ্চে বেরিয়ে, পিপলকোটি, নন্দপ্রায়াগ, কর্নপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছলাম শ্রীনগর। যারা জানেন না, তাদের জ্ঞাতার্থে বলি- নন্দপ্রয়াগের সংগম অলকানন্দা আর নন্দাকিনী নদীর, তারপর কর্ণপ্রয়াগ, পিন্ডারীগঙ্গা আর অলকানন্দার সঙ্গম, আর রূদ্রপ্রয়াগে কেদারনাথ থেকে নেমে আসা মন্দাকিনীর সঙ্গে অলকানন্দার সম্মিলিত ধারা। কাশ্মীরের মত উত্তরাখন্ডের একটা বড় শহর শ্রীনগর। গাড়োয়াল ইউনিভার্সিটি, এন আই টি, মেডিকেল কলেজ, জি ভি কে ৪০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র - সব মিলে বেশ জমজমাট জায়গা। রাত্রিবাস এখানেই। আজ সকাল ৬টার সময় বেড়িয়েছি গন্তব্য দেবপ্রয়াগ, হৃষীকেশ হয়ে হরিদ্বার। চিরকালই আমরা হরিদ্বারের বিকালে গঙ্গা আরতি দেখি। তারপর ঘাটের পিছনের সর্পিল গলিতে ঘুরতে ঘুরতে টুকটাক কেনাকাটি করে, গলির শেষপ্রান্তে দাদা-বৌদির হোটেলে ডিনার। ১৯৭৩ সালে যখন প্রথম আসি মা-মাসী-মামাদের সংগে, তখন একটাই দাদা-বৌদির হোটেল ছিল। গরমের ছুটিতে এসেছিলাম। ঘাটে গিয়ে দুপুরে নদীর ঠান্ডা জলে স্নান করে, সেই হোটেলে পেটপুরে খাওয়ার কথা মনে আছে। এখনও মেনু সেই একই।প্রথমেই গরম ভাতে ঘি, তারপর ডাল আর পাপড়, পরে দুরকম তরকারী, সবার শেষে চাটনি।ভাত রুটি যত খুশী। মাত্র ৬০/- কি করে দেয় কে জানে। তবে এখন একটা দাদা বৌদি নেই, ছড়িয়ে, ছিটিয়ে বেশ কয়েকটা দাদা বৌদির হোটেল। ব্র্যান্ড নেমের মাহাত্ব্য।

আসতে আসতে দুজনের কথা হচ্ছিল বিটলস আর মহেশ যেগীকে নিয়ে। বল্লাম, শোন না, আমরা তো হৃশীকেষ হয়েই যাচ্ছি। এবার হরিদ্বারে না গিয়ে,  ওখানেই থামি, গীতা আশ্রমটা অনেকদিন দেখি নি, ওটাও দেখব, তার সংগে মহেশ যোগীর আশ্রমটাও। গাড়ী ঘুরিয়ে ঢুকলাম লক্ষণ ঝুলার রাস্তায়। পার্কিং লটে গাড়ী রেখে, একটু এগিয়ে বাদিকে ঘুরলেই লক্ষণ ঝুলা।রাস্তাতে প্রথমে বেশ কয়েকটা রিভার রাফ্টিং এর দোকান। রাবারের তৈরী বড় বড় বোট গুলো লম্বা লম্বা দাড় বেধে, গাড়ীর মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে বিয়াসী বলে একটু উপরের দিকে। ওখান থেকে রিভার রাফ্টিং শুরু হয়। রুদ্রাক্ষের মালা, নানা রকম প্রেশাস, সেমি প্রেশাস স্টোনের মালা, দুল, আংটি দোকান। স্ফটিকের আনেক দোকান। চারিদিকে বিদেশী, বিদেশিনী। ইয়াং ব্রিগেডই বেশী। প্রতিবারই যাওয়ার সময় দেখি, ভারতীয়দের থেকে ওদের সংখ্যাই বেশী মনে হয়। বিদেশীদের মনে ভারতের আধ্যাত্মবাদ যোগ নিয়ে প্রচুর কৌতূহল। প্রায় সবাই আসে যোগের উপর কোর্স করতে। বিদেশে অনেক যোগ স্কুল আছে। একজন এরকম বিদেশীর সংগে খেতে গিয়ে আলাপ হল। নেদারল্যান্ড থেকে এসেছে। তার যোগের স্কুল আছে রটারডামে। সে এখানে যোগ টিচারদের জন্য এডভান্স কোর্স করতে এসেছে।

পথে যেতে যেতে এক দোকানে জিজ্ঞাসা করলাম মহেশ যোগীর আশ্রমটা কোথায়। সে জানাল যে জানে না। পাশ থেকে একজন বল্ল, - ‘আপলোগ কেয়া বিটলস আশ্রম যায়েঙ্গে’? পরে বুঝলাম এখন সবাই ওটাকে বিটলস আশ্রম বলেই জানে। সেখানে নাকি কেউ থাকে না। কিন্তু সেটা বেশ দ্রষ্টব্য বস্তু। কিন্তু জানলাম যে আশ্রমটা নদীর ওপারে। লক্ষন ঝুলা থেকে রামঝুলা দুই কিমি, সেখান থেকে নাকি আরো দুই কিমি জংগলের ভিতর ঢুকলে সেই মহেশ যোগীর আশ্রম।

মাস তিনেক আগে একবার লাঞ্চ করতে নেমেছিলাম সক্ষণঝুলার কাছে।

                   লক্ষণঝুলা আরো দক্ষিণে রামঝুলা 
তখনো দেখেছি ওই ছোট্ট ব্রীজের উপর দিয়ে স্কুটার, বাইক বেশ ভালই চলছে। বাইক গেলে ব্রীজটা আবার দুলতে থাকত। এবার দেখলাম সেটা বন্ধ। তবে ছোট বড় মিলিয়ে বিশাল বানর বাহিনী। নাম মাহাত্ব্য বলতে হবে। সেই রামায়নের যুগের বীর বানর বাহিনী। টুরিস্টদের সংগে তাদের সহবস্থান দেখে কিষ্কিন্ধ্যাকান্ডের কথা মনে পড়ে।  ব্রীজের নীচে চিরবহমান পতিতদ্ধারিনী গঙ্গে। শীতকাল, তাই শান্ত সমাহিত। স্বচ্ছ, সবুজাভ, তরঙ্গহীন। সারাটা রাস্তা বরাবরই আসি, উচ্ছল, কিশোরী নর্তকীর রূপে অলকানন্দা কে দেখতে দেখতে। কথায় বলে , বহতা নদী- রমতা সাধু।লছমনঝুলা থেকে নীচে তাকিয়ে নদীর রূপ মনে হল ধ্যানগম্ভীর, শান্ত, প্রাজ্ঞ।

দক্ষিন দিকে নদীর উপর রামঝুলা।

 

মহেশ যোগী, পার্ট

লক্ষণ ঝুলা পেরিয়ে ২০০-২৫০ মিটার দূরে ট্যাক্সি স্টান্ড। সওয়ারী প্রতি দশটাকা, রামঝুলা পৌছে দেবে। টুকু সরু রাস্তা দিয়ে গাক গাক করে বলেরো চল্ল। এখানে উচিত ব্যাটারী গাড়ী টুকটুক চালানোর। দু কিলো মিটার তো মোটে রাস্তা। ড্রাইভার একটা ১৬-১৭ বছরের ছেলে। সামনের সিটেই বসেছিলাম। বল্লাম, আমাদের বিটলস আশ্রম অব্দি পৌছে দাও। আরো কিছু টাকা দিয়ে দেব। পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ছেলেটা আমাদের আশ্রমের সামনে ছেড়ে দিল। কিছুটা রাস্তা বেশ এবড়ো খেবড়ো, জংগলের মধ্যে দিয়ে। মনে পড়ে গেল, সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ফেলুদার গোয়েন্দা উপন্যাস- বাদশাহী আংটির, শেষ দৃশ্যের , সেই লছমন ঝুলা যেতে গিয়ে, বনবিহারী বাবুর গাড়ী ঘুরিয়ে জঙ্গলে ঢোকার গা ছমছমে কাহিনী। এই জঙ্গলটা হচ্ছে রাজাজী ন্যাশানাল পার্কের মধ্যে। হৃষীকেশ আর হরিদ্বারের মধ্যে শালের জঙ্গল। হাতী, ময়ূরের ছড়াছড়ি। বাঘও আছে তবে কমে গিয়েছে। হরিদ্বার থেকে হৃষিকেশ অব্দি রেললাইন আছে। সেটা গিয়েছে ওই পার্কের মধ্যে দিয়ে।

                     গেট থেকেআশ্রমে প্রবেশপথের ভিউ

পৌছে গেলাম মহেশ যোগীর আশ্রমে। ঢোকার টিকিট ১৫০/-  প্রতিজন। সিনিয়ার সিটিজেন অর্ধেক। লাক ট্রাই করলাম, যদিও টেকনিকালি ১৫-২০ দিন বাকি সেই অখন্ড শান্তির প্রবেশদ্বারে ঢোকার। যাক, আমার সাদা গোঁফ আর ব্রম্ভতালুর টাক দেখে হাফ টিকিটের এনট্রি নিলাম। ছোটবেলায় ১২ বছর হয়ে যাওয়ার পরও বছর দুয়েক, হাফ টিকিটে চালিয়েছি, কিছুটা সেই রকম ব্যাপার হল।ঢুকলাম মেন গেট দিয়ে। জঙ্গলের মধ্যেই মনে হল আশ্রম। ধ্যান করার আদর্শ জায়গা। প্রায় ১০০-২০০ মিটার সিড়ি বেয়ে উঠতে হল। একটু উঠতেই দেখি পাথরের তৈরী গুহা।

                 মহেশ যোগীর আশ্রমে ধ্যানের গুহা
            পাশের গঙ্গার নুড়ি পাথর সিমেন্ট দিয়ে তৈরী
মাথাটা আবার গম্বুজের মত। একটা দুটো নয়, সব মিলিয়ে চুরাশীটা। তাই এই জায়গাটাকে লোকে চৌরাশী কুটির বলেও জানে।  সব মিলিয়ে সাড়ে সাত হেক্টর জমি। চারিদিকে গাছ গাছালিতে ভরা নিস্তব্ধ জায়গা, ধ্যান করার উপযুক্ত। টুরিস্টের সংখ্যা বেশ ভালই। রবিবার বলে হয়ত একটু বেশী। একটা বেশ বড় গ্রুপ দেখলাম, সংগে বেশ ক্যামেরা, ভিডিও ইত্যাদি। পরে বুঝলাম, প্রি ওয়েডিং ফটোগ্রাফী চলছে। উত্তর ভারতে আজকাল এটার বেশ চল। সিড়ি দিয়ে বেশ কিছুটা উঠে আসার পর বিশাল সমতল জায়গা। একদিকে মেডিটেশন সেন্টার, সেটা এখন আর্কাইভ হয়েছে। ডানদিক দিয়ে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে আশ্রমএর থাকা খাওয়া, কমিউনিটি কিচেন, আন্ডারগ্রাউন্ড ধ্যান সেন্টারের  ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায়। এমনকি পোস্ট অফিসও ছিল। কিছুকিছু ভাঙা দেওয়ালে বেশ সুন্দর গ্রাফিট্টি করা। আর বাদিকে গুহা গুলোর পাশ দিয়ে গেলে নীচে গংগা কুলকুল করে বয়ে চলেছে।

এই আশ্রমের জায়গাটা মহর্ষি যোগীকে ইউ পি সরকার ২০ বছরের জন্য লীজ দিয়েছিল।মহেশ যোগী যদি জানতেন, এত অল্প সময়ে, দেশ বিদেশে তার আবিস্কার ট্রানসেডেন্টাল মেডিটেশন দারুন পপুলার হবে, তবে নিশ্চয়ই আরো বেশী বছরের লীজ নিতেন। আজ হৃষীকেশ যে যোগচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, তার প্রধান অবদান মহেশ যোগীর।বিটলসরা আসার পর, তার খ্যাতি দেশ বিদেশে বেড়ে যায়, এবং প্রচুর বিদেশী ভক্ত হৃষীকেশ আসা যাওয়া শুরু করেন। বিটলসরা এখানে পুরো একমাস কাটিয়েছিলেন এবং তাদের বেশ কিছু বিখ্যাত গান এখানেই স্রৃস্টি। ১৯৬৮ সালে এখানে আন্তর্জাতিক যোগ ফেস্টিভাল হয়েছিল।৫০ জন যোগ এক্সপার্ট আর কয়েক হাজার ডেলিগেট। সরকারী লালফিতের আর বনদপ্তরের কড়া মনোভাবে লীজ আর রিনিউ হল না। ধীরে ধীরে সব বন্ধ হয়ে গেল।

                         আশ্রমে থাকার জায়গা
                              এখন সব খন্ডহার
মহেশ যোগী চলে গেলেন নেদারল্যান্ডে। ততদিনে বিদেশে তার যোগসেন্টারের অনেক শাখা। এখনও তার ভ্যালুয়েশন ৫০০ মিলিয়ন ডলার। মহেশ যোগীর সেই যোগনগরী এখন খন্ডহার মাত্র। তবে এরকম রুইন ঘুরে দেখাও একটা অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা।বাংলাদেশে থাকতেও পুরোনো জমিদারবাড়ী খুব দেখেছি, তার গল্পগাথাও শুনেছি।এটাও কিছুটা সেইরকম।ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বোর্ড কয়েক জায়গায় বড় করে লাগানো, তাতে লেখা , এই জমি তাদের অধিকৃত। উচিত তো ছিল, আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে, আরো সুন্দর করে প্রিসার্ভ করা, অথবা নূতন করে কোন সংস্থা কে দিয়ে, আবার যোগসেন্টার চালু করা।

ফেরত যেতে হবে আবার লক্ষণঝুলা।৫ কিমি রাস্তা। গাড়ী নেই। অগত্যা রামঝুলা অব্দি হেটে যেতে হবে। চায়ের দোকানের লোক জানাল, রামঝুলা একটুই রাস্তা। যে রাস্তায় এসেছিলাম, সেটা ধরে আরেকটু এগোলেই গঙ্গার তীর দিয়ে সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। শীতকাল, তাই হাঁটতে অসুবিধে নেই। সামনেই দেখছি ব্রীজ, সুমিতাকে বল্লাম, ভালই হল, বেশী হাটতে হবে না। আরো বল্লাম, দেখো ব্রীজে নূতন করে রং হবে, তাই প্রাইমার লাগাচ্ছে। হরি, ওটার কাছে পৌছে শুনলাম, এটা নূতন তৈরী হচ্ছে, নাম জানকী ব্রীজ। তখন চোখে পড়ল, ব্রীজের দুদিকের পিয়ার তৈরী, লোহার তারের কাছিও লাগানো এদিক থেকে ওদিক, মাঝখানে pathway টাই নেই। কি বুদ্ধু আমি।


                    সামনে গঙ্গা। এখানে সন্ধ্যারতি হয়
ওখান থেকে আরো দুই কিমি  হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম, যেখানে হরিদ্বারের দেখাদেখি হৃষিকেশেরসন্ধ্যা আরতি হয়। পাশেই গীতা ভবন 

                     গীতা ভবনের ভিতরে চত্বর
এবং পরপর ধর্মশালা।অবসর সময় ঘনিয়ে আসছে, ভাবলাম গঙ্গার ধারে আশ্রমিক পরিবেশে যদি কিছুদিন কাটিয়ে যাওয়া যায়। গেলাম, গীতা ভবনের অফিসে। বল্ল থাকার জন্য কোন টাকা লাগে না, অন লাইন বুকিং হয় না, এপ্রিল থেকে জুন, ঘর পাওয়া মুস্কিল, বাকী সময় ঠিক আছে। আমার তো এরপর “সময়- হি- সময়”।কিন্তু তারপর যা জানলাম, তাতে বেশ দমে গেলাম। রোজ সকালে ৫টাতে উঠে সৎসঙ্গ করতে হবে। তার মানে ঘন্টা দুয়েক প্রবচন শুনতে হবে, বড় হলের মধ্যে হাঁটু মুড়ে বসে। সে বড় কঠিন কাজ। তার থেকে বোধহয় অয়ো হোটেল ভাল।আজকাল অয়ো লাইট, একটা সাইট হয়েছে। বেশীদিন থাকতে হলে, ওইখান দিয়ে বুক করলে সস্তা পড়ে।

লাঞ্চ করতে হবে, তবে এখানে সাধের ‘দাদা বৌদি’ নেই, তার বদলে ‘চোটিওয়ালা’। পরপর দুখানা, রামঝুলার সামনেই। বেশ কম্পিটিশন, দুই দোকানের বাইরেই লাইভ চোটিওয়ালা বসে।১৯৫৮ সালে হর স্বরূপ অগরওয়াল বলে এক ব্যাক্তি এই দোকানের পত্তন করেন। এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজা লোগো দেখে ইনসপায়ারড হয়ে, তিনি এই ভুড়িদার লাইভ চোটিওয়ালা লোগো বানান।মার্কেটিং স্ট্রাটেজি। সব জায়গায় ছবি দেখেছি, খালি গা, পরনে ধুতি, সেজেগুজে, টাক মাথায় বড় একটা টিকি। লাইভ চোটিওয়ালাও তাই, তবে শীত বলে, উর্ধাঙ্গ আবৃত, পায়ে মোজা। লাইভ চোটিওয়ালার সাজ পোষাক ও মেকআপে পাক্কা একঘন্টা লাগে বলে শুনলাম। 


অরিজিনাল মালিক মারা যাবার পর দোকান দুইভাগ হয়ে দুই জন চোটিওয়ালা।০
সবাই খেয়েদেয়ে সেলফি নিচ্ছে চোটিওয়ালার সংগে। খেয়েদেয়ে আবার লক্ষণঝুলা হয়ে হৃষিকেশ টা টা বাই বাই।

দেবদত্ত

১০/০১/২০

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments