অথ চশমা ঘটিত (রম্যরচনা)
অথ চশমা ঘটিত
চোখে পাওয়ার থাকলে,চশমা দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। চল্লিশ বছর বয়েসের পর অনেকেরই চালশে হয়, তখন দরকার চশমা। ছোটবেলাতে যাদের চোখে চশমা থাকে, তাদেরকে সাধারনত বেশ পড়ুয়া ও শান্তশিষ্ঠ গোছের ধরে নেওয়া হয়। আমার দাদু, বাবা সবারই চশমা ছিল। দাদুর দেখতাম একটা রিডিং গ্লাস, অন্যটা দূরে দেখার। বাবা পরত বাইফোকাল। দুটো কাচের জোড় পরিষ্কার বোঝা যেত। আমার চশমার সঙ্গে পরিচিতি বছর বার তের, মানে যখন আমি নিয়ার ফিফটি। অফিসের ম্যান্ডেটরি হেলথ চেকআপে জানা গেল চোখে ‘পাওয়ার’ হয়েছে। আমাদের লোকাল মার্কেটে তখন একটা চশমার দোকান ছিল। বেশ হাসিমুখ ছেলেটির পদবী ছিল ঠুকরাল। গিন্নির চশমাটাও ওর বানান। দোকানে যেতে বল্ল- স্যার, আপ প্রোগ্রেসিভ লেন্স লিজিয়ে, এটা দূর ও কাছের দুরকম পাওয়ারের জন্য কাজ করবে। দামটা একটু বেশী। লেন্সের দামই সাড়ে তিন হাজার। একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম, আধাসরকারী কোম্পানিতে চাকরী করি। মেডিক্যাল খরচা বৌ, বাচ্চা, ছেলে, মেয়ে এমনকি বাবা মায়ের জন্যও শূন্য। খালি চশমার টাকাটা নিজের গ্যাটের কড়ি খরচা করে বানাতে হবে।গিন্নীর পীড়াপিড়ীতে ওই প্রোগ্রেসিভ লেন্স নেওয়া ঠিক হল। এরপর ফ্রেম সিলেক্ট করার পালা। ভারী ফ্রেম নিলে তো কষ্ট হবে, কারণ চশমা তো আগে ব্যবহার করি নি। রিমলেস চশমা নেওয়াই ঠিক করলাম। পরেও খুব একটা ফিলিং হচ্ছে না যে চশমা পরে আছি, বন্ধুবান্ধবরা অতটা বুঝবে না যে চোখ খারাপ হয়েছে, অহেতুক প্রশ্নবান থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।
চশমা নাকি খুব হারিয়ে যায়। এটা আবার মোবাইলের মত নয় যে, বাড়ীর অন্য ফোন থেকে রিং দিয়ে খুঁজব। চশমা হারানোর ব্যাপারে সুমিতার খুব হাতযশ। দুরূহ সব জায়গা থেকে ওর চশমা উদ্ধার হয়েছে, যেমন ধরুন ডীপফ্রিজ, আলমারির লকার ইত্যাদি। এখন ওর ব্যাকআপ প্রোটেকশনের জন্য তিনটে চশমা, অনেকটা আমাদের ইলেকট্রিক্যালের ব্যাকআপ রিলের মত। আমার একমোবদ্বিতীয়ম চশমা ভালই চলছিল, যদিও মাঝে দুবার চশমা পাল্টাতে হয়েছে। একবার তো হোলির দিনে বেল বাজতে, তাড়াহুড়ো কোরে পড়শীর সঙ্গে আবির খেলতে গিয়েছি চশমাটা বিছানার উপর খুলে। পরে এসে বিছানায় বসতেই মটাৎ করে আওয়াজ, চশমার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। আরেকবার তখন বাংলাদেশে পোস্টেড। বেনাপোল থেকে মংলা গেস্টহাউসে আসছি। স্পষ্ট মনে আছে চশমাটা খুলে গাড়ীর সিটে রেখেছিলাম। রুমে এসে বসেছি। সুমল বলে ছেলেটা মালপত্র নিয়ে এল। দেখি চশমা আনে নি। বল্লাম গাড়ীর সিট থেকে চশমা নিয়ে আয়। সে ঘুরে এসে জানাল কোন চশমা নেই। সত্যিই আর পাওয়া গেল না। বাড়ী থেকে আরেকটা বানিয়ে পাঠান অব্দি চাইনিজ রিডিং গ্লাসই ভরসা। আগে আমাদের দেশেও এই রিডিং গ্লাস খুব পাওয়া যেত, পেনের মত পকেটেও রাখা যেত।
সেই চশমার বয়স এখন পাঁচ। দিব্যি চলছিল। তবে আজকাল স্ক্রুগুলো কিছুদিন পর ঢিলে হয়ে যায়। আগে ঠুকরালের দোকানে গিয়ে টাইট করিয়ে আনতাম। বেশ কয়েকমাস হল ওর দোকান বন্ধ। কিছুদিন আগে ওটাতে একটা গারমেন্টস এর দোকান হল, তখন জানলাম ঠুকরাল বেশ কিছুদিন আগে মারা গিয়েছে। হাই সুগার থেকে অন্যান্য কম্পলিকেশন। খুব খারাপ লাগল ঘটনাটা শুনে।
দুই আঙুলের নখ দিয়ে চেষ্টাচরিত্র করে, ডাটিটাকে টাইট করি, আবার দুদিন পরে যে কে সেই। সব জায়গায় সাবধানে থাকতে হয়, চশমা না খুলে পড়ে যায়। বাড়ীতে বেশ কয়েকবার নীচু হতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে মেঝেতে। কিছুদিন আগে আরেক কান্ড। মাছের বাজারে গিয়েছি। মাছওয়ালা বল্ল-ভাল শিঙ্গি মাছ আছে। জলরাখা ড্রামে অনেক জ্যান্ত শিঙ্গি ও কই মাছ। সাইজগুলো বোঝার জন্য যেই একটু ঝুকেছি, চশমা খুলে সোজা মাছভর্তি জলে। আশেপাশের দুইএকজন গেল গেল বলে উঠলেন। ততক্ষনে অঘটন ঘটে গিয়েছে। মাছওয়ালার ছেলে চশমা উদ্ধার করে দিল। পরিষ্কার করে দেখলাম সব ঠিকই আছে, খালি একটা মাছ মাছ গন্ধ চশমাতে। তা যাকগে, মাছের গন্ধ ভালই লাগে, চশমাটাতো ইনট্যাক্ট আছে। দেখা যাচ্ছে, চশমার জান পুরো কই মাছের জানের মত।
আরেকটা নবলব্ধ উপলব্ধি হল। কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি,সকালবেলা ঘুম থেকে উঠার পর, চশমা ভাল মতই সেটে আছে নাকের ডগায়। প্রবলেম শুরু হয় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। প্রথমে ভাবলাম, ভোরে বেশী ঠান্ডা থাকে, তাই চশমা শ্রিংক করে যায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা এক্সপ্যান্ড করে। দৈর্ঘপ্রসারণ গুনাঙ্ক, রেল লাইনের এক্সপানসান, এসব স্কুলে থাকতেই পড়েছিলাম। সহজ বিজ্ঞানের ফান্ডা। বৌকে বল্লাম আমার রহস্যভেদের কথা। সুমিতাও সাইন্স স্টুডেন্ট, সে আমার থিয়োরিতে ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে বল্ল- দূর, কাচের আবার এক্সপানসন, কনট্রাকশন হয় নাকি। এই যা, আমি দেখছি সব ভুলে মেরে দিয়েছি। পরে দুজনে মিলে কনক্লুশনে এলাম, সকালবেলায় ঘুমের পর মুখটা ফুলে থাকে, তাই চশমাটা ঠিকঠাক বসে।
নূতন চশমা না কিনলেই নয়। আজকাল খুব এ্যড দেখি লেন্সকার্ট ডট কমের। এ্যডভান্স টেকনোলজীতে তৈরী হবে চশমা। এ্যপস আছে। মোবাইলে ডাউনলোড করে, দেখি হাইটেক ব্যাপার। ঘরে বসেই মোবাইল ক্যামেরাতে ছবি তুলে, বিভিন্ন ফ্রেমে, নিজের মুখ কেমন দেখাচ্ছে জানা যাবে। তবে চোখের পাওয়ার জানার জন্য, হাইটেক হাত খাড়া করে দিয়েছে। একশ টাকা দিলে, তারা বাড়ী এসে চোখ টেস্ট করে দেবে। পরের দিন থেকে ফোনাঘাত। এসটিডি কোড দেখে বুঝলাম কোনটা ব্যাঙ্গালুরু, কোনটা হায়দ্রাবাদ বা কলকাতা থেকে আসছে। তাদের বক্তব্য, আমি নাকি অলরেডি এপয়ন্টমেন্ট করে ফেলেছি ওদের নিয়ারেস্ট স্টোর, ইন্দিরাপুরমে যাওয়ার জন্য। একেই বলে এগ্রেসিভ মার্কেটিং স্কিল।তবে বেশী চাপাচাপি করলে যে কাস্টমারের সন্দেহ হয় ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’ সেটা বোধকরি লেন্সকার্টের সিলেবাসে ছিল না। দু তিন দিন ধরে যত ফোন এল সবগুলোকে ব্লক করে দিলাম।
তবে ভবী ভোলার নয়। কয়েকদিন আগে মেঘলা মিস্টিক ওয়েদারে বেরিয়েছিলাম ঘুরতে। ইন্দিরাপুরমের হ্যাবিটাট মলে গিয়ে দেখি সেই লেন্সকার্টের দোকান। হাতে অঢেল সময়। তাই ঢুকে পড়লাম। চটপটে চেহারার স্মার্ট তরুণ তরুণী, লেন্সকার্ট লেখা টিশার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।করোনার বাজারে, বেশ ইলাবরেট সিস্টেম। যে ফ্রেম ট্রাই করছি, সেটা রিজেক্ট করলে একটা সাদা ট্রেতে রাখতে হবে, যেটা পছন্দ হচ্ছে সেটা কালো ট্রেতে। দেখা শেষ হলে রিজেক্টেড চশমা স্যানিটাইজ হয়ে চলে যাবে আবার শোকেসে। বেশ ফ্লোচার্টের মত ব্যাপার। সাদাটাতে লেখা- উই আর গোয়িং ফর স্যানিটাইজেশন, কালোটাতে কিছু লেখা নেই। স্টোরের ম্যানেজারকে ডেকে বল্লাম- কালোটাতে লেখ-‘ওয়েটিং ফর ইওর ফাইনাল কল’। আমার কাছে এরকম ম্যানেজমেন্ট ফান্ডা পেয়ে সে খুব খুশী।
সেলসম্যান জানাল, এখন লোভনীয় অফার চলছে-‘বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রী, সঙ্গে একবছরের গোল্ড মেম্বারশিপ। একবছরের মধ্যে চশমা বানালে ওয়ান প্লাস ওয়ান ফ্রি অফার পাওয়া যাবে। লোভনীয়, সন্দেহ নেই। ভালই হল, চশমা তো লাগবেই। অফারটাই কাজে লাগান যাক। দুজনের দুটো ফ্রেম পছন্দ করলাম। এরপর চোখের পাওয়ার পরীক্ষা হল। ইয়াং ছেলেটিকে বেশ সিনসিয়ার লাগল। খালি মেশিনে চোখ লাগিয়েই নয়, ট্রাডিশনাল মেথডে কাঁচের পর কাঁচ লাগিয়ে পাওয়ার চেক হল। ডবল চেকিং। আমি ইমপ্রেসড ও কনভিনস্ড। দুজনে বাইরে বেরিয়ে বলাবলি করলাম-‘বেশ সময় নিয়ে চোখ টেস্ট করছে। পেমেন্টও হয়ে গেল ৮৭০০/-, চশমার দাম।
কালকে এসএমএস পেয়ে সাধের চশমা ডেলিভারি নিয়ে এলাম। দুজনের জন্য দুটো কেস। একটা বড়সড় রেকট্যাঙ্গুলার, অন্যটা একটু ওভাল শেপের। ম্যানেজমেন্টের তারিফ করতে হল, যাতে গুলিয়ে না যায় তাই দুরকম কেস। বিকালে নূতন চশমা পরে হাঁটতে গেলাম। কিরকম যেন লাগছে। বাদিকের উপরটা কেমন আবছা। মোবাইল খুলে হোয়াটস্ অ্যপ দেখতে গিয়ে দেখি মোবাইলটা কেমন ডিশেপড দেখাচ্ছে। মোবাইল স্ক্রীনটাও কেমন জানি ফ্ল্যাট নয়, মাঝখানটাতে ওভালশেপ হয়ে গিয়েছে। মহা মুশকিল। বাড়ী এসে বল্লাম-ধোঁকা খেলাম মনে হচ্ছে, পাড়ার চশমার দোকানই ভাল, হাইটেকে গিয়ে যত বিপত্তি। কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে দেখি সকাল নটা থেকে রাত নটা অব্দি সার্ভিস। এখন বন্ধ। আমি দমে যাবার পাত্র নই। হোয়াটস্ এ্যপে চ্যাট করা যায়। বিলের কপি, চশমার ছবি সব পাঠিয়ে কমপ্লেন করলাম। অন্যপাশ থেকে অনেক দুঃখ প্রকাশ করে জানাল যে এখন কিছু করা যাবে না, কালকে সকাল নটায় চ্যাট অথবা ফোন করতে হবে। পরের দিন আর কিছুতে ভরসা না করে সোজা দোকানে হাজির হলাম। বেশ চ্যাচ্যমেচি করে বল্লাম,- এতক্ষন ধরে চেক করে এটা কি বানিয়েছ। সেন্টারিং পর্যন্ত করতে পার নি। সেলসের লোকটা বেশ অবাক। চশমার এরকম গড়বড় বোধহয় সচরাচর হয় না। চশমাটা নিয়ে ছেলেটা ভিতরে গেল। একটু পরে বেরিয়ে এসে একগাল হেসে বল্ল-স্যার ইয়ে আপকা নেহি, ম্যামকা চশমা হ্যায়। এ্যা, কি বিপত্তি, এরকম একটা ভুল যে হতে পারে সেটা মাথাতেই আসে নি। পুরো দোষটা যে আমাদের তাও ঠিক নয়। যে খাপ দুটোর মধ্যে দিয়েছিল সেটা একটা ওভাল শেপের। দেখলেই মনে হয় ওটা মেয়েদের। আমি ধরেই নিয়েছি, ওটাতে সুমিতার চশমা আছে। আমি অন্য কেসটা থেকে চশমা বার করে পরেছি। সুমিতা পরতেই ঠিকঠাক ফিট করে গেল। যাক রহস্যের যবনিকাপাত হল। তাড়াতাড়ি দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। তবে মনে হচ্ছিল, সেলসম্যান গুলো এতক্ষনে নিশ্চয়ই নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে।
দেবদত্ত
২৯/০১/২০২০

Comments
Post a Comment