মধুচন্দ্রিমা (হনিমুনের স্মৃতিকথন)


 মধুচন্দ্রিমা পার্ট

“যদিদং হৃদয়ং মম-তদিদং হৃদয়ং তব,” এই অনুষ্ঠানের মধুরেণ সমাপেয়ত হচ্ছে মধুচন্দ্রিমা পর্ব। সময়ের সাথে সাথে সব বদলায়। আমার বড়মামার বিয়ে হয়েছিল ৬৬ অথবা ৬৭ সালে। বিশেষ কিছু আর মনে নেই, তবে এটুকুই মনে আছে যে বরযাত্রী গিয়ে রাতের বেলা মশার কামড় খেতে খেতে, বিনিদ্র রজনীতে আত্মীয়দের মধ্যে তর্ক হচ্ছিল, দমদমের মশা বড় না বেহালার মশা বড়। আমি বেহালার সাপোর্টার, কারন বেহালাতে দাদু, ঠাকুমা থাকে। ঝাড়গ্রাম থেকে বেড়াতে গেলে, সময়ে, সন্ধ্যে হলেই মশারির মধ্যে সেঁধোতে হত, মশার ভয়ে। মশারির মধ্যে ঢুকতে গিয়ে, বেশ কয়েকটা বেয়াড়া মশা ভিতরে ঢুকে পড়ত, আর সেগুলো অবাধ্যের মত মশারির সবচেয়ে দুরূহ কোনে বসে থাকত। চপেটাঘাত করতে গেলেই, ইনভ্যারিয়েবলি, সেটা মশার গায়ে না লেগে মশারির গায়ে লাগত, মশাটা পিংপিং করে, ততোধিক দুর্গমস্থানে উড়ে গিয়ে বসত। মাঝে মাঝে ছোটপিসি আর আমার মধ্যে কম্পিটিশন হত কে কটা মশা মারল। অনেক সময় সেঞ্চুরি হাকিয়ে ফেলতাম। অন্য যে ঘটনাটার জন্য বড়মামার বিয়ে প্রসঙ্গ উত্থাপন, সেটা হচ্ছে, জানলাম যে, বড়মামা নূতন মামীমা হনিমুনে যাবে। বাবা, মায়ের বিয়ের পর এরকম কিছু হয়েছিল হলে শুনি নি। যাওয়া হবে দার্জিলিং এ। মধুচন্দ্রিমা যে নবদম্পতির একান্ত ঘনিষ্ঠতায় পরস্পরকে চিনে নিয়ে, পথচলার শুভ মুহুর্তের সূচনা, সেটা বোধহয়, সেযুগে বাঙালী মননে রেখাপাত করে নি। ব্যাপারটা যেটা দাঁড়াল, আমি, মা, মাসী সেই হনিমুন যাত্রায়, ‘কাবাব মে হাড্ডি’ হয়ে নববিবাহিত মামা-মামীর সঙ্গে জুড়ে বসলাম। তখনো ফরাক্কা ব্রীজ হয় নি।সকড়ি গলি ঘাটে নেমে পড়ি কি মরি করে মালপত্র নিয়ে, স্টীমারে গঙ্গা ক্রস করে, আবার উল্টোদিকের ট্রেনে উঠতে হয়েছিল।


আজকাল আর সে যুগ নেই। এমনিতেই বলে -ইন্ডিয়াস বিগ-ফ্যাট ওয়েডিং। হনিমুন আজকাল এদেশে করা মানে প্রেস্টিজ পাংচার। সুইজারল্যান্ড, মালদিভস, নিদেনপক্ষে ব্যাংকক-ফুকেট যাওয়াটাই রীতি। আজকাল কেউ আর নিজেরা টিকিট, ইটেনারি বানায় না, বড় বড় ট্রাভেল এজেন্সীর থেকে প্যাকেজ নেওয়াটাই এখন দস্তুর। এতে অবশ্য মনটাকে পুরো আনন্দ উপভোগে ব্যস্ত রাখা যায়। আমাদের সময়ে,  সমুদ্র পছন্দের লিস্টে থাকলে পুরী আর পাহাড় পছন্দ হলে দার্জিলিং যাওয়াটা  বঙ্গবাসী নবদম্পতির রেওয়াজ ছিল। পান্জাবীদের মধ্যে বেশী পছন্দের হনিমুন ডেস্টিনেশন হচ্ছে সিমলা, মানালী আর নৈনিতাল।

ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়েবলে আগেকার কালে একটা কথা বেশ প্রচলিত ছিল। আজকাল আর তা নয়। এখন ওই আপ্তবাণী হনিমুনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারনত যেটা হয়ে থাকে আজকাল, বাসরশয্যার পরেরদিনই, নববধূর চন্দনচর্চিত মুখ, আর কপালে লেপ্টে থাকা সিঁদুরের প্রলেপ মুছতে না মুছতেই হনিমুন যাত্রা শুরু হয়ে থাকে। দুজনকে চিনে নেওয়ার এটাই বোধহয় প্রকৃষ্ট সময়। আজকাল বিয়ের প্রথমরাতে বিড়ালের ল্যাজকাটার জমানা চলে গিয়েছে। এখন নারী স্বাধীনতার যুগ। তাই নববধূর মন যুগিয়ে চলাটাই আজকের যুগের রেওয়াজ।

যাক এবার নিজের কথায় আসি। বিয়েটা হয়েছিল ৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আর হনিমুনটা জুন মাসের প্রথম দিকে। যদিও প্রায় ৩২ বছর আগের ঘটনা, এখনো দিনটা মনে আছে ৮ঐ এপ্রিল, আমার সি আর পার্কের দিল্লীর বাড়ীতে সুমিতার শুভপদার্পন।সুতরাং বিয়ের পর তিনমাসের বেশী সময় পরে, এই ঘটনাটাকে মধুচন্দ্রিমা না বলে, দুজনের একসাথে বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বলা যেতে পারে। 

আমাদের দুজনেরই পাহাড় পছন্দ, সমুদ্রসৈকতও ভাল লাগে, কিন্তু হিমালয়ের রাস্তার  প্রতিটি বাকে যে রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে,উত্তুঙ্গ পর্বতশিখরের হিমশৈলীর যে ভয়াল সৌন্দর্য, তার কাছে সমুদ্র কোথায় লাগে। গরমের সময়, তাই বহুল প্রচারিত হিল স্টেশনগুলেতে হোটেল পাওয়াই শক্ত। আমরা দুজনে আবার নির্জনতা পছন্দ করি। তাতে যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য আরো নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়। বরাবরই দিল্লিতে নভেম্বর মাসে অল ইন্ডিয়া ট্রেডফেয়ার হয়ে থাকে। প্রত্যেক স্টেটের স্টল থাকে। সেখানে সেই প্রদেশের হ্যান্ডিক্রফট থেকে শুরু করে, খাবারের স্টল, স্টেট টুরিসিমএর অফিস থাকত।  বিয়ের পর থেকে, দুজনে কোন বছরই ট্রেড ফেয়ার মিস করি নি। ওই ফেয়ার থেকে বেড়ানোর লিফলেট যোগাড় করতাম। তখনও উত্তরাখন্ড তৈরী হয় নি।লেসার নোন ডেস্টিনেশন অফ ইউ পি হিলসবলে একটা চটি বই ছিল আমার কাছে। তাতে খবর পাওয়া গেল চক্রাতা বলে গাড়োয়াল হিলসের একটা জায়গার,৭০০০ ফিট হাইটে, দেরাদুন থেকে ১০০ কিমি। আজকের উত্তরাখন্ডের দুটো ভাগ, একটা কুমায়ুন হিমালয় অন্যটা গাড়োয়াল হিমালয়।কুমায়ুনে পড়ে, নৈনিতাল, আলমোড়া , রাণীক্ষেত ইত্যাদি আর গাড়োয়ালে দেরাদুন এবং চারধাম।

আমার এক কলিগ রোজ ৮০ কিমি পথ পেরিয়ে শোনিপথ থেকে নেহেরু প্লেসে মানে আমাদের অফিসে আসত।শোনিপথ থেকে আই এস বি টি, সেখান থেকে বাস বদলে অফিস।ওকে দিয়ে দুটো বাসের টিকিট কাটলাম দেরাদুন পর্যন্ত। প্ল্যন টা ছিল দেরাদুনে আমার কাকীমার বোনের বাড়ী, সেখানে দুইরাত কাটিয়ে বাস ধরে চক্রাতা যাব। কাকীমার বোনের বর ডি আর ডি তে চাকরী করে। অফিসের পাশে বেশ বড় কমপ্লেক্স এর মধ্যে কোয়ার্টার। বাস ছাড়বে রাত সাড়ে দশটাতে। আমি চিরকালই লেটলতিফ। বিয়ের পরপর অস্টমঙ্গলাতে ঝাড়গ্রাম থেকে কলকাতা আসব। সকাল সাড়ে সাতটায় ট্রেন। রিক্সা থেকে নেমে দেখি, ট্রেন অলরেডী প্ল্যাটফরমে দাড়িয়ে।ঐ প্লাটফরমে যেতে গেলে আবার ওভার ব্রীজ ক্রস করতে হবে। সবে তো বিয়ে হয়েছে। সুমিতাকে বল্লাম, এক কাজ করো, তুমি দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়, আমি টিকিট কেটে আসছি। চিরকালের বাধ্য মেয়ে। তারজন্য আমায় কষ্ট করে বিড়ালের লেজ কাটতে হয় নি। বেচারী কি আর করে। নেহাত সাঁতার টাতার ভালই কাটত, তাই শাড়ী টাড়ী সামলে দৌড়ে গিয়ে উঠল। আমিও টিকিট কেটে উঠলাম, ততক্ষনে অবশ্য ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে।

ক্রমশঃ


      দেরাদুনে , ডি আর ডি ও টাউনশিপের বাইরে, জঙ্গলের রাস্তায়


              আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ.....

             ডাকবাংলোর রাস্তার সামনে আমরা দুজন

                      চক্রাতায় দেওদারের সমাহার

                             ভরা থাক স্মৃতি সুধায়......
                       চক্রাতার ডাকবাংলোর সামনে।

                    হাঁটতে হাঁটতে তিন কিমি দূরে দেওবনে।


মধুচন্দ্রিমা পার্ট

সেই অভ্যাসবশত অটো ধরে যখন বাসস্ট্যান্ড পৌঁছলাম তখন ঘড়ির কাটা সাড়েদশটা ছুঁই 

ছুঁই। দিল্লিতে আবার বাসটারমিনাস বলে না, ওটার নাম বাসআড্ডা।প্রথম প্রথম দিল্লি আসার পর, বন্ধুদের মধ্যে খুব হাসাহাসি হত - দ্যাখ দ্যাখ, এখানে বাসেরা আড্ডা মারে। কারণ এর আগে জেনে এসেছি আড্ডা ব্যাপারটা বাঙালিদের এক্সক্লুসিভ ডোমেন। পরপর অনেক বাস দাড়িয়ে, কোনটা চন্ডীগড়, কোনটা জয়পুর, আগ্রা অথবা দেরাদুন যাচ্ছে। লোকে লোকারণ্য। হঠাৎ দেখি একটা বাস বেরোচ্ছে দেরাদুন লেখা, বাজে তখন সাড়ে দশটা। দৌড়লাম বাসের পিছনে, যে করে হোক থামাতে হবে, নইলে হনিমুন মাটি। ব্যাটা বাস কি আর থামতে চায় আমার রোকো রোকো বলাতে, অগত্যা হাতে ছিল ক্যামেরার ব্যাগ, যা থাকে কপালে, কারন ব্যাগে আমার বড় সাধের নিকন ডিজিটাল ক্যামেরা, সদ্য একজন হংকং থেকে এনে দিয়ছে, সেটা দিয়েই বাসের দরজায় ঘা কতক দিলাম। বাস দাঁড়াল। কন্ডাক্টর কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বল্লাম হামারা বুকিং হ্যায়, এই বলেই বাসে উঠে বীরদর্পে এগিয়ে গেলাম সীটের দিকে - ওমা দুজন তো অলরেডী বসে। যতই আমি বলি - ইয়ে হামারা সীট হ্যায়, তারা ততজোড়ে মাথা নেড়ে বলে সেটা ওদের সীট। এই ঝগড়ার মাঝে কন্ডাক্টর এসে আমার টিকিট দেখে জানাল, ইয়ে ইস বাসকা টিকিট হ্যায়ই নেহি। এবার তো মাথায় হাত, ওরে বাবা কি হবে গো। কন্ডাক্টর আমাদের অবস্থা দেখে দয়াপরবেশ হয়ে জানালো, সাড়ে দশটার সময় ছয়খানা দেরাদুনের বাস ছাড়ে। বাসের নম্বর টিকিটের গায়ে লেখা, সেটা দেখে তবে উঠতে হবে। ভাগ্য ভাল, আমাদের বাস তখনো ছেড়ে যায় নি। যাক শেষ পর্যন্ত উঠে বসা গেল। ক্যামেরার ব্যাগটা খুলে দেখলাম, এই অত্যাচারে সাধের ক্যামেরা ঠিক আছে তো। আমি আবার বাস অথবা ট্রেন, যাতেই চড়ি না কেন, সে বসার সিটই হোক অথবা শোয়ার, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি। এখানেও তার ব্যাতিক্রম হল না। চোখ যখন খুলল, তখন বাস দেরাদুনের ঘন্টাঘরে দাড়িয়ে। ঘড়িতে দেখি চারটা বাজে, চারিদিক অন্ধকার। একটা অটো নিয়ে পৌঁছালাম রমা কাকীমাদের কলোনীতে। অটো থেকে নেমে দেখি সবে ঊষার আলো ফুটছে। ছোট ছোট রাস্তা এদিক ওদিক, আর আশেপাশে সব কোয়ার্টার। ব্লক, নম্বর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। গরমকাল, তাই  অনেকেই বাড়ীর বাইরে খাটিয়া পেতে ঘুমাচ্ছে। সবে তখন দু একজন গাত্রত্থান করে আড়মোড়া ভাঙছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম এড্রেসটা, বেশী ক্ল্যারিফাই করার জন্য যোগ করলাম, বাঙালী দাদাকা ঘর হ্যায়। সে বেশ ঘুম ঘুম চোখে বলে দিল- সামনেই হ্যায় চার মঞ্জিল ছোড় কর। তখনো ভোর হয় নি, ভাবলাম এত তাড়াতাড়ি ডিস্টার্ব করাটা ঠিক হবে না। যাক নিশ্চিত যে ঠিক জায়গায় পৌঁছান গিয়েছে। কাল থেকে যা চলছে। আরেকটু পরে গিয়ে বেল বাজালাম।এক ভদ্রলোক এসে দরজা খুললেন। বল্লাম কাকীমা কোথায়, আমাদের বাসটা আবার বেশী সকাল সকাল পৌছে দিয়েছে।উনি বল্লেন, আপনারা একদিন আগেই এসে গেছেন দেখছি। আমি বল্লাম, না তো - চিঠিতেতো আজকে আসার কথা লিখেছিলাম, তাহালে বোধহয় তাড়াহুড়োতে ভুল ডেট লিখেছি। একটু পরে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। চোখটাকে একটু কচলে নিলাম, ভুল দেখছি নাতো- ঠিক রমাকাকীমার মতো লাগছে নাতো। উনিও যে ঠিক আমাকে চিনতে পারছেন সেটা ঠিক মনে হল না।ইনার বয়েস একটু বেশী। কাকীমা আমার ব্যাচেরই হায়ার সেকেন্ডারি, যেহেতু কাকীমার বোন, তাই আমিও কাকীমা বলতাম। বিয়েতে যাই নি, তাই বরের সঙ্গে আলাপ ছিল না। এবার আসল ব্যাপার খোলসা হল-আমরা ভুল বাড়ীতে এসে পড়েছি। কী কান্ড। গতকাল কার মুখ দেখে বেড়িয়েছিলাম কে জানে। ওদের বাড়ীতেও কাউর আসার কথা ছিল। তাই এতো কনফিউসন। যাক উনি আমাকে রমাকাকীমার ফ্লাটে পৌছে দিলেন। কাকীমা বেজায় ব্যস্ত। কাকীমার ছেলে ঋজু তখন একবছর। সে তখন হামা দিতে শিখেছে। কাকীমা রান্না করতে গেলে সে হামা দিয়ে কাকীমার পায়ের কাছে পৌছে যায়। ওমা দেখি কাকীমা ওর এক পায়ে দড়ি দিয়ে বেধে ড্রয়িং রুমের শিকলের সাথে বেধে দিয়েছে।ব্যাপারটা আমার কাছে একটু নিষ্ঠুর লেগেছিল।তবে আমাদের অনেক খাতিরদারি হল। দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরোলাম, গন্তব্য সরকারী দপ্তর, কারন এখান থেকে চক্রাতাতে জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর বুকিং করা যাবে। শুনেছিলাম চক্রাতা ছোট্ট শৈল শহর, সেনা ছাউনি আছে, কিন্তু কোন হোটেল নেই। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। সেদিন সেকেন্ড স্যাটারডে, তাই অফিস বন্ধ। পরেরদিন রবিবার। তাই অফিস খোলার জন্য আরো দুদিন ওয়েট করা অসম্ভব। যা থাকে কপালে, তাই হবে, এই ঠিক করে পরেরদিন দেরাদুন থেকে সকাল সকাল বাস ধরলাম।ছোট বাস, কারন পাহাড়ী রাস্তা। সমতল দিয়ে তিরিশ কিমি আসার পর বাস থামল। শুনলাম এরপর পাহাড়ী রাস্তা শুরু। এখানে গেট সিস্টেম, সরু রাস্তা তাই ওয়ান ওয়ে। দুই ঘন্টা পরপর গেট খোলে। বাস থেকে নামলাম চারপাশটা দেখতে। চারিদিকে তরাইয়ের শালের জঙ্গল।হিমালয়ের পাদদেশের জায়গাকে তরাই বলে, একটু উপরে উঠলে সেটার নাম ভাবর। এটা আমি জিম করবেটের বইতে পড়েছি। কাছেই দেখলাম ফরেস্ট ডিপার্টম্ন্টের অফিস।সব ফরেস্ট রেস্ট হাউসের বুকিং এই অফিস থেকে হয়।বাসের হর্নের প্যাঁ পোঁ শুনে ফিরে এলাম, শুরু হল পাহাড়ি রাস্তা। ঘন্টা দুয়েক পরে বাসটা আমাদের নামিয়ে দিল চক্রাতাতে। বাসটা নাকি আরো দূরে টিউনি বলে একটা জায়গায় যাবে। থাকার জায়গা কি হবে জানি না। রীতিমতো এডভেঞ্চার বলা যায়।এত সুন্দর জায়গা, আর গরমও নেই, কিন্তু মন ভরে এনজয় করা যাচ্ছে না, কারন আগে মাথা গোজার ঠাঁই দরকার।রাস্তায় দু একজনকে জিজ্ঞাসা করে, এক কিমি দূরে ডাকবাংলোর দিকে হাঁটা লাগালাম। লাক ট্রাই করতে।পুরো রাস্তাটা নির্জন, পথের পাশে দেওদার গাছই বেশী। রাস্তার বাঁকের পাশে পুরানো ধাঁচের একতলা বাড়ীটি সরকারী ডাকবাংলো। সামনে কিছুটা লন। চৌকিদারের ঘর আলাদা। চৌকিদারের নাম শ্রীশচন্দ্র। গাড়োয়ালি টুপি পরা পাতলা দোহারা চেহারা। বল্লাম, দিল্লি থেকে আসছি। শনিবার অফিস বন্ধ ছিল বলে অফিসিয়াল বুকিং নেই। যদি আমাদের তিনদিন থাকার অনুমতি দেয়। ভাগ্যক্রমে তখন কোন গেস্ট ছিল না। শ্রীশচন্দ্র, একটু কিন্তু কিন্তু করে রাজী হয়ে গেল, তবে শর্ত, নীচে থেকে কেউ পারমিট নিয়ে এলে আমাদের পত্রপাঠ বিদায়। যাক সৌভাগ্য যে পরের তিনদিন কেউ আর আসে নি। কি রাজার হালে যে পরের দিনগুলো কাটল।এক তো সুন্দর আবহাওয়া, দিল্লীর অসহনীয় গরমের হাত থেকে রেহাই। আজকালের জমানায় রাতে সি চলে। তাই গরমের কষ্ট কমে গিয়েছে। অন্য ব্যাপারটা হল শ্রীশচন্দ্রের হাতের রান্না। যা বলে দিতাম তাই বাজার থেকে কিনে আনত। মনে আছে রোজই কাঠের আগুনে, প্রেশার কুকার ছাড়া মাটন বানাত, সঙ্গে গরম গরম রুটি। রোজই এডভেঞ্চার ট্রেল করতাম। তাই খিদেও পেত অনেক।

ক্রমশঃ


                      ইউ কাহাঁ আ গয়ে হাম.........

                        কনসারের রাস্তায় যুগলে


                   এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে......,,

                 পাইনকোন কুড়ান, কনসরের জঙ্গলে

                              তিমির অবগুন্ঠনে........
                        কনসরের সেই ছোট্ট মন্দিরে

                          আমার খেলা যখন ছিল.......
                        চক্রাতায় সেই স্ক্রাবেল খেলা

                           পথ বেধে দিল বন্ধনহীন.....
                             চক্রাতার রাস্তায়


মধুচন্দ্রিমা পার্ট

ডাকবাংলোটার সামনের রাস্তাটা দিয়ে বাদিকে বেশ কিছুটা গেলে অনেকটা সমতল জায়গা। সেখানে সারি দেওয়া দেওদার গাছ।একদিন সকালে দুজন হাত ধরাধরি করে হাটছি, আর ফটো তোলার স্পট খুঁজছি। আমার কাছে ট্রাইপডও ছিল। তখন ফিল্ম ক্যামেরার যুগ।এখনকার ডিজিটাল জমানায়, আমজনতা সবাই খটাখট মোবাইল টিপে ফটো তুলছে, ভিডিয়ো বানাচ্ছে। তখন ছিল খালি স্টীল ফটোগ্রাফির জমানা। অনেক বুঝেশুনে, সুন্দর জায়গা বেছে নিয়ে, সূর্যের আলো সাবজেক্টে ঠিকমত আসছে কিনা দেখে, তবে সাটার টেপা হত। আর যতদিন না ৩৬ টা ফটো তুলে রীল শেষ হওয়ার পর ডেভেলাপ করা হত, দারুন উৎকন্ঠা থাকত, কেমন ফটো উঠল জানার জন্য। যাক, যে কথা বলছিলাম, হঠাৎ দেখি ভারী বুটের সম্মিলিত আওয়াজ। অনেক জওয়ান ডবল মার্চ করে বন্দুক হাতে আসছে। তার আগে দূর থেকে ঠক ঠক আওয়াজ আসছিল। তখন বুঝি নি সেগুলো রাইফেলের আওয়াজ। ওটা ছিল চাদমারীর আওয়াজ। রকম নির্জন জায়গায় ওরা ঠিক হনিমুন কাপল এক্সপেক্ট করে নি। ওদের সংগে আলাপ হল। চক্রাতাতে এক্লামাইটাইজেসন ক্যাম্প চলছে জোয়ানদের। ওরা সবাই এরপর সিয়াচেন যাবে। সিয়াচেনে পোস্টিং হয়, মাত্র কয়েকমাসের জন্য। এক ব্যাচ ফিরে এলে অন্য ব্যাচকে পাঠান হয়। এত ঠান্ডা আর হাই অলটিচুডএর জন্য অনেক ক্যাসুয়ালিটি থাকে। এটা ৩২ বছর আগের কথা। তখন সদ্য সিয়াচেন্ ব্যাটেলফিল্ড খুলেছে। এখনকার মত অত সফিস্টিকেডেট স্নোবুট, জ্যাকেট ছিল না, তাই মৃত্যুহারও বেশী ছিল।

ডাকবাংলো থেকে বামদিক ধরে এক কিমি গেলে বাসস্টান্ড আর তার পাশে চার্চ। শুনলাম এরপরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে তিন কিলোমিটার গেলে দেওবন বলে একটা জায়গা পড়ে, সেখানে ফরেস্টের ছোট অফিস, আর কিছু দোকানপাট। চক্রাতা থেকে আঁকাবাঁকা পথ দেওদারের মধ্যে দিয়ে পথ। সেই নির্জন রাস্তা ধরে পাশাপাশি হেটে যেতে যেতে সত্যিই মনে হত- ‘এই পথ যদি না শেষ হয় দেওবনের ফরেস্ট অফিসের পাশে দোকানে চা খেতে খেতে শুনলাম, এখান দিয়ে সারাদিনে একটাই রোডওয়েজের বাস “কনসার” বলে একটা জায়গা হয়ে “টিউনি” বলে একটা জায়গায় যায়। কনসার জায়গাটা নাকি গহন জঙ্গলের মধ্যে, থাকবার জন্য খালি বনবিভাগের একটা বাংলো, সেটা রাস্তার পাশে।ওই বাসটা আবার পরেরদিন ফেরত আসে। কিন্তু সেই বাংলোয় থাকতে গেলে বনবিভাগের পারমিশন লাগে। সেটা পাওয়া যায় কলসী থেকে।যা থাকে কপালে,  সুমিতাকে বল্লাম-চল চল যাই, এতদূরে কে আর আসবে, আমাদের একটা এডভেঞ্চারও হবে। থাকার জায়গা কিছু না কিছু হয়ে যাবে। যা ভাবা তাই কাজ। পরের দিন সকালে বেড়িয়ে পরলাম, সঙ্গে নিলাম, চাল, ডাল, ডিম, আলু, পেয়াজ,তেল। কারন ওখানে কোন দোকান তো দূরের কথা, কোন লোকবসতি নেই। বাস থেকে নামার সময় কন্ডাক্টর দেখিয়ে দিল, বনবাংলোর রাস্তা। মা, পৌছে দেখি দুটো গাড়ি দাড়িয়ে।ভিতরে জনগনের কলকাকলী।এখন তো ফেরারও কোন উপায় নেই। আলাপ হল দুটো ফ্যামিলি, তারাও এসেছে দিল্লির কালকাজি থেকে। বিয়ের পরপর আমরা থাকতাম সি আর পার্কে। কালকাজি তার পাশেই। সবার সঙ্গে বেশ আলাপ হয়ে গেল। কথায় বলে- যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নজন। দুটো ঘর, সেদুটো ওদের অকুপায়েড। তাই ঠিক হল যে আমরা দুজন ডাইনিংয় কাম ড্রইং রুমে চাদর বিছিয়ে কার্পেটের উপর শোব। চৌকিদার এল রান্না করতে। বল্ল কাঠ জোগাড় করে আনতে, উনুন জ্বালাতে লাগবে সবাই মিলে তাতেই লেগে গেলাম মহাআনন্দে। এরপর আমরা দুজন বেরোলাম ঘুরতে। চৌকিদার মানা করে দিল বেশী দূরে যেতে, এখানে নাকি অনেক জংলী জানোয়ার আছে। গেলাম কাছেই, যে রাস্তায় বাস নামিয়ে দিয়েছিল। রাস্তার পাশেই দেখি ছোট্ট একটা মন্দির। নির্জন জঙ্গলের মাঝে  মনে হল এক রক্ষেকালীর মন্দির, এখনই ডাকাতের দল আসবে পূজা দিতে। সে রকম অবশ্য কিছু ঘটল না। মন্দিরের সামনে ট্রাইপডে ক্যামেরা রেখে টাইমার লাগিয়ে ফটো তুললাম যুগলে। জঙ্গলের মাটিতে পাইনকোনের ছড়াছড়ি। সুমিতার উৎসাহ কে দেখে। কত যে পাইনকোন কুড়িয়ে ফেলল। সেই পাইনকোন অনেকদিন পর্যন্ত, আমাদের বাড়ীর ড্রইং রুমে শোভা পেয়েছে। সন্ধ্যেবেলা কালকাজি পার্টির সংগে অনেক গল্প হোল। এরপর রাতে খেয়ে দেয়ে ভূমিশয্যা।গায়ে হাল্কা শাল। মাঝরাতে দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। শীত করছে। হবে না, সাড়ে আট হাজার ফিট হাইট। এপাশ ওপাশ করতে করতে মাথায় বুদ্ধি এল। যা ভাবা তাই কার্যকরী করতে লেগে গেলাম। লাইট তো নেই। টর্চ জ্বালিয়ে, চেয়ার টেনে তাতে উঠে, জানলার বড় বড় পর্দাগুলো রড থেকে খুলে ফেললাম। এরপর এটাকেই গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। বাকি রাত আরামেই কাটল। পরের দিন সকালে বেরিয়ে আবার ফিরতি বাসে চক্রাতা। আবার সেই ডাকবাংলো।ঠিক করলাম এডভেঞ্চার অনেক হয়েছে। সেদিনটা পুরো রেস্ট নেব। সঙ্গে ছিল স্ক্রাবেল। তখন আমাদের ওই গেমটা খুব চলত। সেই হনিমুনের দশ বছর পর আবার ১৯৯৮ সালে আবার গিয়েছিলাম চক্রাতা। সেই স্ক্রাবেলও নিয়ে গিয়েছিলাম, খেলেও ছিলাম, পুরাণ স্মৃতিকে তাজা করতে।এবার ফেরার পালা।

সকালবেলায় বেরিয়ে দেরাদুন, সেখান থেকে আবার দিল্লীর বাস। তখন তো আর সি বাস ছিল না। অত সুন্দর আবহাওয়া ছেড়ে, গরমে সিদ্ধ হতে হতে ফেরা। তখন ছিল অল্প বয়েস, কষ্ট গুলোকে কষ্ট লাগত না। বাসে আমার সীটের পাশে বসেছিল কলকাতার এক মাড়োয়ারী দম্পতি। তারাও আমাদের মত হনিমুন করে ফিরছে। ওরা গিয়েছিল মুসৌরিতে। যা শুনলাম তাতে নিজেদের সৌভাগ্যবান বলে মনে হল। মুসৌরিতে ১৫০/ করে হোটেল ভাড়া, তাও ঘন্টা কয়েক অপেক্ষা করে, আর কোন হোটেলে জায়গা না পেয়ে। আমি হিসাব করে দেখলাম, আমার দেড়শ টাকার মধ্যে হনিমুন কমপ্লিট। হবে নাই বা কেন, চারটাকা করে, ডাকবাংলোর ভাড়া ছিল, শ্রীশচল্দ্রকে খালি কাঁচা মালের দাম দিতাম, রান্না করার পয়সা আলাদা। আর কি ভাল ভাল যে খাবার খেয়েছিলাম, ধিকিধিকি কাঠের আগুনে রান্না করা মাংসের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। এই হল গিয়ে আমাদের হনিমুনের গল্প। লিখতে শুরু করার সময় ভেবেছিলাম, এত পুরানো ঘটনা কি মনে করে লিখতে পারব। এখন দেখলাম কোন কথাই ভুলি নি। জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক ঘটনাগুলি মনের মনিকোঠায় সতত উজ্জ্বল থাকে। এটাই মানুষকে জীবনের বন্ধুর পথে চলতে উজ্জীবিত করে। বেদনার ঘটনা ধূসর হয়ে যায় কালের গতিতে। অন্তত আমার তাই লাগে। সেই নববধূর কোমল হাতের আলতো ছোঁয়ায় যে অনন্য অনুভূতির জন্ম নিত ক্ষনে ক্ষনে দীর্ঘ ৩২ বৎসর আগে, সেই দুইহাতের বন্ধন এখন আরো নিবিড় হয়ে ঘিরে রেখেছে আমার সমগ্র সত্তাকে।

দেবদত্ত

১৫/১২/১৯






Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments